নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ্য সরকারের নতুন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’কে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী পয়লা জুন থেকে এই প্রকল্পের ফর্ম পূরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং আবেদন জমা দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে নব্বই দিন সময় দেওয়া হবে। তবে প্রকল্প ঘোষণার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে আবেদনপত্রের ধরন ও তাতে চাওয়া তথ্য নিয়ে।
রাজ্য সরকারের প্রকাশ করা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম মোট বারো পাতার। সেখানে শুধু আবেদনকারীর নাম বা পরিচয় নয়, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে। আর সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এত বিস্তৃত তথ্য কেন সংগ্রহ করতে চাইছে সরকার?
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার ভবিষ্যতে মাসে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সেই কারণেই প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতে শুরু থেকেই বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। সরকার চাইছে, কোনো ভুয়ো বা অযোগ্য ব্যক্তি যেন এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে না পারে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ভুয়ো উপভোক্তার অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পে প্রায় তিরিশ লক্ষ এমন উপভোক্তার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যাঁরা আদৌ সরকারি অনুদান পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। অভিযোগ, ভুয়ো তথ্য দিয়ে বহু মানুষ সেই প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই সেই তদন্তে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। রাকিবুল নামের এক ব্যক্তির গ্রেফতারের কথাও প্রশাসনিক মহলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
এই অভিজ্ঞতার পরেই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে সরকার আরও কড়া যাচাই প্রক্রিয়া চালু করতে চাইছে। প্রশাসনের বক্তব্য, আবেদনকারীর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে প্রকৃত উপভোক্তা নির্বাচন সম্ভব নয়।
কী কী তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে?
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের আবেদনপত্রে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিচয়ের পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার নানা খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারী কী ধরনের কাজ করেন, সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত কিনা, কোনো সরকারি সংস্থা থেকে পেনশন পান কিনা, স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে কিনা— এই সমস্ত তথ্য দিতে হবে।
এছাড়াও পরিবারের সদস্য সংখ্যা, তাঁদের ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বর, প্যান নম্বর, আয়কর দেওয়ার তথ্যও জমা দিতে বলা হয়েছে। যদি পরিবারের কারও নাম ভোটার তালিকায় না থাকে, তাহলে তিনি ট্রাইবিউনালে আবেদন করেছেন কিনা বা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কোনো প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন কিনা, সেই তথ্যও জানাতে হবে।
ফর্মে শিক্ষাগত যোগ্যতা, উপার্জনের উৎস, কর্মসংস্থানের ধরন সম্পর্কেও বিশদ তথ্য চাওয়া হয়েছে। ফলে অনেকেরই প্রশ্ন, একটি সামাজিক প্রকল্পের জন্য এত বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতটা।
কেন তথ্য সংগ্রহ করছে সরকার?
সরকারের দাবি, ভবিষ্যতের সামাজিক প্রকল্পগুলিকে আরও সুসংগঠিত করতে এই তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুধু অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার নয়, রাজ্য ও কেন্দ্রের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা যাতে প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেই উদ্দেশ্যেই পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রশাসনের একাংশের মতে, বর্তমানে একাধিক প্রকল্পে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পাচ্ছেন কিনা, কিংবা প্রকৃত আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবার বাদ পড়ে যাচ্ছে কিনা, তা যাচাই করতেই এই তথ্য প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের পরিচয় ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণ তথ্য থাকলে ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়বে বলেও দাবি সরকারের।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য অতিরিক্ত মাত্রায় সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তা নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। অনেকেই মনে করছেন, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়েও সরকারের স্পষ্ট অবস্থান জানানো প্রয়োজন।
ফর্ম পূরণে প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য প্রশাসনের তরফে সর্বস্তরে সহযোগিতা করা হবে। বিডিও অফিস, বিভিন্ন প্রশাসনিক শিবির এবং জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মানুষকে ফর্ম পূরণে সাহায্য করা হবে। পনেরো থেকে সতেরো তারিখ পর্যন্ত বিশেষ ভার্চুয়াল কর্মসূচির মাধ্যমেও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
এছাড়াও বিভিন্ন জনকল্যাণ শিবিরে সরাসরি উপস্থিত থেকে আবেদনকারীদের ফর্ম পূরণে সাহায্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার চাইছে, গ্রামের সাধারণ মানুষ বা যাঁদের অনলাইন পরিষেবা ব্যবহারে সমস্যা রয়েছে, তাঁরাও যাতে সহজে আবেদন করতে পারেন।
শুরু থেকেই কড়া নজরদারিতে সরকার
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে আবেদনকারীদের তথ্য একাধিক স্তরে যাচাই করা হবে। ভোটার তালিকা, আয়কর দফতর, ব্যাংক তথ্য এবং অন্যান্য সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য সঠিক কিনা।
সরকারের বক্তব্য, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার শুরু থেকেই কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে। কারণ, সরকারের দাবি অনুযায়ী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, প্রকল্পের নামে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট নীতি জানানো উচিত। ফলে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প এখন শুধু সামাজিক প্রকল্প হিসেবেই নয়, তথ্য সংগ্রহ ও গোপনীয়তা নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
#AnnapurnaBhandar #LakshmirBhandar #WestBengal #GovernmentScheme #BengaliNews #MamataBanerjee #SocialWelfare

