ভারতের জনসংখ্যা যখন মাত্র কয়েক লক্ষ ছিল, তখন তেত্রিশ কোটি দেবতা এলেন কোথা থেকে? জানুন বেদের ভুল ব্যাখ্যা, উপনিষদের সেই বিখ্যাত বিতর্ক এবং 33 Crore Gods Myth-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভাষাগত ভুলের রোমহর্ষক ইতিহাস।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : ভারতের কোনো ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে দাঁড়ালে আপনি দেখবেন—বটগাছের নিচে সিঁদুর মাখানো পাথর, নদীর ঘাটে শিবলিঙ্গ, আবার গৃহস্থের বাড়িতে রাধা-কৃষ্ণ। বিদেশিরা বা ভিনধর্মের মানুষ অনেক সময় কৌতুক করে বলেন, “তোমাদের হিন্দুদের তো দেবতার অভাব নেই! তেত্রিশ কোটি দেবতা (330 Million Gods)! এত দেবতার নাম মনে রাখো কীভাবে?”
এমনকি বর্তমান প্রজন্মের অনেক হিন্দুও এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে গিয়ে থমকে যান। সত্যিই তো! অঙ্ক তো মিলছে না। বৈদিক যুগে বা পুরাণের যুগে যখন গোটা পৃথিবীর জনসংখ্যাই কয়েক কোটির বেশি ছিল না, তখন তেত্রিশ কোটি দেবতা এলেন কোথা থেকে? ভক্তের চেয়ে ভগবানের সংখ্যা বেশি? এটা কি গাণিতিকভাবে সম্ভব? নাকি আমরা হাজার বছর ধরে একটা ভুল শব্দের অনুবাদ বয়ে বেড়াচ্ছি?
আজ আমরা যাত্রা করব সেই ভুলের উৎসে। ফিরে যাব হাজার বছর আগের এক রাজসভায়, যেখানে ঠিক হয়েছিল এই তেত্রিশ দেবতার স্বরূপ। চলুন, ধুলো ঝেড়ে বের করি উপনিষদের সেই পাতা, যেখানে লুকিয়ে আছে 33 Koti Devta Meaning-এর আসল সত্য।
জনক রাজার সভা ও যাজ্ঞবল্ক্যের পরীক্ষা (The Great Debate)
গল্পের শুরুটা আজ থেকে প্রায় ৩০০০ বছর আগের। মিথিলার রাজা জনক এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছেন। সেই যজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়েছেন আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ ঋষি, মুনি এবং পণ্ডিতরা। রাজা জনক ঘোষণা করলেন, “এই সভায় যিনি শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মজ্ঞানী বা পণ্ডিত প্রমাণিত হবেন, তাঁকে আমি ১০০০টি গাভী দান করব, যার শিং সোনা দিয়ে বাঁধানো থাকবে।”
সভায় উপস্থিত ছিলেন মহর্ষী যাজ্ঞবল্ক্য (Yajnavalkya)। তিনি ছিলেন সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ বিদ্বান। তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি তাঁর শিষ্যকে বললেন, “সামশ্রবা, গরুগুলো আমাদের আশ্রমের দিকে নিয়ে চলো।” এটা দেখে অন্যান্য ঋষিরা রেগে গেলেন। শুরু হলো তর্কযুদ্ধ। একে একে সবাই যাজ্ঞবল্ক্যকে কঠিন প্রশ্ন করতে লাগলেন, আর যাজ্ঞবল্ক্য অবলীলায় সব উত্তর দিয়ে দিলেন।
শেষে উঠে দাঁড়ালেন বিদগ্ধ ঋষি শাকল্য (Shakalya)। তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে আটকাতে চাইলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে যাজ্ঞবল্ক্য, সত্যি করে বলো তো, দেবতা আসলে কতজন?” যাজ্ঞবল্ক্য প্রথমে একটি বিশাল সংখ্যা বললেন—”তিন হাজার তিনশ ছয়জন।” শাকল্য বললেন, “সে তো মহিমা মাত্র। আসল সংখ্যা বলো।” যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, “তেত্রিশ জন।” শাকল্য তবুও ছাড়লেন না। তিনি বারবার প্রশ্ন করতে থাকলেন—”আরও গভীরে গিয়ে বলো, আসলে কতজন?” যাজ্ঞবল্ক্য ধাপে ধাপে সংখ্যা কমিয়ে বললেন—”ছয় জন”, তারপর “তিন জন”, তারপর “দুই জন”, তারপর “দেড় জন” এবং সবশেষে বললেন—”একজন।”
ঋষি শাকল্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তবে যে প্রথমে বললেন তেত্রিশ জন? তাঁরা কারা?” যাজ্ঞবল্ক্য তখন ব্যাখ্যা করলেন, “ওই তিন হাজার জন আসলে এই তেত্রিশ জনেরই বিস্তার বা মহিমা। বেদে এবং শাস্ত্রে মূলত ‘তেত্রিশ’ দেবতার কথাই বলা হয়েছে।” বৃহদারণ্যক উপনিষদ-এর এই কথোপকথনই হলো আমাদের বিভ্রান্তি দূর করার প্রধান চাবিকাঠি। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দেবতা তেত্রিশ জন, তেত্রিশ কোটি নয়।
‘কোটি’ শব্দের বিভ্রান্তি: সংখ্যা নাকি প্রকার? (The Linguistic Error)
তাহলে এই ‘কোটি’ শব্দটা এল কোথা থেকে? সমস্যাটা আসলে গণিতে নয়, সমস্যাটা হলো অনুবাদে বা ট্রান্সলেশনে। সংস্কৃত ভাষায় ‘কোটি’ (Koti) শব্দটির দুটি অর্থ আছে। ১. সংখ্যাবাচক: কোটি মানে দশ মিলিয়ন বা ১০০ লক্ষ (Crore)। ২. শ্রেণিবাচক: কোটি মানে প্রকার, ধরণ বা শ্রেণি (Type/Class/Category)।
যেমন আমরা বাংলায় বলি—”উচ্চ কোটির সাধু” বা “নিচু কোটির চিন্তা”। এখানে ‘উচ্চ কোটি’ মানে কিন্তু ‘উচ্চ কোটি সংখ্যা’ নয়, এর মানে হলো ‘উচ্চ শ্রেণি’ বা ‘High Class’। বেদে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ত্রয়স্ত্রিংশৎ কোটি’ (Trayastrimsati Koti)। অর্থাৎ, তেত্রিশ প্রকার বা তেত্রিশ শ্রেণির দেবতা। কালক্রমে, মধ্যযুগে বা তার পরে যখন অনুবাদকরা (বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে) এই সংস্কৃত শব্দটির তর্জমা করলেন, তাঁরা ‘প্রকার’ বা ‘Type’-এর বদলে ভুল করে ‘Crore’ বা সংখ্যা বসিয়ে দিলেন। আর সেই থেকেই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ল—হিন্দুর দেবতা তেত্রিশ কোটি!
ভাবুন তো, একটা মাত্র শব্দের ভুল ব্যাখ্যা কীভাবে হাজার বছরের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে! এই 33 Crore Gods Myth আসলে একটি ভাষাগত বিভ্রাট ছাড়া আর কিছুই নয়।
কারা এই তেত্রিশ দেবতা? চিনে নিন আসল রূপ (Who are the 33 Deities?)
এখন প্রশ্ন হলো, যদি দেবতা তেত্রিশ জনই হন, তবে তাঁরা কারা? তাঁরা কি স্বর্গে বসে থাকা কোনো ব্যক্তি? নাকি তাঁরা আমাদের চারপাশের প্রকৃতি? যাজ্ঞবল্ক্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই তেত্রিশ দেবতা আসলে প্রকৃতির তেত্রিশটি শক্তি বা স্তম্ভ, যা এই সৃষ্টিকে ধারণ করে আছে।
এই তেত্রিশ দেবতাকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: ১. অষ্ট বসু (৮ জন) ২. একাদশ রুদ্র (১১ জন) ৩. দ্বাদশ আদিত্য (১২ জন) ৪. ইন্দ্র ও প্রজাপতি (২ জন) মোট = ৮ + ১১ + ১২ + ২ = ৩৩ জন।
আসুন, এদের একটু বিস্তারিত চিনে নিই:
ক) অষ্ট বসু (The 8 Vasus – Elements of Nature): ‘বসু’ শব্দের অর্থ হলো যা ধারণ করে বা বাস করে। অর্থাৎ প্রকৃতি। এরা হলো— ১. পৃথিবী (Earth) ২. জল (Water) ৩. অগ্নি (Fire) ৪. বায়ু (Air) ৫. আকাশ (Ether/Sky) ৬. চন্দ্র (Moon) ৭. সূর্য (Sun) ৮. নক্ষত্র (Stars) লক্ষ্য করুন, এগুলো কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। এগুলো সেই সব প্রাকৃতিক উপাদান যা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। হিন্দু ধর্ম আসলে প্রকৃতি পূজারই এক উন্নত রূপ।
খ) একাদশ রুদ্র (The 11 Rudras – Forces of Life): ‘রুদ্র’ মানে যিনি রোদন করান বা যা চলে গেলে আমরা কাঁদি। আমাদের শরীরের দশটি ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, বাক, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ) এবং একাদশতম হলো ‘মন’ বা আত্মা। যদ্দিন এই ১১টি শক্তি শরীরে থাকে, তদ্দিন আমরা জীবিত। যেদিন এরা শরীর ছেড়ে চলে যায়, সেদিন মানুষ মারা যায় এবং স্বজনরা কাঁদে (রোদন করে)। তাই এদের নাম রুদ্র। এরা আমাদের জীবনীশক্তি।
গ) দ্বাদশ আদিত্য (The 12 Adityas – Time & Cycle): ‘আদিত্য’ মানে সূর্যের রূপ। কিন্তু এখানে ১২ আদিত্য বলতে বছরের ১২টি মাসকে বোঝানো হয়েছে। সময় বা কালচক্র প্রতিনিয়ত আমাদের আয়ু হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ের ১২টি ভাগই হলো ১২ জন দেবতা।
ঘ) ইন্দ্র ও প্রজাপতি (Indra & Prajapati):
- ইন্দ্র: এখানে ইন্দ্র মানে কোনো রাজা নন। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, “স্তন্যয়িত্নু ইব ইন্দ্র”। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ বা বজ্র হলো ইন্দ্র। এটি শক্তির প্রতীক।
- প্রজাপতি: যজ্ঞ বা সৃষ্টির উৎস হলো প্রজাপতি। এটি হলো সেই শক্তি যা থেকে প্রাণের সৃষ্টি হয় (অনেক মতে এটি ব্রহ্মা)।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের দেবতা কোনো আকাশচুম্বী সিংহাসনে বসে থাকা শাসক নন। মাটি, জল, আলো, বাতাস, আমাদের ইন্দ্রিয়, মন এবং সময়—এরাই হলো দেবতা। এদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোই হলো সনাতন ধর্মের মূল কথা।
এক ঈশ্বর ও বহু নাম: সনাতন দর্শনের সারাংশ
অনেকে প্রশ্ন করেন, “তাহলে শিব, বিষ্ণু, দুর্গা বা কালী—এঁরা কি ওই ৩৩ জনের বাইরে?” উত্তর হলো—না। সনাতন ধর্ম হলো ‘পলিমরফিক’ (Polymorphic) বা বহুরূপী একেশ্বরবাদ। ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয় (ব্রহ্ম)। কিন্তু তাঁর রূপ অনেক।
বিষয়টি একটু সহজ করে বোঝা যাক। ধরুন, একজন ব্যক্তি। তিনি অফিসে যখন কাজ করেন, তিনি ‘ম্যানেজার’। বাড়িতে যখন আসেন, তিনি কারো ‘বাবা’। স্ত্রীর কাছে তিনি ‘স্বামী’। আবার বাবার কাছে তিনি ‘সন্তান’। মানুষটি কিন্তু একজনই। কিন্তু সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁর নাম ও রূপ পাল্টাচ্ছে। ঠিক তেমনই, পরমেশ্বর বা ঈশ্বর যখন সৃষ্টি করেন তখন তিনি ব্রহ্মা, যখন পালন করেন তখন বিষ্ণু, আর যখন ধ্বংস করেন তখন রুদ্র বা শিব। যখন তিনি শক্তির রূপ নেন, তখন তিনি দুর্গা বা কালী।
ওই তেত্রিশটি প্রাকৃতিক শক্তি আসলে সেই এক পরমেশ্বরেরই বিভিন্ন ‘ফাংশন’ বা কার্যকারিতা। তাই আমরা যখন গঙ্গা পূজো করি, আমরা আসলে জলের জীবনীশক্তিকে সম্মান জানাই। যখন সূর্য প্রণাম করি, তখন শক্তির উৎসকে ধন্যবাদ দিই।
সুতরাং, পরের বার কেউ যদি বিদ্রুপ করে বলে, “তোমাদের তেত্রিশ কোটি দেবতা”, তখন লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করবেন না। বরং গর্বের সঙ্গে হেসে উত্তর দেবেন, “ভুল জানেন। আমাদের দেবতা তেত্রিশ কোটি নয়, তেত্রিশ প্রকার। আর আমরা গর্বিত যে আমরা এমন এক ধর্মের অনুসারী, যারা শুধু মূর্তিকে নয়, বরং এই পৃথিবীর মাটি, জল, বাতাস এবং নিজের শরীরকেও দেবতা জ্ঞানে সম্মান করে।”
ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে এই সত্যটা সবার সামনে আনা জরুরি। 33 Koti Devta Meaning জানা থাকলে, কুসংস্কারের অন্ধকার দূর হতে বাধ্য। জ্ঞানই শক্তি, আর সেই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হোক আপনার চেতনা।
#mythology #god
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

