জগতপিতা হয়েও কেন তাঁকে দাঁড়াতে হলো ভিক্ষুক বেশে? জানুন কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দিরের নেপথ্য কাহিনী, শিব-পার্বতীর দার্শনিক দ্বন্দ্ব এবং Annapurna Temple Legend-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা জীবনের পরম শিক্ষা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : বারাণসী বা কাশী। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে জ্বলে ওঠা প্রদীপ আর মন্ত্রোচ্চারণের শব্দে মুখরিত এক প্রাচীন নগরী। এই শহরের অলিগলিতে কান পাতলে শোনা যায় “হর হর মহাদেব” ধ্বনি। কিন্তু এই শিবের নগরীতেই এমন এক মন্দির আছে, যেখানে মহাদেব রাজা নন, বরং তিনি এক সামান্য ভিক্ষুক।
কাশীর বিখ্যাত অন্নপূর্ণা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করলে দেখা যায় এক অপূর্ব দৃশ্য। রত্নসিংহাসনে বসে আছেন দেবী অন্নপূর্ণা, তাঁর হাতে হাতা ভর্তি অন্ন। আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁর হাতে একটি ভিক্ষার ঝুলি। তিনি দেবীর কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চাইছেন।
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—যিনি ত্রিভুবনের মালিক, যার ইশারায় সৃষ্টি ও ধ্বংস নির্ধারিত হয়, সেই ভোলানাথকে কেন নিজেরই স্ত্রীর কাছে ভিক্ষা চাইতে হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্কন্দ পুরাণ-এর ‘কাশী খণ্ড’-এ বর্ণিত এক গভীর দার্শনিক গল্পে। এটি শুধু কোনো দেব-দেবীর ঝগড়া নয়, এটি হলো ‘মায়া’ বনাম ‘বাস্তবতা’র লড়াই।
আসুন, শুনে নিই সেই কালজয়ী উপাখ্যান।
মায়া বনাম বাস্তবতা: কৈলাসে দার্শনিক দ্বন্দ্ব
ঘটনার সূত্রপাত কৈলাস পর্বতে। একদিন মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর মধ্যে পাশা খেলা চলছিল। খেলার ফাঁকেই শুরু হলো এক গভীর আলোচনা। মহাদেব হলেন যোগী, তিনি সবসময় বৈরাগ্যের কথা বলেন। কথার ছলে তিনি পার্বতীকে বললেন, “হে দেবী, এই জগতে যা কিছু আমরা দেখি, অনুভব করি—সবই ‘মায়া’ বা বিভ্রম। আমাদের ঘরবাড়ি, সম্পর্ক, এমনকি এই খাদ্য বা অন্ন—সবই মায়া। একমাত্র ব্রহ্ম বা জ্ঞানই হলো সত্য।”
মহাদেবের এই কথা শুনে দেবী পার্বতী হাসলেন না, বরং কিছুটা আহত হলেন। কারণ তিনি হলেন ‘আদিশক্তি’ বা ‘প্রকৃতি’। এই জগত, সংসার, অন্ন, জল—সবই তাঁর রূপ। মহাদেব যখন বললেন খাদ্য বা অন্নও ‘মায়া’, তখন পার্বতী বুঝলেন, শিব শুধুমাত্র পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলছেন। প্রকৃতির গুরুত্ব তিনি অস্বীকার করছেন।
দেবী বললেন, “প্রভু, আপনি যদি মনে করেন এই দৃশ্যমান জগত বা প্রকৃতি শুধুই মায়া, তবে আমি চললাম। দেখি আমাকে ছাড়া আপনার এই ‘সত্য’ জগত কীভাবে টিকে থাকে।” এই বলে দেবী পার্বতী কৈলাস থেকে অন্তর্হিত হলেন। মুহূর্তের মধ্যে প্রকৃতিশূন্য হয়ে গেল পৃথিবী।
প্রকৃতিহীন পৃথিবী ও মহাদেবের উপলব্ধি
দেবী অন্তর্হিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ত্রিভুবনে নেমে এল এক ভয়ানক বিপর্যয়। যেহেতু দেবীই হলেন অন্নপূর্ণা বা শস্যের দেবী, তাই তিনি সরে যেতেই পৃথিবী থেকে সমস্ত খাদ্য উধাও হয়ে গেল। গাছের ফল শুকিয়ে গেল, নদীর জল বাষ্প হয়ে গেল, ক্ষেতের ফসল এক নিমেষে ছাই হয়ে গেল।
স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল—তিন লোকে শুরু হলো হাহাকার। মানুষ, পশুপাখি, এমনকি দেবতারাও ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়লেন। চারদিকে শুধু কান্নার রোল—”ত্রাহি ত্রাহি”। ঋষিরা যজ্ঞ করতে পারছেন না, মায়েরা শিশুদের দুধ খাওয়াতে পারছেন না।
কৈলাসে বসে মহাদেব ধ্যানে দেখলেন এই করুণ দৃশ্য। তিনি বুঝলেন, শুধু ‘জ্ঞান’ দিয়ে পেট ভরে না। আত্মা বা ব্রহ্ম সত্য হতে পারে, কিন্তু সেই আত্মাকে ধারণ করে রাখার জন্য শরীর প্রয়োজন। আর শরীর টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন অন্ন। প্রকৃতি বা শক্তি ছাড়া পুরুষ অচল। তাঁর সেই বৈরাগ্য বা দর্শন ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না থামাতে ব্যর্থ।
মহাদেব বুঝলেন, সংসার শুধুই মায়া নয়। ক্ষুধার্তের কাছে এক মুঠো ভাতই হলো পরম সত্য বা ব্রহ্ম।
কাশীতে রান্নাবাড়ি ও মায়ের প্রত্যাবর্তন
নিজের সন্তানদের এই কষ্ট বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলেন না জগজ্জননী। তিনি আবার প্রকট হলেন। তবে এবার কৈলাসে নয়, তিনি ফিরে এলেন মর্ত্যের সবথেকে পবিত্র নগরী কাশীতে। সেখানে তিনি ‘অন্নপূর্ণা’ রূপে আবির্ভূত হলেন।
কাশীতে এসেই দেবী খুললেন এক বিশাল অন্নছত্র। দেবীর স্পর্শে পৃথিবী আবার শস্যে ভরে উঠল। বাতাসে ভাতের গন্ধ, ডালের সুবাস আর পায়েসের মিষ্টতা ছড়িয়ে পড়ল। দেবী ঘোষণা করলেন, “আমার কাশীতে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না। যেই আসুক, আমি তাকে অন্ন দেব।”
খবর পেয়ে ক্ষুধার্ত দেবতারা ছুটে এলেন কাশীতে। আর তাঁদের সঙ্গে এলেন স্বয়ং মহাদেব। তিনি তখন আর যোগী নন, তিনি তখন এক ক্ষুধার্ত সন্তান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সংসার চালাতে গেলে জ্ঞানের সঙ্গে অন্নেরও প্রয়োজন অপরিহার্য।
ভিক্ষা দাও ভবতারিণী: পরম শিক্ষার মুহূর্ত
কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দিরে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি রচিত হলো। দেবী অন্নপূর্ণা স্বর্ণহাতা হাতে অন্ন পরিবেশন করছেন। মহাদেব একটি সাধারণ ভিখারির মতো লাইনে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে ছিল একটি ভিক্ষাপাত্র।
দেবীর সামনে এসে মহাদেব নতজানু হয়ে বললেন, “দেবী, আমি বুঝেছি। জ্ঞান বা মোক্ষ যেমন আত্মার জন্য জরুরি, অন্ন বা আহার তেমন শরীরের জন্য জরুরি। শরীর না থাকলে সাধনা হবে কীভাবে? আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। আমাকে ভিক্ষা দাও ভবতারিণী।” দেবী অন্নপূর্ণা মুচকি হেসে স্বামীর হাতে তুলে দিলেন গরম অন্ন (মতান্তরে পায়েস)। সেই অন্ন গ্রহণ করে মহাদেব তৃপ্ত হলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, “আজ থেকে কাশীতে যে মোক্ষ চাইবে, সে আমার কাছে আসবে। আর যে অন্ন বা জাগতিক শান্তি চাইবে, সে তোমার কাছে আসবে।”
এই কারণেই বলা হয়, কাশীতে বাবা বিশ্বনাথ দেন মুক্তি (মোক্ষ), আর মা অন্নপূর্ণা দেন ভুক্তি (অন্ন বা ভোগ)।
অন্নপূর্ণা মন্দিরের এই দৃশ্য আমাদের শেখায় যে, জীবনকে অস্বীকার করে আধ্যাত্মিকতা হয় না। পেট ভরা থাকলে তবেই ধর্ম হয়। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “খালি পেটে ধর্ম হয় না”—সেই কথাটিই যেন হাজার বছর আগে পুরাণ আমাদের শিখিয়ে গেছে শিব ও অন্নপূর্ণার এই লীলার মাধ্যমে। তাই অন্নপূর্ণা মন্দিরে গেলে শুধু সোনা-দানা বা ঐশ্বর্য চাইবেন না। মনে রাখবেন, মহাদেবও সেখানে ভিক্ষাপাত্র হাতে দাঁড়িয়ে আমাদের শেখাচ্ছেন—অন্নই জীবন, অন্নই ব্রহ্ম।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

