Taslima Nasrin Kolkata Return: প্রায় দুই দশক পর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় প্রত্যাবর্তন ঘিরে রবীন্দ্রসদনে আবেগঘন সন্ধ্যা; সংবর্ধনা, কবিতা, সম্মাননা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এল অনুষ্ঠানে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবন পেরিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার রবীন্দ্রসদনে এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন প্রখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সেক্যুলার মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানের নামই ছিল ‘ফেরা’—যা শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং বহু বছর পর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে এক আবেগের উদযাপন।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রসদনে ভিড় জমাতে শুরু করেন সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং অসংখ্য অনুরাগী। দীর্ঘ দুই দশক পর তাঁকে একনজর দেখার আকাঙ্ক্ষা যে মানুষের মনে কতটা গভীর ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে উপস্থিতির ভিড়ে। দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাসের মধ্যেই মঞ্চে আসেন তসলিমা নাসরিন।
সেদিন তিনি পরেছিলেন ঐতিহ্যবাহী বালুচরী শাড়ি, কপালে ছিল বড় লাল টিপ। বঙ্গকন্যার সেই সাজে তাঁর মুখে ধরা পড়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফিরে আসার এক প্রশান্তি ও আবেগের ছাপ, যা উপস্থিত দর্শকদেরও স্পর্শ করে।
প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে কলকাতায় ফিরে আবেগঘন ভাষণে নিজের জীবনের বেদনা, বাক্স্বাধীনতার লড়াই, নির্বাসনের অভিজ্ঞতা এবং বাংলা ভাষার প্রতি অটুট ভালোবাসার কথা তুলে ধরলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
আগস্ট আমার জন্মের মাস, নির্বাসনের মাস, আজ থেকে প্রত্যাবর্তনের মাসও
তসলিমা নাসরিন বলেন,
“আগস্ট আমার জন্মের মাস। আগস্টই আমার নির্বাসনের মাস। আর আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাস হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
তাঁর কথায়, এই প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি বাক্স্বাধীনতারও এক প্রতীকী জয়।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর কলকাতায় ফিরে আবেগাপ্লুত
তিনি বলেন, প্রায় দুই দশক পরে কলকাতায় ফিরে তাঁর মনে হচ্ছে যেন বহুদিন পর নিজের ঘরে ফিরেছেন। এই শহরের মানুষের ভালোবাসা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
যাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ শিবনারায়ণ রায় এবং অম্লান দত্ত-কে। তাঁদের সমর্থন ও মানবিকতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ থেকে বিতাড়ন, কলকাতা ছাড়ার যন্ত্রণা
তসলিমা বলেন, রাষ্ট্র তাঁকে নিজের দেশ বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন—
“রাতের অন্ধকারে আমার নিজের দেশ আমার জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।”
তিনি জানান, পরে কলকাতাও তাঁকে ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল, যা তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায়।
‘বন্ধ দরজা চিরকাল বন্ধ থাকে না’
তিনি বলেন—
“ভয় কিংবা অন্যায় কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না।”
তাঁর মতে, যে শহর একদিন তাঁকে চোখের জলে বিদায় দিয়েছিল, আজ সেই শহরই তাঁকে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে নিয়েছে।
‘আজ নির্বাসনের উপর বাক্স্বাধীনতার জয়’
তসলিমার দাবি, তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন লেখকের ফেরা নয়, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতারও বিজয়। তিনি বলেন, একজন লেখককে নির্বাসনে পাঠানো যায়, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও লেখাকে থামিয়ে দেওয়া যায় না।
আত্মজীবনী প্রকাশ নিয়ে আবেগ
রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে তাঁর বহুল আলোচিত ‘আত্মজীবনী সমগ্র’ প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন, এই বই তাঁর জীবনের সংগ্রাম, সত্য ও অভিজ্ঞতার দলিল।
মৌলবাদ ও ভণ্ড প্রগতিশীলদের কড়া সমালোচনা
তসলিমা বলেন—
“ইসলামী জিহাদিরা সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে বোমাকে হাতিয়ার করে। আর তথাকথিত সেকুলার বামপন্থীরা কুৎসা ও অপবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।”
তাঁর মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধিতা দুই দিক থেকেই হয়েছে।
‘আমি কি কাউকে বোমা মেরেছিলাম?’
তিনি প্রশ্ন তোলেন—
“আমি তো শুধু সহজ কথা লিখেছিলাম। আমি কি কাউকে বোমা মেরেছিলাম? তবুও আমাকে কেন এই শাস্তি দেওয়া হল?”
তাঁর বক্তব্য, একজন নিরস্ত্র লেখকের বিরুদ্ধে এত কঠোর আচরণ গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
‘লেখককে নির্বাসিত করা যায়, লেখাকে নয়’
তিনি বলেন, একজন লেখককে দেশছাড়া করা সম্ভব হলেও তাঁর লেখা বা চিন্তাধারাকে কখনও নির্বাসনে পাঠানো যায় না। সত্য শেষ পর্যন্ত নিজের পথ খুঁজে নেয়।
রাজনৈতিক প্রচারের জন্য আসিনি
তসলিমা স্পষ্ট করে জানান, তিনি কোনও রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্যে কলকাতায় আসেননি। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে কথা বলা।
‘রাজনীতি ভাগ করেছে, কবিতা জুড়েছে’
তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য মন্তব্য—
“রাজনীতি যখন বাংলাকে ভাগ করেছে, কবিতা তখন দুই বাংলার মধ্যে সেতু তৈরি করেছে। কাটাতার কখনও ভাষা, সংস্কৃতি বা মানুষের মনকে ভাগ করতে পারে না।”
‘আমার ঘর ভাষা আর ভালোবাসায়’
তিনি বলেন—
“এক বাংলায় আমার জন্ম, আরেক বাংলায় আমি ঘর পেয়েছিলাম। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে, কিন্তু ঘর তো তৈরি হয় ভাষা আর ভালোবাসায়।”
বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর আবেগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
২০০৭ সালের ২২ নভেম্বরের স্মৃতি
তসলিমা স্মরণ করেন, ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তে তাঁকে তড়িঘড়ি কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। সেই সময়ের ঘটনাকে তিনি জীবনের অন্যতম বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেন।
নিষিদ্ধ বইয়ের প্রসঙ্গও তুললেন
তিনি বলেন, তাঁর লেখা ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটি নিষিদ্ধ করা হলেও পরে কলকাতা হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছিল। তবুও মৌলবাদীদের তুষ্ট করার রাজনীতির কারণে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে যেতে হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে তসলিমা নাসরিন বলেন, সত্য, স্বাধীন চিন্তা এবং মানবিকতার পক্ষে তাঁর লড়াই ভবিষ্যতেও চলবে। তাঁর বিশ্বাস, ভয়, নিষেধাজ্ঞা কিংবা নির্বাসন কোনওদিনই মুক্ত চিন্তার শক্তিকে পরাজিত করতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে তাঁকে একাধিক সম্মানে ভূষিত করা হয়। প্রথমে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি। পরে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে উপহার দেওয়া হয় দীঘন্ত বিস্তৃত পথের নকশা খোদাই করা একটি রুপোর স্মারক। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নিজেই তাঁর হাতে সেই সম্মাননা তুলে দেন।
শুভেন্দু অধিকারী বক্তব্যে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য হওয়া উচিত, যেখানে সংবিধানপ্রদত্ত বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। তিনি তসলিমা নাসরিনকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি যখন ইচ্ছা, যতবার ইচ্ছা পশ্চিমবঙ্গে আসবেন। আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রশাসনের। এই রাজ্য শৃঙ্খলমুক্ত, বাঁধনমুক্ত এবং এখানে প্রত্যেক মানুষের নিজের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে।”
অনুষ্ঠানের আরেকটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল তসলিমা নাসরিনকে উৎসর্গ করে লেখা একটি কবিতা। সেই কবিতাটি রচনা করেন প্রাক্তন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেই তা আবৃত্তি করেন। কবিতায় উঠে আসে নির্বাসন, স্বাধীনতা, সাহস এবং এক লেখকের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা।
নিজের বক্তব্যে তসলিমা নাসরিনও উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান। দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফিরে এত মানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিক অভ্যর্থনা পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রবীন্দ্রসদনের পরিবেশ হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
অনুষ্ঠানজুড়ে সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বার্তা উঠে আসে বারবার। দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার পর ‘ফেরা’ শুধুমাত্র একজন লেখিকার কলকাতায় ফিরে আসা নয়, বরং বহু মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং প্রত্যাশার এক প্রতীক হয়ে ধরা দিল রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে।
#TaslimaNasrin #Kolkata #RabindraSadan #SuvenduAdhikari #WestBengal #FreedomOfExpression #BengaliLiterature #Author #LiteraryEvent #NewsUpdate
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?
১লা আগস্ট থেকে স্কুলের খাবারের দায়িত্ব ইস্কনের, ডিম বিতরণ, ও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা
কেন জেন জির ‘ক্রাশ’ সৌরভ দাস ও অভিজিৎ দীপকে? নেপথ্যে কী রহস্য?

