Snakebite Deaths in Bengal: নিউটাউনের ঝাঁ চকচকে আবাসন হোক বা সুন্দরবনের কৃষিজমি—কোথাও নিস্তার নেই! রাজ্যে সাপে কাটার ভয়াবহ পরিসংখ্যান, অ্যান্টি-ভেনমের চরম অভাব এবং কিউট বা কেউটে সাপের ছোবলে মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা আসল কারণগুলো জানুন। আপনার একটি ভুল কেড়ে নিতে পারে তরতাজা প্রাণ!
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভাবুন তো, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর আপনি নিজের সাধের ফ্ল্যাটের নিচে একটু হাঁটাহাঁটি করছেন। চারপাশটা বেশ শান্ত, নতুন তৈরি হওয়া রাস্তার ধারে টিমটিম করে জ্বলছে ল্যাম্পপোস্টের আলো। ঠিক সেই সময় হঠাৎ আপনার পায়ে একটা তীব্র জ্বালা! কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল এক জোড়া শীতল চোখ। হ্যাঁ, ঠিক এই ভয়ংকর পরিণতিই এখন রোজকার বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতার বুকে, বিশেষ করে শহরের উপকণ্ঠ বা সম্প্রসারিত অঞ্চলগুলোতে।
একসময় সাপে কাটার খবর শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেঠো পথ বা কৃষিজমির ছবি। কিন্তু আধুনিক কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর দিকে তাকালে আজ সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে যাবে। বড় বড় শহরের উপকণ্ঠে, যেখানে একসময় পতিত জমি বা কৃষিকাজের জায়গা ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করে এখন গড়ে উঠছে মানুষের থাকার জায়গা। আর এই জঙ্গল কেটে ফ্ল্যাটবাড়ি বানানোর দৌড়েই আমরা নিজেদের অজান্তে ডেকে আনছি এক নীরব মৃত্যুদূতকে।
সাপ এবং মানুষের এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত বা হিউম্যান-স্নেক কনফ্লিক্ট (Human-snake conflict) কমানোর উপায় নিয়ে গত মঙ্গলবার কলকাতায় আয়োজিত হয়েছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা। এনজিও (NGO) ‘মানভূম আনন্দ আশ্রম নিত্যানন্দ ট্রাস্ট’ বা ম্যান্ট (MANT)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালায় উঠে এসেছে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা শুনলে আপনার রাতের ঘুম উড়ে যেতে বাধ্য। আজ NewsOffBeat-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা কোনো বৈজ্ঞানিক জার্নালের নীরস তথ্য দেব না। বরং, মানবতা এবং বাস্তুতন্ত্রের (Ecology) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝার চেষ্টা করব, কেন হঠাৎ করে আমাদের শোওয়ার ঘর বা আবাসনের গ্যারেজে ফণা তুলছে বিষধর সাপ।
নিউটাউন ও রাজারহাটের বুকে মৃত্যুফাঁদ: পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৩ সালের একটি ঘটনা আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া যাক। নিউটাউনের মতো একটি ঝাঁ চকচকে এবং উন্নত এলাকায়, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয়েছিল ২০ বছর বয়সী দুই তরতাজা যুবকের। একটু ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়! নিউটাউন বা রাজারহাটের মতো জায়গায়, যেখানে পদে পদে আধুনিকতার ছোঁয়া, সেখানে কীভাবে ঘটছে এমন ঘটনা?
এইমস (AIIMS) কল্যাণীর সংক্রামক ব্যাধি (Infectious diseases) বিভাগের ইন-চার্জ ডাক্তার সায়ন্তন বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে এক ভয়ংকর বিপদের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, রাজারহাট অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক সাপে কাটার রিপোর্ট বা ঘটনা সামনে আসছে। এর মূল কারণ হলো দ্রুত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বা আর্বানাইজেশন (Rapid urbanization)। রাজারহাটের মতো পঞ্চায়েত এলাকাগুলোতে একদিকে যেমন গড়ে উঠছে বিশাল বিশাল হাউজিং কমপ্লেক্স, ঠিক তার পাশেই হয়তো রয়ে গেছে জলাজমি বা ঝোপঝাড় (Marshy land)। অনেক সময় দেখা যায়, একটি বিশাল হাউজিং কমপ্লেক্সের ঠিক গায়েই পড়ে আছে একটি ফাঁকা প্লট, যা গাছপালা এবং ঝোপঝাড়ে ভর্তি। এই সহাবস্থানই তৈরি করছে মৃত্যুফাঁদ।
আবর্জনার স্তূপ, ইঁদুর এবং মানুষের আগ্রাসন
কেন সাপ লোকালয়ে ঢুকছে? সাপ তো নিজের ইচ্ছায় মানুষকে কামড়াতে আসে না! এই প্রশ্নের একটি অত্যন্ত সহজ এবং বিজ্ঞানসম্মত উত্তর দিয়েছেন কোচির অমৃতা ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি (Preventive cardiology)-র প্রধান এবং ‘সর্প’ (SARPA – Snake Awareness Rescue and Protection App) প্রজেক্টের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর, ডাক্তার জয়দীপ মেনন।
তাঁর কথায়, “আমরা সাপেদের সীমানায় বা টেরিটরিতে অনধিকার প্রবেশ করছি।” বড় বড় হাউজিং কমপ্লেক্সের বাইরে এবং ক্রমবর্ধমান শহরের বিভিন্ন পকেটে দিনের পর দিন জমে থাকে বিশাল বিশাল আবর্জনার স্তূপ। এই আবর্জনার দুর্গন্ধে হয়তো আপনি নাক চেপে পাশ কাটিয়ে চলে যান, কিন্তু এই স্তূপই হলো ইঁদুর বা রোডেন্টস (Rodents)-দের স্বর্গরাজ্য। আর যেখানে ইঁদুর থাকবে, সেখানে খাদ্যের সন্ধানে সাপ আসবেই।
মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থান বা ন্যাচারাল হ্যাবিটেট (Natural habitats) এবং তাদের খাবারের উৎস ধ্বংস করে ফেলেছে। তাই বাধ্য হয়েই বেঁচে থাকার তাগিদে তারা আমাদের লোকালয়ে, আমাদের আবাসনের গ্যারেজে বা আবর্জনার স্তূপে বাসা বাঁধছে। দোষটা কি তবে সাপের, নাকি আমাদের সীমাহীন আগ্রাসনের?
কৃষকদের জন্য অশনি সংকেত এবং সচেতনতার আলো
শহরের উপকণ্ঠের পাশাপাশি, বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকদের জীবনে এই মানুষ-সাপ সংঘাত এক ভয়ংকর অভিশাপ। একজন কৃষক যখন ভোরের আলো ফোটার আগে খালি পায়ে বা হাওয়াই চটি পরে ধানক্ষেতে নামেন, তখন তাঁর জীবনের কোনো গ্যারান্টি থাকে না। ফসলের জমিতে ইঁদুরের উপদ্রব কমানোর জন্য সাপ আসলে কৃষকের বন্ধু। কিন্তু সেই সাপই যখন অসতর্কতার কারণে কৃষকের পায়ে ছোবল মারে, তখন মুহূর্তের মধ্যে একটি গোটা পরিবারের রুটিরুজি পথে বসে যায়।
গত এক বছরে সাপে কাটার কারণে বাংলার গ্রামগঞ্জে যে পরিমাণ মৃত্যু হয়েছে, তার একটা বড় অংশই হলো কৃষক এবং খেতমজুর। কিন্তু এই কর্মশালার মাধ্যমে এবং সঠিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। কৃষকরা যদি জানতে পারেন যে ঠিক কোন সময়ে (যেমন গোধূলি বা ভোরবেলা) সাপের উপদ্রব বেশি থাকে, গামবুট বা ঢাকা জুতো পরে মাঠে নামলে কতটা বিপদ এড়ানো যায়, এবং রাতে মেঝেতে না শুয়ে মশারি খাটিয়ে খাটে শুলে কতটা সুরক্ষিত থাকা যায়—তবে মৃত্যুর হার ম্যাজিকের মতো কমে আসবে। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্যের অকালমৃত্যু ঠেকাতে এই সচেতনতাই হলো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বাংলার ত্রাস: ‘বিগ ফোর’ বনাম মনোক্লেড কোবরা (কেউটে)
চিকিৎসকদের মতে, ভারতবর্ষে মূলত চারটি বড় বিষধর সাপ বা ‘বিগ ফোর’ (Big four venomous snakes) সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটায়। এরা হলো—রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া (Russell’s Viper), ইন্ডিয়ান কোবরা বা গোখরো (Indian Cobra), কমন ক্রেইট বা কালচিতি/কালাচ (Common Krait) এবং স-স্কেলড ভাইপার বা আফাই (Saw-scaled Viper)।
কিন্তু বাংলায় এই বিগ ফোর-এর বাইরেও একটি বিশেষ প্রজাতির সাপ চিকিৎসকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সেটি হলো ‘মনোক্লেড কোবরা’ (Monocled Cobra) বা কেউটে। বাংলায় বহু মৃত্যুর জন্য এই কেউটে সাপই দায়ী।
সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্যটি হলো, আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাপের বিষ নষ্ট করার জন্য যে পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (ASV) পাওয়া যায়, তা এই মনোক্লেড কোবরার বিষকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় বা নিউট্রালাইজ (Neutralise) করতে পারে না। চিকিৎসকদের জন্য এটি একটি চরম হতাশার জায়গা। ডাক্তাররা বলছেন, কেউটে সাপে কাটলে অনেক সময় চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত ‘সাপোর্টিভ’ (Supportive) বা লক্ষণভিত্তিক হয়ে দাঁড়ায়। বিষের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাঁকে কৃত্রিমভাবে ভেন্টিলেশন (Ventilation) দেওয়া ছাড়া চিকিৎসকদের হাতে আর বিশেষ কোনো উপায় থাকে না।
গোল্ডেন আওয়ার এবং কুসংস্কারের অন্ধকার
সাপে কামড়ানোর পর প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ (Golden hour)। এই সময়ের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যান্টি-ভেনম দিতে পারলে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো প্রায় নিশ্চিত। শহরের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে এই জীবনদায়ী অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (ASV) মজুত থাকে।
কিন্তু সমস্যা হলো পরিকাঠামো এবং সচেতনতার অভাব। কলকাতা পুরসভার (KMC) ওয়ার্ড হেলথ ক্লিনিকগুলোতে এই অ্যান্টি-ভেনম পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে (Primary health centres) এই পরিষেবা দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে অনেক জায়গাতেই তা অমিল।
এর পাশাপাশি রয়েছে কুসংস্কারের এক গভীর অন্ধকার। ডাক্তার জয়দীপ মেনন অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, আজও বহু মানুষ সাপে কাটলে সবার আগে ছোটেন ওঝা বা বিকল্প চিকিৎসার (Alternative medicine) হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে। অ্যান্টি-ভেনম হলো একমাত্র বৈজ্ঞানিক ওষুধ, যা রক্তে থাকা বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। কিন্তু ওঝার কাছে গিয়ে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়, তখন সেই বিষ রক্তের মাধ্যমে শরীরের কোষে বা টিস্যুর (Tissues) সঙ্গে মিশে যায়। তখন রোগীকে হাসপাতালে আনলেও অনেক দেরি হয়ে যায় (Delayed response)। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণেই মূলত সাপে কাটা রোগীদের মৃত্যু হয়।
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে রাখা ভালো—সব সাপের কামড়ই কিন্তু মারণ নয়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে যে সাপগুলো কামড়ায়, সেগুলো হয় নির্বিষ (Non-venomous), অথবা সেই কামড়টি হয় ‘ড্রাই বাইট’ (Dry bite)। ড্রাই বাইট মানে হলো, কোনো বিষধর সাপ আপনাকে কামড়ালেও সে আপনার রক্তে বিষ ঢালেনি বা রিলিজ (Released) করেনি। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় গ্রামের ওঝারা। নির্বিষ সাপের কামড়ে এমনিতেই মানুষের মৃত্যু হয় না, কিন্তু ওঝারা দাবি করে যে তাদের ‘তন্ত্রমন্ত্রে’ রোগী সুস্থ হয়েছে! এই অন্ধবিশ্বাসই দিনের পর দিন কেড়ে নিচ্ছে তরতাজা প্রাণ।
সাপ আমাদের বাস্তুতন্ত্রের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা না থাকলে ইঁদুর এবং পোকামাকড়ের উপদ্রবে আমাদের চাষবাস থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠত। আমরা জঙ্গল কেটে নিজেদের কংক্রিটের প্রাসাদ বানাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতির এই নীরব বাসিন্দাদেরও তো বেঁচে থাকার অধিকার আছে!
সাপে কাটা কোনো দৈব দুর্বিপাক নয়, এটি একটি দুর্ঘটনা মাত্র। আর একটু সচেতনতা, নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক সময়ে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার সাহায্য নেওয়াই পারে এই দুর্ঘটনা থেকে আমাদের বাঁচাতে। আসুন, কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা বিজ্ঞানকে আঁকড়ে ধরি। সাপের প্রতি অযথা আতঙ্ক না ছড়িয়ে, তাদের সঙ্গে একটি নিরাপদ সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করি।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- খামেনেইয়ের মৃত্যু ও ৪০ দিনের শোক! পহলভি রাজবংশের পতন থেকে কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেন তিনি?
- খামেনেয়ের মৃত্যু! মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে, ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
- রাতের শহরে মহিলাদের সুরক্ষায় বিশেষ বাহিনী রাজ্য সরকারের │ জানুন, কী সেই উদ্যোগ
- আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা! তিন ধাপে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ, কীভাবে জানবেন আপনার নাম আছে কি না?
- লাদাখে বরফের ওপর ম্যারাথন! আফগান-পাক যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগেই চিনের সীমান্তে ভারতের এই পদক্ষেপ কেন মাস্টারস্ট্রোক?
#newsoffbeat #SnakebiteAwareness #SaveEnvironment #Urbanization #WildlifeConflict #KolkataNews #BengalFarmers #HealthTips #ScienceVsMyth

