মার্কিন-ইজরায়েল হামলায় নিহত ইরানের সুপ্রিম লিডার। শাহের পতন, খোমেইনির ইসলামিক বিপ্লব এবং এক সাধারণ আলেম থেকে খামেনেইয়ের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। জানুন বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রবিবার সকালে বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পালাবদল ঘটে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের এক ভয়ংকর যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। এই খবরের পরই ইরানের সরকারি টেলিভিশনের পর্দায় সংবাদ পাঠকদের কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হত্যার কথা নিশ্চিত করার পরপরই, ইরান সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে টানা ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ৭ দিনের সরকারি ছুটি।
খামেনেইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই যেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি আস্ত যুগের অবসান ঘটল। কিন্তু আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন একজন নেতার মৃত্যুর জন্য এত দীর্ঘ ৪০ দিনের শোক? আর যিনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শাসনক্ষমতা নিজের মুঠোয় রেখেছিলেন, সেই আলি খামেনেই কীভাবে এই সর্বোচ্চ পদে পৌঁছেছিলেন? তাঁর এই উত্থানের নেপথ্যে জড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ এবং এক রাজবংশের পতন। আসুন, আজ সেই ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখি।
কেন ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক?
শিয়া ইসলামে এবং ইরানি সংস্কৃতিতে ‘চল্লিশ’ বা ‘চেহলাম’ (Chehlum) সংখ্যাটির এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেনের মৃত্যুর ৪০ দিন পর পালিত হয় ‘আরবাইন’। শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রিয়জনের মৃত্যুর পর আত্মা ৪০ দিন পর্যন্ত পৃথিবীর মায়ায় আবদ্ধ থাকে। তাই এই সময়টি শোকপালন এবং প্রার্থনার জন্য নির্দিষ্ট।
আয়াতোল্লা আলি খামেনেই শুধু একজন রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইরানের শিয়া মতাদর্শের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু। তাই তাঁর এই আকস্মিক ও সহিংস মৃত্যুর পর, দেশবাসীকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে এই ৪০ দিনের শোক অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়টি আসলে শুধু কান্নার নয়। এটি হলো দেশের মানুষকে একত্রিত করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধের আগুন জ্বালানোর এক কৌশলগত সময়। যখন কোনো দেশের শীর্ষ নেতা এমন অতর্কিত হামলায় নিহত হন, তখন জনগণের আবেগকে একটি নির্দিষ্ট দিকে চালিত করতে এই দীর্ঘ শোকপালন একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
পহলভি রাজবংশ এবং বিদেশি শক্তির দাবার চাল
খামেনেইয়ের উত্থানের গল্প বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। তখন ইরানে শাসন করত পহলভি রাজবংশ। শাসক ছিলেন রেজ়া শাহ। তিনি দেশের আধুনিকীকরণের জন্য জার্মানির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই ‘জার্মানি-প্রীতি’ মেনে নিতে পারেনি ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের ভয় ছিল, ইরানকে হয়তো জার্মানি নিজেদের সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করবে।
এই আশঙ্কায় ১৯৪১ সালে ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একযোগে ইরানে আক্রমণ চালায়। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রেজ়া শাহ। মিত্রবাহিনী তখন নিজেদের সুবিধার্থে রেজ়া শাহের ২২ বছরের তরুণ পুত্র মহম্মদ রেজ়া পহলভিকে ইরানের সিংহাসনে বসায়। তরুণ শাহ প্রথম থেকেই ব্রিটেনের অনুগত ছিলেন। যদিও দেশে তখন একটি নির্বাচিত সরকার ছিল, কিন্তু শাহ বারবার তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন। এই ব্রিটিশ-ঘেঁষা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ জমতে শুরু করে।
আরও পড়ুনঃ খামেনেয়ের মৃত্যু! মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে, ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
মোসাদ্দেকের পতন এবং শাহের একনায়কতন্ত্র
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে ইরানের রাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। মহম্মদ মোসাদ্দেক নামে এক জাতীয়তাবাদী নেতার উত্থান ঘটে। তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে শাহ তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করতে বাধ্য হন। মোসাদ্দেক ক্ষমতায় এসেই ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ (Nationalization) করেন, যা ব্রিটিশদের স্বার্থে চরম আঘাত হানে।
এর ফলে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে রাজপরিবারের সংঘাত চরমে পৌঁছায় এবং শাহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমেরিকা (CIA) এবং ব্রিটেনের (MI6) গুপ্তচর সংস্থার মদতে এক ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। মোসাদ্দেককে সরিয়ে ফের সগৌরবে ইরানে ফেরেন মহম্মদ রেজ়া পহলভি। এরপর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিত্র। কিন্তু এই ফিরে আসার পর তিনি ধীরে ধীরে একনায়ক হয়ে ওঠেন। নারী স্বাধীনতা বা আধুনিকীকরণ করলেও, তাঁর গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’ (SAVAK) বিরোধীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করে।
খোমেইনির ইসলামিক বিপ্লব (১৯৭৯)
শাহের এই দমনপীড়ন, দুর্নীতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের বিরুদ্ধে ফুঁসছিল ইরানের সাধারণ মানুষ। এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালেন কিছু কট্টর ইসলামি নেতা, যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েও তিনি প্যারিস এবং ইরাক থেকে ক্যাসেট টেপের মাধ্যমে নিজের বৈপ্লবিক বার্তা ইরানে পাঠাতেন।
১৯৭৮ সালে ইরানে গণবিক্ষোভ চরমে ওঠে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শাহকে সরাতে ইসলামপন্থী এবং কট্টর বামপন্থী—উভয় সংগঠনই হাত মিলিয়েছিল। রক্তে ভেসে যায় তেহরানের রাজপথ। অবস্থা বেগতিক দেখে ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে ‘চিকিৎসার অজুহাতে’ চিরতরে দেশ ছাড়েন শাহ। ১৯৭৯ সালের শুরুতে দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে ইরানে ফেরেন খোমেইনি। পতন হয় পহলভি রাজবংশের, জন্ম নেয় ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান’। রাতারাতি বদলে যায় দেশের চরিত্র। আমেরিকা ও ইজরায়েল হয়ে ওঠে ইরানের সবচেয়ে বড় শত্রু।
খোমেইনির ছায়া থেকে খামেনেইয়ের উত্থান
খোমেইনি দশ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব সামলান। ১৯৮৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দেশের এক্সপার্ট অ্যাসেম্বলি এক চরম সংকটে পড়ে। কাকে বসানো হবে দেশের সর্বোচ্চ পদে? খোমেইনির অত্যন্ত আস্থাভাজন শিষ্য হওয়া সত্ত্বেও, ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের বিচারে আলি খামেনেইয়ের পদমর্যাদা খুব একটা উঁচু ছিল না। তিনি ‘গ্র্যান্ড আয়াতোল্লা’ ছিলেন না।
কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর সমর্থন নিয়ে সম্পূর্ণ অভাবনীয়ভাবে আলি খামেনেইকে সুপ্রিম লিডার ঘোষণা করা হয়। সংবিধানের কিছু নিয়মে পরিবর্তন এনে তাঁকে ‘আয়াতোল্লা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যে মানুষটি একসময় তলস্তয় আর ভিক্টর হুগো পড়তে ভালোবাসতেন, তিনিই হয়ে উঠলেন ইরানের সর্বেসর্বা। তিনি প্রমাণ করলেন যে, তাঁর কথায় নির্বাচিত সরকারও স্রেফ হাতের পুতুল।
ক্ষোভের আগুন এবং মাহসা আমিনি
ক্ষমতায় আসার পর খামেনেই অত্যন্ত কঠোর হাতে দেশ শাসন শুরু করেন। রাজনৈতিক স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক অধিকার বা নারী স্বাধীনতার পক্ষে কেউ কথা বললেই তাঁকে নির্মমভাবে দমন করা হতো। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে ইরানের যুব সমাজ এই একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে পথে নামতে শুরু করে।
পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ২০২২ সালে। ১৬ই অক্টোবর ঠিক মতো হিজাব না পরার ‘অপরাধে’ নীতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন ২২ বছরের কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনি। পুলিশি হেফাজতে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর পর গোটা ইরান জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। খামেনেইয়ের হিজাব-ফতোয়া অমান্য করে মহিলারা চুল কেটে, হিজাব পুড়িয়ে রাস্তায় নামেন। এর পাশাপাশি গত বছর থেকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের কারণে সাধারণ মানুষ তেহরান-সহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখান। তাদের একটাই দাবি ছিল—ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার অবসান।
ট্রাম্পের আঘাত এবং ভবিষ্যতের ইরান
দেশের ভেতরে যখন এই গণবিক্ষোভ চলছে, তখন বাইরে থেকে চাপ বাড়াতে শুরু করে আমেরিকা ও ইজরায়েল। ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র, যিনি আমেরিকায় থাকেন, তিনিও এই আন্দোলনে মদত দেওয়া শুরু করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর ছিল।
এই প্রবল টানাপোড়েনের মাঝেই শনিবার মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনী খামেনেইয়ের সুরক্ষিত ঠিকানায় অতর্কিত হামলা চালায়। জানা গেছে, নিজের অফিসে কাজ করার সময় এই হামলায় খামেনেইয়ের সঙ্গে তাঁর কন্যা এবং নাতনিও নিহত হয়েছেন। খামেনেই হয়তো আর নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে ইরানে এক বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলো। এই ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের আড়ালে কি ইরানে নতুন কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হবে? নাকি সাধারণ মানুষ এই সুযোগে পুরোপুরি ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা উপড়ে ফেলবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী কয়েক সপ্তাহের গর্ভে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- খামেনেয়ের মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যে বিস্ফোরক প্রতিশোধ রাজনীতি ! কেন দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্রে ইরানের ড্রোন হামলা?
- খামেনেইয়ের মৃত্যু ও ৪০ দিনের শোক! পহলভি রাজবংশের পতন থেকে কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেন তিনি?
- খামেনেয়ের মৃত্যু! মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে, ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
- রাতের শহরে মহিলাদের সুরক্ষায় বিশেষ বাহিনী রাজ্য সরকারের │ জানুন, কী সেই উদ্যোগ
- আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা! তিন ধাপে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ, কীভাবে জানবেন আপনার নাম আছে কি না?

