Anoushka Shankar Achievements: ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও মানবিক চেতনার মিলনে অনুষ্কা শঙ্করের তিন দশকের সঙ্গীতযাত্রা এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে শৈশবের শিক্ষাগুরু থেকে বিশ্বমঞ্চ, চলচ্চিত্র সুরসৃষ্টি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক বিরল, সময়সচেতন ও গভীরভাবে প্রভাবশালী শিল্পীসত্তা।
প্লে ব্যাক থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকেই তিনি বারবার সংবাদ শিরোনামে। কখনো বলিউড অভিনেতা আমির খানের সঙ্গে তার সাক্ষাতে, কখনো তাকে ঘিরে নানান বিতর্ক। অবসর ঘোষণার পর কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে প্রথমবার তার অনুষ্ঠান। তিনি যখন মঞ্চে পা রাখলেন, তখন দর্শকদের গগনবিদারী করতালিতে চারপাশ কেঁপে উঠল। এরপর তিনি যখন মাইক্রোফোনে তাঁর দরদী কণ্ঠে সুর ধরলেন, তখন উপস্থিত কয়েকশ ভক্ত এক নিমেষে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। সবাই সমস্বরে তাঁর নাম ধরে চিৎকার করতে শুরু করল, আর আনন্দে অনেকের চোখ দিয়েই জল গড়িয়ে পড়ল। ইনি আর কেউ নন, অরিজিৎ সিং। তবে এই মঞ্চ শুধুমাত্র অরিজিৎ সিং এর ছিল না। ছিল আরো একজন বাঙালি প্রতিভাময়ীর। তিনি অনুষ্কা শংকর। তাঁকে আমরা একটা পরিচয়েই বেশি জানি। তিনি পন্ডিত রবি শঙ্করের কন্যা। সেতার বাদক। না, শুধু এই পরিচয় যথেষ্ট নয়, পন্ডিত রবিশঙ্করের কন্যা হয়েও, তিনি কিন্তু তার গায়ে নেপোটিজমের দাগ লাগতে দেননি, স্বতন্ত্র শিল্পী হয়ে ওঠার কাহিনী শোনাবো আজ আপনাদের। এই প্রতিবেদন থেকে জানবেন, অরিজিৎ সিং কোন বিখ্যাত শিল্পীর সাথে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছেন কলকাতায়।
আরও পড়ুন : স্টেজ আছে, গান আছে—তবু Playback নয় কেন? অরিজিৎ সিং কি ক্লান্ত নাকি বদলের ইঙ্গিত?
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বললেই অনেকের মনে আজও প্রথম সারিতে যে নামটি ভেসে ওঠে, তা হলো অনুষ্কা শঙ্কর (Anoushka Shankar)। কিন্তু তিনি শুধুমাত্র এক জন বিখ্যাত সেতারবাদকের কন্যা নন, কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিত একজন পারফর্মিং আর্টিস্ট মাত্রও নন। অনুষ্কা শঙ্কর আজ এক বহুমাত্রিক শিল্পী—যিনি সঙ্গীতকে ব্যবহার করেন ইতিহাস বলার জন্য, সমাজের ক্ষত দেখানোর জন্য এবং নিঃশব্দ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার জন্য। চলচ্চিত্র সংগীত (Film Composition) থেকে শুরু করে মানবাধিকার আন্দোলন—তার জীবন ও কাজ এক অদ্ভুত অথচ শক্তিশালী সেতু তৈরি করেছে শিল্প আর প্রতিবাদের মাঝে। যাত্রাটা শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ ইনস্টিটিউটের নীরব চলচ্চিত্র থেকে। আর সেখান থেকে মীরা নায়ারের ‘সুইটেবল বয়’। ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে তিনি রূপ দিয়েছেন সমষ্টিগত স্মৃতিতে। কেন অনুষ্কা শংকর আজকের দিনে একজন চিন্তাশীল শিল্পী হিসাবে চিহ্নিত তারই গল্প এই প্রতিবেদনে।
মীরা নায়ারের বহুল আলোচিত ফিল্মে অনুষ্কা শঙ্কর সহ-সুরকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি এমন এক অনন্য ধ্বনিচিত্র নির্মাণ করেন, যা দেশভাগ-পরবর্তী ভারতের আবেগ, ক্ষত, আশাভঙ্গ, স্বপ্ন ও স্মৃতিকে সুরের ভাষায় জীবন্ত করে তোলে। এই সঙ্গীতরচনায় একদিকে যেমন শোনা যায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীর ছাপ, তেমনই পাশাপাশি ধরা পড়ে পাশ্চাত্য ধাঁচের অর্কেস্ট্রাল ভাবনা। এই দ্বৈত সুরবিন্যাস ঠিক সেই সময়ের ভারতের বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে—যেখানে পুরনো ঐতিহ্য আর নতুন সময়ের টানাপোড়েনে তৈরি হয়েছিল সংগীতের এক জটিল মুহূর্ত। তিনি শুধু মঞ্চের শিল্পী নন, বরং গভীর চিন্তাশীল এক স্রষ্টা, যিনি ইতিহাস, অনুভূতি ও সময়কে সুরে বাঁধতে জানেন।
অনুষ্কা শঙ্করের পরিচয়ের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর মানবিক ও সামাজিক সক্রিয়তা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, যেখানে বর্তমানে তিনি একজন সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১২ সালে ভারতে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ নারী নির্যাতনের ঘটনা—যা গোটা বিশ্বকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল—অনুষ্কার জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গিতে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। এই ঘটনার পর থেকেই তিনি আরও স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে শুরু করেন। একজন নারী হিসেবে এবং শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বহনকারী একজন মানুষ হিসেবে তিনি খোলাখুলি নিজের কথা বলেন। তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে সেই সব গল্প, যেগুলো সমাজ প্রায়ই আড়াল করে রাখতে চায়। নারী অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে শরণার্থীদের সমর্থনে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শিল্প উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে, একজন শিল্পীর দায়িত্ব কেবল মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘In Her Name’ অনুষ্কা শঙ্করের সবচেয়ে আবেগপ্রবণ কাজগুলোর একটি। এই কম্পোজিশনটি তিনি উৎসর্গ করেন জ্যোতি সিংহের স্মৃতিতে এবং সেই সব নারীদের উদ্দেশে, যারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এটি কোনো সাধারণ সংগীত রচনা নয়—এটি এক ধরনের স্মারক (memorial)। সুরের মধ্য দিয়ে এখানে উঠে আসে শোক, ক্ষোভ, কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরনের নীরব শক্তি। এই কাজটি প্রমাণ করে, অনুষ্কার কাছে সঙ্গীত শুধুই বিনোদন নয়; এটি একটি ভাষা, যার মাধ্যমে তিনি প্রতিবাদ জানান, স্মরণ করেন এবং আশা তৈরি করেন।
অনুষ্কা শঙ্কর এমন একজন শিল্পী, যিনি প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রকে আধুনিক আলোয় তুলে ধরেন—কোনো “exotic” প্রদর্শনী হিসেবে নয়, বরং জীবন্ত, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া এক অভিব্যক্তি হিসেবে। অনুষ্কা শঙ্করের সঙ্গীতযাত্রার ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবেই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর প্রোডিজি ডেবিউ, কিন্তু তার আগে দীর্ঘদিন তিনি সেতার ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন তাঁর পিতা, পণ্ডিত রবি শঙ্করের কাছে। এই শিক্ষা ছিল কেবল নোট বা রাগ শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। “Learning by ear”—এই পদ্ধতিতে তিনি শিখেছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সংগীত ঐতিহ্য, সঙ্গে পেয়েছেন ইম্প্রোভাইজেশনের সেই স্বাধীনতা, যার জন্য রবি শঙ্কর বিশ্বজুড়ে কিংবদন্তি। এই স্বাধীনতাই পরবর্তীতে অনুষ্কাকে সীমা ভাঙতে অনুপ্রাণিত করেছে—শাস্ত্রীয় মঞ্চ ছাড়িয়ে তাঁকে নিয়ে গেছে জ্যাজ ক্যাফে, ইলেকট্রনিক স্পেস, সিনেমা ও সমসাময়িক সংগীতের নতুন দিগন্তে।
অনুষ্কা শঙ্করের সঙ্গীতযাত্রার ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবেই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর প্রোডিজি ডেবিউ, কিন্তু তার আগে দীর্ঘদিন তিনি সেতার ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন তাঁর পিতা, পণ্ডিত রবি শঙ্করের কাছে। এই শিক্ষা ছিল কেবল নোট বা রাগ শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। “Learning by ear”—এই পদ্ধতিতে তিনি শিখেছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সংগীত ঐতিহ্য, সঙ্গে পেয়েছেন ইম্প্রোভাইজেশনের সেই স্বাধীনতা, যার জন্য রবি শঙ্কর বিশ্বজুড়ে কিংবদন্তি। এই স্বাধীনতাই পরবর্তীতে অনুষ্কাকে সীমা ভাঙতে অনুপ্রাণিত করেছে—শাস্ত্রীয় মঞ্চ ছাড়িয়ে তাঁকে নিয়ে গেছে জ্যাজ ক্যাফে, ইলেকট্রনিক স্পেস, সিনেমা ও সমসাময়িক সংগীতের নতুন দিগন্তে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ হাউজ অফ কমনশিল্ড লাভ করেন। তিনি সর্বকনিষ্ঠ এবং প্রথম নারী যিনি এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। আ সুইটেবল বয়ের সাউন্ড ট্র্যাক আইভোর নোভেলো অ্যাওয়ার্ড মনোনীত হয়। তিনি প্রথম ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী যিনি লাইভ পারফর্ম করেছেন, অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে প্রথম ভারতীয় নারী যিনি গ্র্যামিতে মনোনীত হন।
হার্বি হ্যানকক, প্যাটি স্মিথ, জুবিন মেহতা, যশুয়া বেল এই নাম গুলোর পাশাপাশি যখন অনুষ্কা শঙ্করের নাম উচ্চারিত হয়, তখন বোঝা যায় তার সংগীতের ব্যক্তি কতটা বিস্তৃত। মঞ্চ যাই হোক সংগীতের মাধ্যমে তিনি হৃদয়ে পৌঁছেছেন। তিনি perform করেছেন কিংবদন্তি অর্কেস্ট্রার সঙ্গে, আবার ৪০ হাজার দর্শকের সামনে। যিনি সেতারকে ঐতিহ্যর খাচায় বন্দি করে রাখেননি। মানুষের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন তার সংগীতকে।
#music #anushkashankar #arijitsingh
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

