Harish Rana Euthanasia : হৃতিক রোশনের সেই বিখ্যাত ‘গুজারিশ’ সিনেমার গল্প মনে আছে? ১৩ বছর ধরে বিছানায় শুয়ে থাকা এক জীবন্ত লাশের মৃত্যুভিক্ষা চেয়ে আদালতের দরজায় ঘুরেছেন! অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক রায়। কী এই ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু? আইনের চোখে এটি কতটা বৈধ? জানুন হরীশ রানার সেই বুকফাটা যন্ত্রণার গল্প।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সঞ্জয়লীলা বনসালীর বিখ্যাত বলিউড ছবি ‘গুজারিশ’ (Guzaarish)-এর কথা মনে আছে? হৃতিক রোশন অভিনীত সেই চরিত্র, ইথান মাসকারেনহাস। একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান জাদুকর, যিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গলা থেকে নিচ পর্যন্ত সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (Quadriplegic) হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলেন দীর্ঘ ১৪ বছর। বেঁচে থাকার কোনো আশা নেই, অথচ মস্তিষ্ক সজাগ। শেষমেশ সেই যন্ত্রণাময় জীবন থেকে মুক্তি পেতে তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেছিলেন ‘ইচ্ছামৃত্যু’ বা ইউথেনেশিয়া (Euthanasia)-র। সিনেমার পর্দায় ইথানের সেই আর্তনাদ দর্শকদের কাঁদিয়েছিল। কিন্তু কে জানত, সিনেমার সেই করুণ চিত্রনাট্য একদিন বাস্তবে নেমে আসবে?
দিল্লির হরীশ রানার গল্পটা ঠিক যেন ইথান মাসকারেনহাসের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তফাৎ শুধু একটাই—ইথান নিজেই নিজের মৃত্যুর আবেদন করতে পেরেছিলেন, আর হরীশের ক্ষেত্রে তাঁর যন্ত্রণায় ছটফট করা শরীরটাকে মুক্তি দিতে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় বছরের পর বছর কড়া নেড়েছেন তাঁর অসহায় বাবা-মা। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিছানায় পড়ে থাকা এক ‘জীবন্ত লাশ’ এই হরীশ রানা। অবশেষে, বুধবার ভারতের আইনি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশে এই প্রথমবার আইনিভাবে ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ (Passive Euthanasia) বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি পেলেন কেউ।
আজ NewsOffBeat-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব, কে এই হরীশ রানা? কেন তাঁকে মৃত্যুর অনুমতি দিল আদালত? আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ আসলে কী? আসুন, জেনে নিই এক অসীম করুণা আর ভালোবাসার বাস্তব গল্প।
কে এই হরীশ রানা? কী ঘটেছিল ১৩ বছর আগে?
সালটা ২০১৩। অগস্ট মাসের ২০ তারিখ, রাখিবন্ধনের দিন। ২০ বছর বয়সী এক তরতাজা যুবক হরীশ রানা। চণ্ডীগড়ের পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে (Panjab University) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, নিজের পেয়িং গেস্ট (PG) আবাসনের চারতলা থেকে হঠাৎ নিচে পড়ে যান তিনি।
এই একটি মাত্র মুহূর্তের দুর্ঘটনা তাঁর গোটা জীবনটাকে তছনছ করে দেয়। মাথায় চরম আঘাত লাগে। চিকিৎসকদের শত চেষ্টার পরও হরীশ ১০০ শতাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (100% Quadriplegic disability) হয়ে পড়েন। গত ১৩ বছর ধরে তিনি ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’ (Persistent Vegetative State – PVS) বা সম্পূর্ণ কোমায় আচ্ছন্ন। চোখ খোলে, কিন্তু সে চোখের কোনো দৃষ্টি নেই। ডাকলে সাড়া নেই, কোনো অনুভূতি নেই। শুধু কৃত্রিমভাবে নল দিয়ে খাবার (Clinically Administered Nutrition and Hydration – CANH) এবং অক্সিজেনটুকু তাঁর শরীরে পৌঁছাচ্ছে বলে তাঁর হৃৎপিণ্ডটা ধুকধুক করছে। ডাক্তাররা আগেই জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা জানিয়ে দেন, হরীশের মস্তিষ্ক প্রায় মৃত, তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আক্ষরিক অর্থেই ‘শূন্য’।
নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবার: “আমাদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই”
ছেলের এই পরিণতি কোনো বাবা-মায়ের পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রথম কয়েক বছর হরীশের পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিল—হয়তো কোনো অলৌকিক শক্তিতে ছেলে একদিন চোখ খুলে মা বলে ডাকবে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটেছে, হরীশ বিছানার সঙ্গে মিশে গেছেন।
এই দীর্ঘ চিকিৎসায় হরীশের পরিবার কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ভাইয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে হরীশের দাদা আশিস রানাকে তাঁদের দ্বারকার বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়। প্রতি মাসে ওষুধপত্র, নলের খাবার এবং আনুষঙ্গিক চিকিৎসার জন্য খরচ হচ্ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। শুধু টাকা নয়, চোখের সামনে নিজের তরুণ সন্তানকে তিলে তিলে পচে যেতে দেখার যে মানসিক যন্ত্রণা, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
শেষমেশ, ছেলের এই সীমাহীন যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে, তাঁকে সসম্মানে মৃত্যুর অধিকার দিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন তাঁর বাবা-মা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনি লড়াই এবং ‘লাইফ সাপোর্ট’-এর নতুন সংজ্ঞা
সুপ্রিম কোর্টে এই মামলাটি মোটেই সহজ ছিল না। ভারতে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে (Common Cause v. Union of India) ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বা পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুকে শর্তসাপেক্ষে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই রায়ে বলা হয়েছিল, যদি রোগী ভেন্টিলেটরের (Ventilator) মতো ‘মেকানিক্যাল লাইফ সাপোর্ট’-এ থাকেন, তবেই তা খুলে নেওয়া যাবে।
কিন্তু হরীশের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ভেন্টিলেটরে ছিলেন না, তিনি বেঁচে ছিলেন ‘ফিডিং টিউব’ বা কৃত্রিম খাবারের নলের সাহায্যে। প্রথমে আদালত এই আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল এই যুক্তিতে যে খাবার বন্ধ করে দেওয়াটা প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার আওতায় পড়ে না।
কিন্তু এই মামলাটি নিয়ে বিস্তর আইনি তর্কবিতর্ক চলে। বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা (Justice J.B. Pardiwala) এবং বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথন (Justice K.V. Viswanathan)-এর বেঞ্চ এই হৃদয়বিদারক মামলার শুনানি করেন। তাঁরা খোদ হরীশের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেন। বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, “আমাদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। আমাদের ছেলেকে মুক্তি দিন।”
ঐতিহাসিক রায়: “টু বি অর নট টু বি…”
অবশেষে বুধবার, ১১ই মার্চ, ২০২৬—সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক এবং মানবিক রায় দেয়। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত ‘হ্যামলেট’ (Hamlet) নাটকের সেই অমোঘ উক্তি “টু বি অর নট টু বি…” (To be or not to be) উচ্চারণ করে বিচারপতি পারদিওয়ালা তাঁর রায় পড়া শুরু করেন।
আদালত জানায়, জীবন মানে শুধু শ্বাস নেওয়া নয়, জীবন মানে হলো মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা। হরীশের এই যন্ত্রণাদায়ক জীবন প্রলম্বিত করা কোনোভাবেই তাঁর জন্য মঙ্গলের নয় (not in his best interest)। মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, যেহেতু তাঁর সুস্থ হওয়ার কোনো আশাই নেই, তাই তাঁকে কৃত্রিমভাবে খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখাটা একপ্রকার অমানবিকতা। সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের মাধ্যমে ‘লাইফ সাপোর্ট’-এর সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করে জানায় যে, কৃত্রিম পুষ্টি (CANH) বা টিউব হাইড্রেশনকেও চিকিৎসা বা মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট হিসেবে ধরা হবে এবং প্রয়োজনে তা প্রত্যাহার করা যাবে।
আদালত নির্দেশ দেয় যে, হরীশ রানাকে অবিলম্বে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর প্যালিয়েটিভ কেয়ার (Palliative Care) বিভাগে ভর্তি করতে হবে। সেখানে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে এবং চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর শরীর থেকে কৃত্রিম খাবারের নল এবং জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হবে, যাতে তিনি শান্তিতে এবং মর্যাদার সঙ্গে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন।
অ্যাক্টিভ বনাম প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া: পার্থক্য কোথায়?
সাধারণ মানুষের মনে অনেক সময় এই ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি থাকে। আসুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিষয়টি একটু সহজ করে বুঝে নেওয়া যাক:
- অ্যাক্টিভ ইউথেনেশিয়া (Active Euthanasia): এটি হলো প্রত্যক্ষ বা সক্রিয় ইচ্ছামৃত্যু। এই পদ্ধতিতে রোগীর কষ্ট লাঘব করার জন্য চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে বাইরে থেকে কোনো প্রাণঘাতী ইনজেকশন বা ওষুধ প্রয়োগ করেন, যার ফলে দ্রুত মৃত্যু ঘটে। এটি বিশ্বের খুব কম দেশেই বৈধ এবং ভারতে এটি সম্পূর্ণ বেআইনি বা অবৈধ।
- প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া (Passive Euthanasia): এটি হলো পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু। এখানে বাইরে থেকে বিষ প্রয়োগ করে মারা হয় না। বরং, যে কৃত্রিম জীবনদায়ী যন্ত্রপাতির (যেমন—ভেন্টিলেটর, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ফিডিং টিউব) সাহায্যে রোগীকে জোর করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, সেই সাপোর্টগুলো শুধু সরিয়ে নেওয়া হয় বা উইথড্র (Withdraw) করা হয়। এর ফলে প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে রোগীকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেয়। হরীশ রানার ক্ষেত্রে এই প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ারই অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
“ভালোবাসা মানে পরিত্যাগ করা নয়…”
এই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা হরীশের বাবা-মায়ের ভালোবাসার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আদালত অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় বলেছে, “মানবজীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি মৃত্যু নয়, বরং পরিত্যাগ করা (abandonment)। এত বড় একটা বিপর্যয়ের পরও হরীশের পরিবার তাঁকে ছেড়ে যায়নি। তাঁরা ১৩ বছর ধরে তাঁর সেবা করেছেন। ছেলের এই নিষ্কৃতিমৃত্যু চাওয়াটা তাঁদের নিষ্ঠুরতা নয়, বরং এটি হলো অসীম ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ, যাতে তাঁদের সন্তান সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে পারে।”
মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার
হরীশ রানার এই মামলা ভারতের বিচারব্যবস্থা এবং চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের (Medical Ethics) ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। আমাদের দেশে প্রতিদিন বহু মানুষ এমন ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন, যাঁদের বাঁচার কোনো আশা নেই, শুধু যন্ত্রের জোরে তাঁদের টিকিয়ে রেখে পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও শুষে নেওয়া হয়। হরীশের মামলা প্রমাণ করল যে, সংবিধানে যেমন ‘রাইট টু লাইফ’ (Right to Life) বা বাঁচার অধিকার (Article 21) আছে, তেমনই সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার বা ‘রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি’ (Right to Die with Dignity)-ও মানুষের একটি মৌলিক অধিকার।
‘গুজারিশ’ সিনেমার শেষে ইথান মাসকারেনহাসকে জীবনের সব গ্লানি ভুলে হাসিমুখে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে দেখা যায়। ১৩ বছরের অমানবিক যন্ত্রণার পর, দিল্লির হরীশ রানাও এবার সব ব্যথা ভুলে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দেবেন। এক বুক কষ্ট নিয়ে হলেও, বাবা-মায়ের শেষ প্রার্থনা অবশেষে পূর্ণ হলো।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট মিটার নিয়ে আর চিন্তা নয়! আগাম টাকা দিতে হবে কি? জেনে নিন এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- অভিষেকের ছায়াসঙ্গী সুমিত রায়ের নাম কেন বারবার উঠে আসছে? অভিযোগের তালিকায় কোন কোন মামলা?
- একের পর এক বিদ্রোহ, ছিন্নভিন্ন তৃণমূল! পর্দার আড়াল থেকে সুতো টানছেন কে? নেপথ্যে কোন অদৃশ্য শক্তি?
- চাকরির টোপে প্রতারণার অভিযোগ, মদন মিত্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, নেপথ্যে উঠে আসছে কোন তথ্য?
- অভিষেকের বাড়িতে তল্লাশি, কেন পৌঁছে গেলেন মমতা? কী মিলল?

