Ballygunge Assembly Election 2026: বালিগঞ্জে তৃণমূলের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতে এবার নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে তরুণ সিপিএম প্রার্থী আফরিন বেগম। অভিজ্ঞ শোভন দেবের বিরুদ্ধে তরুণ মুখের লড়াইয়ে কোন দিকে ঝুঁকছে ভোটের অঙ্ক, দেখুন ওয়ার্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দক্ষিণ কলকাতার রাজনীতিতে বালিগঞ্জ এমন এক বিধানসভা কেন্দ্র, যার রাজনৈতিক গুরুত্ব বরাবরই রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। একসময় এই কেন্দ্র ছিল প্রয়াত তৃণমূল নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গড়। তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই জিতে রাজনৈতিক পুনর্জন্ম ঘটে বাবুল সুপ্রিয়র। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বালিগঞ্জের ছবি আর আগের মতো নয়।
এবারের লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান মুখ শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের (৮২ বছর) সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন সিপিএমের তরুণ মুখ আফরিন বেগম। বিজেপি ও কংগ্রেসও প্রার্থী দিলেও, পরিসংখ্যান ও ময়দানের বাস্তবতা বলছে— মূল লড়াই এবার তৃণমূল বনাম বামের।
বালিগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায় এই কেন্দ্রকে নিজের রাজনৈতিক দুর্গে পরিণত করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে বিজেপি ছেড়ে সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া বাবুল সুপ্রিয়কে প্রার্থী করে দল। বাবুল জয়ী হন, পরে রাজ্যের মন্ত্রীও হন।
তবে বাবুলকে রাজ্যসভায় পাঠানোর পর আবার নতুন মুখ খুঁজতে হয় তৃণমূলকে। সেই জায়গায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভরসা রেখেছেন দলের অন্যতম প্রবীণ ও বিশ্বস্ত সৈনিক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের উপর। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির পুরনো বিধায়কদের অন্যতম এবং দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একজন। ভবানীপুর ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জায়গা দেওয়া থেকে শুরু করে খড়দহে জয়— তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পরিষ্কার ভাবমূর্তি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন, সংগঠনে গভীর দখল থাকা মানুষটির উপরেই ভরসা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে বালিগঞ্জ তাঁর নিজস্ব কেন্দ্র নয়। ফলে স্থানীয় সংগঠন, ওয়ার্ডভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অভাব তাঁকে কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারে।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত মুখ নিঃসন্দেহে সিপিএম প্রার্থী আফরিন বেগম। মাত্র ২৯ বছর বয়সী এই তরুণ গবেষক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ। এসএফআই রাজনীতি থেকে উঠে আসা আফরিন ইতিমধ্যেই বাম ছাত্র-যুব রাজনীতির লড়াকু প্রতীক হয়ে উঠেছেন। নির্বাচন কমিশনের সামনে দলের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখার পর থেকেই তাঁর নাম রাজ্য রাজনীতিতে আলোচিত হতে শুরু করে। এবার সেই আফরিনকে সিপিএম সরাসরি বালিগঞ্জের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে।
বিজেপির প্রার্থী ডাঃ শতরূপা, যিনি বেনিয়াপুকুর এলাকার বাসিন্দা। তবে গত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, বালিগঞ্জে বিজেপির ভিত্তি এখনও তুলনামূলক দুর্বল। গত বিধানসভায় এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট ছিল প্রায় ২১ শতাংশের আশেপাশে।
অন্যদিকে কংগ্রেস প্রার্থী রোহন মিত্র, প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্রের পুত্র। শিক্ষিত ও তরুণ মুখ হলেও তাঁকে প্রার্থী করাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের অন্দরে গোষ্ঠীকোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে কংগ্রেসের সংগঠনিক দুর্বলতা এই কেন্দ্রে তাদের লড়াইকে কার্যত ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।
ওয়ার্ডভিত্তিক সমীকরণ: কোথায় এগিয়ে কে? (Ballygunge Assembly Election 2026)
বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের এবারের নির্বাচনে ওয়ার্ডভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে— সামগ্রিকভাবে তৃণমূল এখনও এগিয়ে থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে সিপিএম প্রার্থী আফরিন বেগম উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এবং তরুণ ভোটারপ্রধান এলাকাগুলিতে লড়াই আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
বালিগঞ্জ সার্কুলাররোড / দেশপ্রাণ শাসমল রোড সংলগ্ন, রাসবিহারী সংলগ্ন ৬৮ ও ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের স্পষ্ট প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। এই আবাসিক ও মধ্যবিত্ত বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। তিনি বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের কাছাকাছি বসবাস করায় স্থানীয় ভোটারদের একাংশের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তার পাশাপাশি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্য সাথী-র মতো সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী মহিলা ভোটারদের বড় অংশ এই এলাকায় তৃণমূলের পক্ষে দৃঢ় বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।
বেনিয়াপুকুর ও তপসিয়া সংলগ্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে এ বার নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
আফরিন বেগম নিজে মুসলিম, উচ্চশিক্ষিত ও তরুণ মুখ হওয়ায় সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে SIR/ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ইস্যুতে সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ থাকায় সেই ক্ষোভের রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে সিপিএম। ৬০ নম্বর ওয়ার্ড (বেনিয়াপুকুরের উত্তরাংশ)-এ ২০২২ সালের উপনির্বাচনে সিপিএম মাত্র ২২৮ ভোটে পিছিয়েছিল। এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, এখানে সিপিএমের ভিত্তি আগেই তৈরি হয়েছে।
এবার আফরিনের মতো তরুণ ও পরিচিত সংখ্যালঘু মুখ থাকায় এই ওয়ার্ডে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা আগের চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ৬১ নম্বর ওয়ার্ড (বেনিয়াপুকুর দক্ষিণাংশ)-এ সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রাধান্য থাকলেও তৃণমূলের পৌরস্তরের সংগঠন অত্যন্ত শক্তিশালী। আফরিনের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এখানে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে মাঠপর্যায়ের সংগঠন এবং বুথ ম্যানেজমেন্টে তৃণমূল এখনও এগিয়ে।
৬৪ নম্বর ওয়ার্ড এবারের নির্বাচনে সিপিএমের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এলাকা। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই ওয়ার্ডে ২০২২ সালের উপনির্বাচনে সিপিএম ৯৯৮ ভোটে এগিয়েছিল। এমনকি বাবুল সুপ্রিয়র উপনির্বাচনেও এই ওয়ার্ডে বামেদের লিড ছিল। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— বালিগঞ্জে যদি তৃণমূলের কোনও দুর্বল ঘাঁটি থাকে, তবে সেটি ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড। এবার আফরিনের প্রার্থী হওয়ায় এই লিড আরও বাড়তে পারে। লর্ড সিনহা রোড–পার্ক সার্কাস সংলগ্ন ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে মধ্যবিত্ত বাঙালি ও সংখ্যালঘু ভোটারের মিশ্র উপস্থিতি রয়েছে। গড়িয়াহাট বাজার সংলগ্ন ৮৫ নম্বর ওয়ার্ড বালিগঞ্জ কেন্দ্রের সবচেয়ে বাণিজ্যিক অংশ। এখানে ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত ভোটারের মিশ্রণ রয়েছে। তৃণমূলের কাউন্সিলর নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী, বিজেপি ব্যবসায়ী মহলে কিছুটা প্রভাব রাখে।
বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের গত তিনটি বড় নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়— এই কেন্দ্রে ভোটের সমীকরণ দ্রুত বদলেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই কেন্দ্রে পেয়েছিল ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট, যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ২০ শতাংশের কিছু বেশি এবং সিপিএমের ভোট ছিল মাত্র ৫ শতাংশের সামান্য উপরে।
কিন্তু ২০২২ সালের উপনির্বাচনে সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। সেই নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয় প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন, অন্যদিকে সিপিএম প্রার্থী সায়রা শাহ হালিম পান প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে বিজেপির ভোটে— ২০২১ সালের ২০ শতাংশের বেশি ভোট নেমে ১০ শতাংশের নীচে চলে আসে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির সেই হারানো ভোটের বড় অংশ সোজা সিপিএমের ঝুলিতে গিয়েছিল।
২০২১-এর ৭০ শতাংশ থেকে ২০২২ উপনির্বাচনে তৃণমূলের ভোট নেমে প্রায় ৫০ শতাংশে আসার পিছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়েছিল বাবুল সুপ্রিয়কে ঘিরে তৃণমূলের অন্দরের অসন্তোষ। দলের একাংশের মধ্যে বাবুলের প্রার্থিতা নিয়ে অনীহা ছিল, যার প্রভাব ভোটবাক্সে পড়েছিল বলেই মনে করা হয়।
কিন্তু এবার সেই পরিস্থিতি নেই। তৃণমূলের প্রার্থী শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় (Ballygunge Assembly Election 2026), দলের প্রবীণ, গ্রহণযোগ্য ও তুলনামূলক বিতর্কহীন মুখ। তাঁকে ঘিরে দলীয় কোন্দলের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ৬৪ ও ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে মুসলিম ভোটের একটি অংশ তৃণমূল ছেড়ে বামের দিকে সরে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে সিপিএমের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— বালিগঞ্জের প্রায় ২৭ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার থাকার কারণে বিজেপির পক্ষে এই কেন্দ্রে মূল বিকল্প হয়ে ওঠা কঠিন। সমীক্ষা বলছে— যদি সিপিএম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওয়ার্ডগুলিতে বড় লিড নিতে পারে এবং তার সঙ্গে শিক্ষিত হিন্দু ভোটারদের একাংশকেও টানতে পারে, তাহলে বালিগঞ্জে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যেতে পারে। সব মিলিয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সমীক্ষা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসকেই এগিয়ে রাখছে এই কেন্দ্রে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার চলবে বেশি দিন

