New West Bengal Acting Governor RN Ravi Biography Controversy: সি ভি আনন্দ বোসের আচমকা পদত্যাগের পর বাংলার অস্থায়ী রাজ্যপালের দায়িত্ব নিচ্ছেন আর. এন. রবি। বিহারের গ্রাম থেকে উঠে আসা এক দাপুটে আইপিএস অফিসার, যিনি তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিন সরকারের ‘চোখের বালি’ হয়ে উঠেছিলেন! কে এই আর. এন. রবি? ছোটবেলা, শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে তামিলনাড়ুর চরম বিতর্ক এবং বাংলায় তাঁর আগমনের নেপথ্যের আসল কারণ জানুন বিস্তারিত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ্য রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এক চরম পালাবদল ঘটে চলেছে। প্রাক্তন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস আচমকা পদত্যাগ করার পর থেকেই নবান্ন থেকে শুরু করে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে জল্পনা তুঙ্গে ছিল—কে আসছেন বাংলার পরবর্তী রাজ্যপাল হয়ে? কার কাঁধে দেওয়া হবে এই গুরুদায়িত্ব? সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দিল্লি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলার অস্থায়ী রাজ্যপাল (Acting Governor) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তামিলনাড়ুর বর্তমান রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি, যিনি আর. এন. রবি (R. N. Ravi) নামেই সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বেশি পরিচিত।
যাঁরা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত খবর রাখেন, তাঁরা এই নামটির সঙ্গে অত্যন্ত ভালোভাবে পরিচিত। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল থাকাকালীন তিনি সেখানকার শাসক দল ডিএমকে (DMK) এবং মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের সঙ্গে যে পরিমাণ সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, তা স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে রীতিমতো নজিরবিহীন। কিন্তু কে এই আর. এন. রবি? একজন সাধারণ গ্রামের ছেলে থেকে কীভাবে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ গোয়েন্দা কর্তা এবং পরবর্তীতে রাজ্যপাল হয়ে উঠলেন? তামিলনাড়ুতেই বা তাঁকে নিয়ে এত বিতর্ক কেন? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহে কেন তাঁকেই বেছে নিয়ে বাংলায় পাঠানো হলো?
আজ NewsOffBeat-এর এই বিশেষ এবং বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আর. এন. রবির জীবনের পাতা উল্টে দেখব। তাঁর জন্ম, শৈশব, শিক্ষাজীবন, আইপিএস হিসেবে কেরিয়ার এবং তামিলনাড়ুর বিতর্ক—সবকিছুর এক নিখুঁত ও গল্পময় বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো আপনাদের জন্য।
শৈশব, বেড়ে ওঠা ও স্কুলজীবন: বিজ্ঞানের প্রেমে মগ্ন এক ‘সাইলেন্ট অবজারভার’
রবীন্দ্র নারায়ণ রবির জীবনের শুরুটা কোনো রাজপ্রাসাদ বা বিলাসবহুল পরিবেশে হয়নি। ১৯৫২ সালের ৩রা এপ্রিল বিহারের পাটনা জেলার এক অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর জন্ম। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা রবির ছোটবেলা কেটেছে মাটির গন্ধ মেখে এবং বইয়ের পাতায় ডুবে থেকে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ধীরস্থির এবং মেধাবী একজন ছাত্র। তাঁর স্কুলজীবনের শিক্ষকদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, রবি কখনোই ক্লাসের সবচেয়ে বেশি কথা বলা বা চঞ্চল ছেলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ‘সাইলেন্ট অবজারভার’ বা নীরব পর্যবেক্ষক। পেছনের বেঞ্চে বসেও শিক্ষকদের প্রতিটি কথা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তাঁর এক বিজ্ঞানের শিক্ষক তাঁকে নিয়ে বলতেন, “এই ছেলেটার মধ্যে সব কিছুকে বিশ্লেষণ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। ও সহজে কিছু বিশ্বাস করে না, যতক্ষণ না তার পেছনের যুক্তিটা বুঝতে পারছে।” স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষাতেই তিনি অসাধারণ রেজাল্ট করতেন, বিশেষ করে অঙ্ক এবং বিজ্ঞানে তাঁর মেধা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিহারের মাটি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফল করার পর, উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি দেন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে (Allahabad University)। সেখানে তিনি পদার্থবিদ্যা বা ফিজিক্স (Physics) নিয়ে স্নাতক এবং পরবর্তীতে মাস্টার্স (M.Sc) সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষকদের ধারণা ছিল, রবি হয়তো ভবিষ্যতে একজন বড় বিজ্ঞানী বা গবেষক হবেন। কিন্তু তাঁর নিয়তিতে লেখা ছিল অন্য কিছু।
সাংবাদিকতা থেকে আইপিএস: কর্মজীবনের এক বর্ণময় রূপান্তর
এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স করার পর, রবির ভেতরে দেশের সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে কাজ করার এক অদ্ভুত তাগিদ জন্ম নেয়। অবাক করার মতো বিষয় হলো, তিনি তাঁর কেরিয়ার শুরু করেছিলেন একজন সাংবাদিক হিসেবে! খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও সাংবাদিকতার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সমাজের একেবারে তৃণমূল স্তরের সমস্যাগুলো বুঝতে এবং তথ্য বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর গোয়েন্দা জীবনে বিরাট কাজে আসে।
সাংবাদিকতায় কিছুদিন কাজ করার পরই তিনি বুঝতে পারেন যে, দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে কাজ না করলে বৃহত্তর পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এরপর শুরু হয় ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার প্রস্তুতি। নিজের অদম্য জেদ এবং মেধার জোরে তিনি ১৯৭৬ সালে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস (IPS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং তাঁকে কেরালা ক্যাডার (Kerala Cadre) দেওয়া হয়।
গোয়েন্দা জীবন ও স্পাই-মাস্টার: উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’
কেরালা ক্যাডারের আইপিএস অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, খুব দ্রুত তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতার জন্য তাঁকে সেন্ট্রাল ডেপুটেশনে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবি-তে (Intelligence Bureau – IB) নিয়ে আসা হয়। আর এই আইবি-তেই তাঁর জীবনের একটি বড় এবং সোনালি অধ্যায় কেটেছে।
আর. এন. রবিকে ভারতের গোয়েন্দা মহলে উত্তর-পূর্ব ভারতের (North-East India) একজন অন্যতম সেরা বিশেষজ্ঞ বা ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি আইবি-র হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন চরমপন্থী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দমনের কাজ করেছেন।
তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় মাস্টারস্ট্রোক ছিল ২০১৪ সালে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর, আর. এন. রবিকে ‘নাগা পিস টক’ (Naga Peace Talks)-এর জন্য কেন্দ্রের প্রধান মধ্যস্থতাকারী (Interlocutor) হিসেবে নিয়োগ করা হয়। নাগাল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এনএসসিএন-আইএম (NSCN-IM)-এর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে টেবিলে বসে তিনি যে ধৈর্য এবং কূটনৈতিক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়। তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক নাগা শান্তি চুক্তি (Naga Peace Accord) স্বাক্ষরিত হয়। এরপর তিনি দেশের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার (Deputy NSA) হিসেবেও অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবিধানিক পদে প্রবেশ: রাজনীতি নয়, প্রশাসনের নতুন মোড়ক
যাঁরা সারা জীবন ছায়ায় থেকে গোয়েন্দাগিরি করেছেন, তাঁরা সাধারণত অবসরের পর লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু আর. এন. রবির প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংকট মোকাবিলার ক্ষমতাকে কেন্দ্র সরকার হারাতে চায়নি।
২০১৯ সালে তাঁকে প্রথমবার নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল করে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর কড়া নজরদারি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর তাঁকে মেঘালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত অধ্যায়টি শুরু হয় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন তাঁকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করে পাঠায় দিল্লি।
তামিলনাড়ুতে রাজ্যপাল আর. এন. রবি: এক ধারাবাহিক সংঘাতের ইতিহাস
তামিলনাড়ুতে পা রাখার পর থেকেই সেখানকার ডিএমকে (DMK) পরিচালিত স্ট্যালিন সরকারের সঙ্গে রবির কার্যত এক ‘শীতল যুদ্ধ’ শুরু হয়ে যায়। একজন কড়া আইএএস বা আইপিএস অফিসার যখন সাংবিধানিক পদে বসেন, তখন তিনি সাধারণত রাজ্য সরকারের রাবার স্ট্যাম্প হতে চান না। রবির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। তামিলনাড়ুতে তাঁকে নিয়ে যে বড় বড় বিতর্কগুলো তৈরি হয়েছিল, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বিলে সই না করা এবং ‘নিট’ (NEET) বিতর্ক: মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের সরকারের সঙ্গে রবির প্রথম বড় সংঘাত বাঁধে তামিলনাড়ু বিধানসভায় পাশ হওয়া বিভিন্ন বিল নিয়ে। রাজ্য সরকারের অভিযোগ ছিল, রাজ্যপাল ইচ্ছে করে মাসের পর মাস বিল আটকে রাখছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ‘অ্যান্টি-নিট বিল’ (Anti-NEET Bill)। তামিলনাড়ু সরকার চাইছিল সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ থেকে রাজ্যকে বাদ দিতে। কিন্তু রাজ্যপাল রবি এই বিলে সই করতে পরিষ্কার অস্বীকার করেন এবং বিলটি ফেরত পাঠান। তিনি প্রকাশ্যে জানান, এই ধরনের বিল সাধারণ গরিব ছাত্রছাত্রীদের সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবে।
২. বিধানসভা থেকে ওয়াকআউট (জানুয়ারি ২০২৩): স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটি ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। ২০২৩ সালের ৯ই জানুয়ারি তামিলনাড়ু বিধানসভায় রাজ্যপালের প্রথাগত ভাষণের দিন এক চরম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রথা অনুযায়ী রাজ্য সরকারকে যে ভাষণ লিখে দেওয়ার কথা, রাজ্যপাল রবি তা হুবহু না পড়ে বেশ কিছু অংশ (বিশেষ করে দ্রাবিড় নেতাদের নাম এবং ‘দ্রাবিড়িয়ান মডেল’ শব্দগুলো) বাদ দিয়ে নিজের মতো করে পড়েন। এর তীব্র প্রতিবাদ করেন মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন। বিধানসভার ভেতরেই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনা হয়। এর প্রতিবাদে ভাষণ শেষ না করেই বিধানসভা কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যান আর. এন. রবি।
৩. ‘তামিলনাড়ু’ বনাম ‘তামিঝাগাম’ নাম বিতর্ক: রাজ্য রাজনীতিতে আরও একটি বড় বিতর্কের জন্ম দেন রবি, যখন তিনি একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে পরামর্শ দেন যে রাজ্যের নাম ‘তামিলনাড়ু’ (Tamil Nadu – যার অর্থ তামিল দেশ)-এর বদলে ‘তামিঝাগাম’ (Thamizhagam – তামিলদের বাসস্থান) হওয়া উচিত। ডিএমকে এবং অন্যান্য তামিল জাতীয়তাবাদী দলগুলো একে তাদের ভাষা, ঐতিহ্য এবং দ্রাবিড় আবেগের ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে মনে করে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় “গেট আউট রবি” (Get Out Ravi) পোস্টার পড়ে যায়।
৪. সনাতন ধর্ম এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে মন্তব্য: আর. এন. রবি বহুবার তাঁর ভাষণে সনাতন ধর্মের (Sanatana Dharma) গুণগান গেয়েছেন এবং প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের কথা বলেছেন। তামিলনাড়ুর মতো দ্রাবিড়িয়ান এবং ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) রাজনীতির আঁতুড়ঘরে তাঁর এই ধরনের মন্তব্যগুলো শাসক দলের কাছে চরম উসকানিমূলক বলে মনে হয়েছিল। ডিএমকে নেতৃত্ব বারবার অভিযোগ করেছে যে তিনি রাজ্যপাল হিসেবে নয়, বরং আরএসএস (RSS) বা বিজেপির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন।
আরও পড়ুনঃ কেন পদত্যাগ রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের? কারণ জানলে চমকে উঠবেন!
কেন তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হলো? (সম্ভাব্য কারণ ও বিশ্লেষণ)
সি ভি আনন্দ বোসের পদত্যাগের পর, কেন্দ্র সরকার চাইলে অন্য যেকোনো শান্ত রাজ্যের রাজ্যপালকে বাংলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দিতে পারত। কিন্তু তামিলনাড়ু থেকে আর. এন. রবিকে বেছে নেওয়ার পেছনে দিল্লির এক অত্যন্ত সুগভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত অঙ্ক রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত, রাজ্য রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো আগামী বিধানসভা নির্বাচন, যা আর মাত্র এক মাস পরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে ‘এসআইআর’ (SIR – Special Intensive Revision) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সংঘাত একেবারে চরমে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই SIR প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান জট সম্পূর্ণ না কাটলে কোনোভাবেই ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করা বা ভোট করানো সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৭ই মে, ২০২৬ তারিখে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অঙ্কটা খুব পরিষ্কার—৭ই মে-র মধ্যে যদি নির্বাচন সম্পন্ন না হয় এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় না আসেন, তবে রাজ্যে এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে এবং বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। ঠিক এমন এক খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়, যখন রাজ্যে ভোটের ভবিষ্যৎ এবং আইনি বিষয় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তখন আর. এন. রবির মতো একজন কড়া, অভিজ্ঞ এবং আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে পারদর্শী মানুষকে রাজ্যপাল করে বাংলায় নিয়োগ করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য যেখানে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে রাজভবনের সংঘাত নতুন কিছু নয়। জগদীপ ধনখড় থেকে শুরু করে সি ভি আনন্দ বোস—সবাই এই সংঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছেন। দিল্লির এমন একজন রাজ্যপাল প্রয়োজন, যিনি রাজ্য সরকারের কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করবেন না। তামিলনাড়ুতে রবি প্রমাণ করেছেন যে তিনি স্ট্যালিন সরকারের প্রবল বিরোধীতার মুখে দাঁড়িয়েও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারেন।
তৃতীয়ত, আর. এন. রবি একজন আইবি (IB) অফিসার। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বর্ডার সিকিউরিটি এবং গোয়েন্দা নজরদারিতে তাঁর মতো অভিজ্ঞতা খুব কম মানুষেরই আছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি সীমান্ত ঘেঁষা রাজ্য (Border state), যেখানে প্রায়শই অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে অভিযোগ ওঠে, সেখানে রবির মতো একজন ‘স্পাই-মাস্টার’-কে বসানোটা কেন্দ্রের এক মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে। তিনি শুধু ফাইলের ওপর নির্ভর করবেন না, বরং নিজের গোয়েন্দা মস্তিষ্কের সাহায্যে রাজ্যের আসল পরিস্থিতি সরাসরি কেন্দ্রকে রিপোর্ট করতে পারবেন।
চতুর্থত, রাজ্যপালের অন্যতম প্রধান কাজ হলো রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য (Chancellor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং সাংবিধানিক আইন বজায় রাখা। বাংলায় উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যে বিশাল আইনি জটিলতা চলছে, তা সামলাতে একজন অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসকের প্রয়োজন। আর. এন. রবি তামিলনাড়ুতেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কড়া হাতে মোকাবিলা করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা বাংলার ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে চায় দিল্লি।
আর. এন. রবির মতো একজন হাই-প্রোফাইল এবং বিতর্কিত রাজ্যপালকে বাংলায় পাঠানোর অর্থ হলো, রাজভবন আর নবান্নের মধ্যেকার সম্পর্কের পারদ আগামী দিনে আরও কয়েক গুণ চড়তে চলেছে। তিনি শুধু রবার স্ট্যাম্প হয়ে বসে থাকার পাত্র নন। তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা বলছে, তিনি রাজ্যের খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর রাখবেন এবং প্রয়োজন হলে রাজ্য সরকারের কাজের সরাসরি সমালোচনা করতেও পিছপা হবেন না।
যে ছেলেটি একদিন বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল অঙ্ক কষতেন, সেই ছেলেই আজ ভারতের দুই সবথেকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যের সাংবিধানিক পাহারাদার। বাংলায় তাঁর এই নতুন ইনিংস কতটা দীর্ঘ হয়, এবং নবান্নের সঙ্গে তাঁর সংঘাত তামিলনাড়ুর ইতিহাসকেও ছাপিয়ে যায় কি না, সেটাই এখন দেখার।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- গোলাপি মণীশ মলহোত্রা শাড়িতে নজর কাড়লেন সারা তেন্ডুলকর! অর্জুন-সানিয়ার রাজকীয় বিয়েতে চাঁদের হাট, জানুন অন্দরমহলের অজানা গল্প
- কে এই নতুন রাজ্যপাল আর. এন. রবি? জানুন তাঁকে নিয়ে তামিলনাড়ুর সমস্ত বিতর্ক ও যাবতীয় তথ্য
- কেন পদত্যাগ রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের? কারণ জানলে চমকে উঠবেন!
- জঙ্গল কেটে ফ্ল্যাটবাড়ি, বসার ঘরে ফণা তুলছে মৃত্যুদূত! রাজ্যে সাপের ছোবলে লাগাতার মৃত্যুর নেপথ্যে কে?
- হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ! খাদের কিনারে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, চরম সংকটে ফের ত্রাতা হয়ে হাত বাড়াল রাশিয়া?

