Dr Mani Chettri Cardiologist: জ্যোতি বসুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে আস্থার প্রতীক, হৃদরোগ চিকিৎসায় অগ্রদূত এবং একই সঙ্গে বিতর্কে জড়ানো এক জটিল জীবন—মনীশ ছেত্রীর যাত্রা আজও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রেরণা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: পাহাড়ের কোলে জন্ম, প্রকৃতির সঙ্গে শৈশবের গভীর সম্পর্ক—আর সেই পথ ধরেই একসময় হয়ে ওঠা দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। এই গল্প শুধুই একজন চিকিৎসকের নয়, এটি এক শতাব্দী পেরিয়ে আসা এক অনুপ্রেরণার যাত্রা। ১০৬ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ মণি ছেত্রী। তাঁর জীবন যেন এক চলমান ইতিহাস—যেখানে পাহাড়ি স্কুল থেকে শুরু করে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ, আবার ফিরে এসে হাজার হাজার চিকিৎসকের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠার কাহিনি জড়িয়ে আছে। আজকের এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হল সেই অসাধারণ মানুষটির জীবন, সংগ্রাম ও অবদান—যা আগামী প্রজন্মের কাছে এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
গোর্খা পরিবারে জন্ম নেওয়া মণি ছেত্রীর শৈশব কেটেছে দার্জিলিংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে। চা বাগান আর তিস্তা উপত্যকার শান্ত পরিবেশ তাঁর মানসিক গঠন ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের সঙ্গে তাঁর এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে—যা তিনি সারাজীবন ধরে বহন করেছেন।
শিক্ষাজীবনের শুরু দার্জিলিং মিউনিসিপ্যালিটি প্রাইমারি স্কুলে। এরপর ভর্তি হন টার্নবুল হাই স্কুলে। ১৯৩৪ সালে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। এই সময়েই তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠে অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা এবং জ্ঞানার্জনের প্রবল ইচ্ছা—যা পরবর্তীতে তাঁকে দেশের অন্যতম সেরা চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলে।
শিক্ষাজীবন (Dr Mani Chettri Cardiologist)
দার্জিলিং থেকে কলকাতায় এসে তিনি ভর্তি হন সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজে, যেখানে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার যাত্রা শুরু হয় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৪৯ সালে ডাক্তারিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও গভীর জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে বিদেশে পাড়ি দেন। ১৯৫৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ ফিজিশিয়ানস থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন। পরের বছর, ১৯৫৬ সালে, স্কলারশিপ নিয়ে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এফআরসিপি অর্জন করেন—যা সেই সময় অত্যন্ত সম্মানের বিষয় ছিল। এই আন্তর্জাতিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা তাঁর চিকিৎসা দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে এবং তাঁকে বিশ্বমানের চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
কর্মজীবন
বিদেশ থেকে ফিরে এসে তিনি কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর চিকিৎসার মূল দর্শন ছিল অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর—“কম ওষুধ, কিন্তু সর্বোচ্চ ফলাফল”। এই নীতিতে বিশ্বাস করে তিনি অসংখ্য রোগীকে সুস্থ করে তুলেছেন। শুধু চিকিৎসক হিসেবেই নয়, একজন গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অসামান্য। বিভিন্ন রোগ নিয়ে তিনি শতাধিক পৃষ্ঠার গবেষণা সম্পন্ন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এই গবেষণাগুলোকে প্রকাশ করা, যাতে ভবিষ্যতের চিকিৎসকরা সেগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।
তাঁর ছাত্র ও সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন এক আদর্শ। হাজার হাজার চিকিৎসক তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সালে তিনি উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেন। এই প্রতিষ্ঠান আজ উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ—যার পেছনে রয়েছে ডক্টর ছেত্রীর দূরদৃষ্টি ও পরিশ্রম।
পরবর্তীকালে এমন দাবিও ওঠে যে, তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই মেডিকেল কলেজের নাম তাঁর নামে রাখা হোক—“ডাঃ মণি কুমার ছেত্রী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল”। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি, তবে তাঁর অবদান আজও অমলিন। ২০২৫ সালে তাঁর ১০৫তম জন্মদিন উদযাপন করা হয় বিশেষভাবে। সেই বয়সেও তিনি ছিলেন শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত সক্ষম—যা সত্যিই বিরল। তিনি শুধু নিজের জীবনেই সাফল্য অর্জন করেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর ছাত্রদের তিনি শিখিয়েছেন—চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষের সেবার এক মহান দায়িত্ব।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা, সরকারি হাসপাতালের আধুনিকীকরণ, এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা আজও আলোচনার বিষয়। একইসঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক, গবেষণার বিস্তার, এবং জীবনের শেষ পর্যায়ের কিছু বিতর্ক—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক বহুমাত্রিক অধ্যায়।
ডাঃ মণি ছেত্রী শুধুমাত্র রোগীদের প্রিয় “ডাক্তারবাবু” ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসক। ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট হেলথ সার্ভিসেস-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর হিসেবে তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্য নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল (IPGMER)-এ তিনি দীর্ঘদিন কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ও প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব সামলান। তাঁর নেতৃত্বেই এই বিভাগ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। শুধু চিকিৎসা নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার গঠন, প্রশিক্ষণ, এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি ছিলেন এক নির্ভরযোগ্য নাম। এছাড়াও, ১৯৯৭ সাল থেকে ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে তিনি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (MD) হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সরকারি ও বেসরকারি—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর সমান দক্ষতা তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীজ্যোতি বসু-র সঙ্গে ডক্টর ছেত্রীর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভাজন। তিনি ছিলেন জ্যোতি বসুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক—যা শুধুমাত্র পেশাগত সম্পর্ক নয়, বরং গভীর আস্থার প্রতিফলন। এই সম্পর্ক প্রমাণ করে, তাঁর চিকিৎসা দক্ষতা কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল। একজন মুখ্যমন্ত্রী নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব যাঁর হাতে তুলে দেন, তিনি নিঃসন্দেহে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। ডক্টর ছেত্রীর অবদান শুধু রাজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তিনি জাতীয় স্তরেও সমানভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
তিনি এসএসকেএম হাসপাতালে আধুনিক আইটিইউ (ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট) গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, যা পরবর্তীকালে আজকের আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৭৬ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন এবং একইসঙ্গে ইন্ডিয়ান এন্ডোক্রাইন সোসাইটি-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
ডাঃ ছেত্রীর অবদান শুধু রাজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তিনি জাতীয় স্তরেও সমানভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি Cardiological Society of India-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। একইসঙ্গে National Academy of Medical Sciences-এর অন্যতম ফেলো ছিলেন। অনেকেই জানেন না, কার্ডিওলজির পাশাপাশি ডক্টর ছেত্রী ডায়াবেটোলজি ও এন্ডোক্রিনোলজি নিয়েও দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। এই বিষয়গুলিতে তাঁর অবদান চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিতর্কের ছায়া (Dr Mani Chettri Cardiologist)
২০১১ সালের ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ছিল তাঁর জীবনের এক কঠিন অধ্যায়। সেই সময় তিনি হাসপাতালের পরিচালনায় যুক্ত থাকায় নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের মুখে পড়েন। এই ঘটনায় তাঁকে যথেষ্ট হেনস্থার শিকার হতে হয়, যা চিকিৎসক মহলেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। তবে এই ঘটনাও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদানকে ম্লান করতে পারেনি—বরং দেখিয়েছে, একজন মানুষের জীবন কতটা বহুমাত্রিক হতে পারে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে, মৃত্যুর প্রায় পনেরো দিন আগে তিনি নিজের বাড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। সেই আঘাত থেকেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ৫ই এপ্রিল, নিজের বাসভবনেই ১০৬ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং মানবিকতা থাকলে পাহাড়ের ছোট্ট গ্রাম থেকেও বিশ্বমানের উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব। তিনি শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না, ছিলেন একজন শিক্ষক, গবেষক এবং পথপ্রদর্শক।
তাঁর প্রয়াণ (Dr Mani Chettri Cardiologist) যেন এক যুগের অবসান। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর শিক্ষা এবং তাঁর অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে—প্রতিটি চিকিৎসকের হৃদয়ে, প্রতিটি রোগীর কৃতজ্ঞতায়।
#ManiChettri #CardiologistIndia #JyotiBasu #MedicalLegend #HealthcareIndia #SSKMHospital #IndianDoctor #CardiologyPioneer
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার চলবে বেশি দিন

