Online Gaming Addiction: হাবজি গাবজি থেকে গাজিয়াবাদ—গল্পটা আলাদা নয়, বদলেছে শুধু মাধ্যম। একদিকে সিনেমার পর্দায় দেখা যায় গেমিং আসক্তিতে ভেঙে পড়া শৈশব, অন্যদিকে বাস্তব জীবনে গাজিয়াবাদের ট্র্যাজেডি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় অনলাইন গেমিং আসক্তি কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। গেম ছিল খেলা, কিন্তু কীভাবে তা মানসিক সংকট হয়ে ওঠে, জানাচ্ছেন সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতার সাইকোলজি বিষয়ের অধ্যাপিকা ডক্টর পায়েল মজুমদার।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত হাবজি গাবজি সিনেমাটির শুরুটা আজ আর শুধুই সিনেমার গল্প বলে মনে হয় না। শহরের এক ছোট্ট ফ্ল্যাট, সেখানে এক খুদে বাচ্চা—চোখ দুটো সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনে আটকে। গেমের রঙিন দুনিয়ায় সে এতটাই ডুবে যে বাস্তব পৃথিবী ধীরে ধীরে তার কাছে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মা দুজনেই চাকরির চাপে ব্যস্ত, দুজনেই ওয়ার্কিং। সন্তানের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াইয়ে তারা ছুটছে প্রতিদিন, অথচ অজান্তেই তাদের চোখের সামনেই গড়ে উঠছে এক নীরব অসুখ—গেমিং আসক্তি। বাচ্চাটার খাওয়া-ঘুম, পড়াশোনা, কথা বলা—সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে গেমের লেভেল, রিওয়ার্ড আর স্কোর দিয়ে। একসময় সেই আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে বাবা-মা দুজনেই বুঝে উঠতে পারেন না, কীভাবে ছেলেকে সামলাবেন।
কয়েক বছর আগে এই গল্পটা পর্দায় দেখে আমরা ভেবেছিলাম, এটা শুধু সিনেমা। কিন্তু আজ গাজিয়াবাদের তিন বোনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরের সামনে দাঁড়িয়ে হাবজি গাবজি আর কল্পকাহিনি থাকে না—এটা যেন বাস্তবেরই ছায়া। অনলাইন গেমিং আসক্তি এখন আর বিলাসী সময় কাটানোর বিষয় নয়, এটি ধীরে ধীরে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়ংকর সংকেত হয়ে উঠছে। যে গেমগুলো শুরু হয় বিনোদন হিসেবে, সেগুলিই কখন, কীভাবে আবেগ, চিন্তা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দখল করে নেয়—তা অনেক সময় বাবা-মা, সমাজ, এমনকি শিশুটিও টের পায় না। আর ঠিক এই জায়গাতেই সিনেমার গল্প বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিশে যায়, যেখানে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সময় থাকতে বিপদটা চিনতে পারছি?
গাজিয়াবাদ ট্র্যাজেডি: কী ঘটেছিল সেই রাতে?
প্রাথমিক পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজিয়াবাদের একটি আবাসনে গভীর রাতে তিন বোন একসঙ্গে উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারায়। বয়স যথাক্রমে ১৬, ১৪ ও ১২ বছর। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একটি নোট ও ডায়েরির অংশে পাওয়া গেছে অত্যন্ত আবেগঘন কিছু লাইন—যেখানে তারা বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং উল্লেখ করেছে একটি নির্দিষ্ট অনলাইন গেম ও “কোরিয়া” শব্দটি, যা তদন্তকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কোভিড পরবর্তী সময়ে তিন বোনই দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনে অনলাইন গেম খেলত। পড়াশোনা, সামাজিক মেলামেশা, এমনকি ঘুম—সবকিছুতেই প্রভাব ফেলছিল এই অভ্যাস। সম্প্রতি পরিবার তাদের মোবাইল ব্যবহার সীমিত করার চেষ্টা করেছিল বলেও জানা যাচ্ছে। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং একটি গভীর সামাজিক সমস্যার লক্ষণ।
অনলাইন গেমিং নিজে খারাপ নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন তা আসক্তি (Addiction)-তে পরিণত হয়। আধুনিক টাস্ক-ভিত্তিক গেমগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী দিনের পর দিন একই কাজ করতে থাকে—রিওয়ার্ড, লেভেল আপ, ভার্চুয়াল স্বীকৃতি।
কিশোরদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ, তাদের মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি আবেগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম নয়. বাস্তব জীবনের চাপ (পড়াশোনা, প্রত্যাশা) থেকে পালানোর সহজ রাস্তা হিসেবে গেমকে বেছে নেয়। অনলাইন জগতে তারা “কেউ একজন” হয়ে উঠতে পারে, যা বাস্তবে হয়তো পারছে না। ফলাফল? ধীরে ধীরে বাস্তব ও ভার্চুয়াল জীবনের সীমারেখা মুছে যায়। পরিবার, স্কুল, বন্ধু—সব কিছু গৌণ হয়ে পড়ে।
কোরিয়ান টাস্ক-ভিত্তিক গেম: কেন বিশেষভাবে বিপজ্জনক?
গাজিয়াবাদ মামলায় উঠে আসা তথাকথিত কোরিয়ান টাস্ক-ভিত্তিক গেমগুলো সাধারণ গেমের মতো নয়। এগুলোর বৈশিষ্ট্য:
- নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার চাপ
- ব্যর্থ হলে মানসিক শাস্তি বা গিল্ট তৈরি
- গেম চরিত্রের সঙ্গে আবেগগত সংযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের গেম ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীর চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। কিশোরদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দায় কার? অভিভাবকরা বেশিরভাগ সময় এই দায় এড়াতে পারেন না। তাঁরা “সব বাচ্চাই তো মোবাইল দেখে” ভেবে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেন। সন্তানের মানসিক পরিবর্তন (চুপচাপ হয়ে যাওয়া, রাগ, অনিদ্রা) উপেক্ষা করেন। তাঁরা গেম নিষেধ করেন, কিন্তু বিকল্প কোনো সংযোগ বা সংলাপ তৈরি করেন না।
অন্যদিকে সরকার ও প্রশাসনও এই দায় এড়াতে পারেন না। ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে এখনও সুসংহত নীতি তৈরি করতে পারেনি। স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রায় নেই। ফলে শিশুরা একা হয়ে পড়ে—ঠিক যেমন গাজিয়াবাদের সেই তিন বোন।
গাজিয়াবাদের তিন বোন আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তাদের গল্প যদি আমাদের চোখ খুলে দেয়, যদি একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে—তবেই হয়তো এই ট্র্যাজেডির অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। Online Gaming Addiction শুধু প্রযুক্তির সমস্যা নয়, এটি আমাদের সময়ের এক গভীর মানবিক সংকট।
সাইকোলজিস্টরা কী বলছেন?
অধ্যাপিকা ডক্টর পায়েল মজুমদার, গাজিয়াবাদে ঘটে যাওয়া তিন বোনের আত্মহত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিভাবকদের জন্য নিচের পরামর্শগুলো দিয়েছেন:
- গেম যারা তৈরি করেন, তারা এটি এমনভাবে ডিজাইন করেন যাতে মানুষ এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। গেম নির্মাতাদের এই বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।
- গেম খেলার সময় আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক এক ধরণের হরমোন নিঃসরণ হয়, যা আমাদের আনন্দ দেয়।
- গেমের প্রতিটি ধাপ বা লেভেল পার করার পর যে জয়ের আনন্দ পাওয়া যায়, তা গেমারকে বারবার গেমটি খেলতে উৎসাহিত করে।
- গেমাররা ধীরে ধীরে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং গেমের কাল্পনিক জগতকেই সত্য বলে মনে করতে শুরু করে।
- গেম নির্মাতারা এমন সব চ্যালেঞ্জ গেমের মধ্যে রাখেন যা গেমারদের মধ্যে জেদ এবং আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি করে।
- এক সময় গেমার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং গেমটি তার জীবনকে পরিচালনা করতে শুরু করে।
- গেম খেলতে না পারলে বা গেমে হেরে গেলে গেমাররা গভীর মানসিক অবসাদ বা প্রচণ্ড রাগের শিকার হয়, যা তাদের চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মনোবিদের মতে, সন্তানরা মোবাইলে বা কম্পিউটারে কী ধরণের গেম খেলছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন গেমের প্রতি যেন তাদের আসক্তি না জন্মায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অভিভাবকদের। সন্তানরা যদি ভিডিও গেম খেলে, তবে তার সময় নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। যেমন, দিনে আধ ঘণ্টার বেশি গেম না খেলা এবং বাকি সময়টা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে লাগানো। গেম খেলতে বাধা দিলে যদি সন্তান অতিরিক্ত রাগ, চিৎকার বা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখায়, তবে সেটিকে গেমের প্রতি চরম আসক্তি হিসেবে ধরে নিতে হবে। যদি দেখা যায় গেমের নেশা সন্তানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং সে অস্বাভাবিক আচরণ করছে, তবে দেরি না করে দ্রুত কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নিতে হবে।
সারা দেশের মনোবিদ ও শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গাজিয়াবাদের এই ঘটনাকে একটি চরম সতর্কবার্তা (Red Alert) হিসেবে দেখছেন । তাঁদের মতে, এই ধরনের ট্র্যাজেডির পেছনে শুধুমাত্র online gaming addiction নয়, বরং একাধিক মানসিক স্তর কাজ করে।
ডা. সমীর পারিখ (Dr. Samir Parikh)
Director, Mental Health & Behavioural Sciences, Fortis Healthcare
ডা. সমীর পারিখ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বারবার বলেছেন—
কিশোরদের ক্ষেত্রে অনলাইন গেম অনেক সময় অনেক বাচ্চা বা কিশোর নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এমন কিছুতে আশ্রয় নেয়, যেটা তাকে সাময়িক স্বস্তি দেয়— আর আজকের দিনে সেই আশ্রয়টাই হয়ে উঠছে অনলাইন গেম। তারা দুঃখ, রাগ, একাকীত্ব—সবকিছু গেমের ভেতরেই চাপা দেয়।
তার মতে, যখন বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়, তখন হঠাৎ কোনো ট্রিগার (যেমন মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা নিষেধাজ্ঞা) চরম মানসিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
ডা. শ্যাম ভাট (Dr. Shyam Bhat)
Psychiatrist & Digital Wellbeing Expert
ডিজিটাল আসক্তি ও অনলাইন আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শ্যাম ভাট মনে করেন, আধুনিক টাস্ক-ভিত্তিক অনলাইন গেমগুলো কিশোরদের মস্তিষ্কে অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলছে। তাঁর কথায়,
“এই ধরনের গেম মস্তিষ্কের reward system-কে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন তাদের কাছে নিষ্প্রভ ও অর্থহীন মনে হতে শুরু করে।”
ডা. ভাট ব্যাখ্যা করেন, কিশোরদের মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি পরিণত নয়—বিশেষ করে যে অংশ ঝুঁকি, পরিণতি ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণেই তারা ভার্চুয়াল জগতের নির্দেশ, আবেগ ও পুরস্কারকে বাস্তব জীবনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
এই লড়াই শুধু সন্তানের নয়, এই দায় শুধু বাবা-মায়েরও নয়। এটি পরিবার, স্কুল, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ একটি শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রাখাই যথেষ্ট নয়, তাকে বুঝতে শেখানো, কথা বলার জায়গা দেওয়াই আসল চিকিৎসা। সময় থাকতে যদি আমরা শুনি, বুঝি, পাশে দাঁড়াই—তাহলেই হয়তো আর কোনো পরিবারকে এমন নীরব শোকের মুখে দাঁড়াতে হবে না। কারণ গেম বন্ধ করা সহজ, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

