Koustav Bagchi Hair Promise: তৃণমূলকে উৎখাত করার প্রতিজ্ঞা পূরণ, মাথায় চুল নিয়ে ফিরছেন কৌস্তভ
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ৪ মে, ২০২৬ দিনটি শুধুমাত্র ক্ষমতার এক বিশাল পালাবদলের দিন হিসেবেই লেখা থাকবে না, বরং লেখা থাকবে এক অদম্য জেদ, চরম আত্মত্যাগ এবং এক রাজনৈতিক কর্মীর ‘ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা’ পূরণের এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে। চারদিকে যখন গেরুয়া আবির উড়ছে, ইভিএমের চূড়ান্ত ফলাফলে যখন এটা স্পষ্ট যে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৯০টি আসনে জয়লাভ করতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি, ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চিত মুখ কৌস্তভ বাগচীর জীবনে ফিরে এল এক চূড়ান্ত স্বস্তির নিশ্বাস। দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা একটা চরম প্রতিজ্ঞা আজ অবশেষে পূর্ণতা পেল। আজ আর কোনো রাজনৈতিক তরজা নয়, বরং জয়ের এই চরম আনন্দঘন মুহূর্তে একটি প্রথম সারির টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং আবেগঘন অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচী। সেই সাক্ষাৎকারের পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল এক তীব্র মানসিক লড়াইয়ের কাহিনি, যা শুনলে যেকোনো মানুষের চোখে জল আসতে বাধ্য।
ফিরে যাওয়া যাক ২০২৩ সালের সেই মার্চ মাসে। তৎকালীন কংগ্রেস নেতা (বর্তমানে বিজেপি) কৌস্তভ বাগচীর বাড়িতে মাঝরাতে হঠাৎ হানা দেয় কলকাতা পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে মন্তব্য করার ‘অপরাধে’ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালত থেকে জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসার পরই এক অভাবনীয় কাজ করে বসেন এই দুঁদে আইনজীবী। ক্ষোভে, অপমানে এবং চরম রাজনৈতিক আক্রোশে তিনি নিজের মাথার সম্পূর্ণ চুল কামিয়ে ফেলেন। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে সেদিন তিনি গর্জে উঠে এক ঐতিহাসিক প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যতদিন না এই স্বৈরাচারী তৃণমূল সরকারকে এবং মমতা ও তাঁর ভাইপোকে বাংলার ক্ষমতা থেকে চিরতরে উৎখাত করতে পারছেন, ততদিন তিনি তাঁর মাথায় একগাছি চুলও রাখবেন না। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত, বাংলার রাজনীতি অনেক বাঁক নিয়েছে, দলবদল হয়েছে, কিন্তু কৌস্তভ তাঁর সেই প্রতিজ্ঞা থেকে একচুলও সরে আসেননি। আজ যখন তাঁর সেই স্বপ্ন সত্যি হলো, তখন টিভির পর্দায় এক আবেগপ্রবণ কৌস্তভকে দেখতে পেলেন বাংলার মানুষ। তিনি জানালেন, এই তিনটে বছর তাঁকে কত কথা শুনতে হয়েছে, কত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকার হতে হয়েছে। শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীরা থেকে শুরু করে সাধারণ ট্রোল বাহিনী— সবাই তাঁকে বারবার আক্রমণ করে বলেছে, “তৃণমূল কোনোদিন হারবে না, আর তোমার মাথায় কোনোদিন চুলও গজাবে না।” কিন্তু এই চরম কটাক্ষগুলোকে তিনি নিজের জেদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে বলেন, “আমার মাথার চুল আমার ভীষণ প্রিয় ছিল। আমি নিজে চিরকাল পরিপাটি থাকতে ভালোবাসি। কিন্তু যখন আমার মনে হলো যে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা বিসর্জন দিতে হবে, তখন অনেক ভেবে দেখলাম যে নিজের প্রিয় চুলটাই আমি বিসর্জন দেব।”
এই চুলহীন মাথার কারণে তাঁকে যে কত শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, সেই অজানা গল্পও আজ প্রকাশ্যে আনেন তিনি। তিনি জানান, ব্যক্তিগত জীবনে বা আদালতে যাতায়াতের সময় তিনি মাথায় পাগড়ি বেঁধে রাখতেন। কিন্তু যখনই তিনি রাজনৈতিক প্রচারে বেরোতেন, তখন কড়া রোদ হোক বা শীত, তিনি মাথার ওই পাগড়ি খুলে রাখতেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ তাঁর ওই ন্যাড়া মাথা দেখে বারবার মনে করুক সেই প্রতিজ্ঞার কথা, সেই পুলিশি হেনস্থার কথা। কিন্তু এই চরম ত্যাগের একটা মূল্যও তাঁকে চোকাতে হয়েছিল। তিনি সাক্ষাৎকারে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “প্রচারের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথায় কিছু না রাখার ফলে আমি মাঝেমধ্যেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়তাম। রোদ লেগে কষ্ট হতো, আবার প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগে যেত। কত রাত আমি শারীরিক কষ্ট সহ্য করেছি, তা শুধু আমি আর আমার পরিবার জানে। কিন্তু প্রতিজ্ঞা তো প্রতিজ্ঞাই। আজ মনে হচ্ছে, হয়তো আর আমায় ওই ন্যাড়া মাথায় রোদে-জলে ঘুরতে হবে না।”
আরও পড়ুন: ভোটে হার, ‘জোর করে হারানো’ অভিযোগ মমতার! ভবানীপুরে ঘুরল খেলা, জয়ী শুভেন্দু?
সবচেয়ে মজার এবং আবেগঘন ঘটনাটি ঘটেছে ঠিক দু’দিন আগে। ভোটের ফল ঘোষণার ঠিক আগে তাঁর মাথায় হালকা হালকা চুল গজিয়েছিল। যেহেতু তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল চুল না রাখার, তাই তিনি তাঁর পরিচিত সেলুনে যান সেই গজিয়ে ওঠা চুলগুলো কাটার জন্য। কিন্তু সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ এবং খোদ সেলুনের নাপিত তাঁকে বাধা দেন। তাঁরা বলেন, “না, তুমি আজ আর চুল কাটবে না। আমরা জানি চার তারিখ তুমি আর তোমার দল ক্ষমতায় আসছ। তোমার ওই চরম প্রতিজ্ঞা পূরণ হতে চলেছে। তাই আজ আর চুল কাটার কোনো প্রয়োজন নেই।” সেলুনের সেই সাধারণ মানুষের বিশ্বাস যে আজ এই বিপুল ভোটের রায়ে এমনভাবে মিলে যাবে, তা হয়তো স্বয়ং কৌস্তভও পুরোপুরি ভাবতে পারেননি। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে তাঁর এই সংগ্রাম শুধুমাত্র তাঁর নিজের ছিল না, বাংলার সাধারণ মানুষও তাঁর এই লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন।
এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তাঁর পরিবারের ভূমিকাও ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে তাঁর শ্বশুরবাড়ি এবং তাঁর স্ত্রী প্রীতির কথা না বললেই নয়। যখন তিনি এই কঠিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তখন তাঁর বিবাহিত জীবনেও এর একটা প্রভাব পড়েছিল। কৌস্তভ নিজে হাসতে হাসতে জানান, “সেই সময় শ্বশুরবাড়ির তরফ থেকে আমাকে বলা হয়েছিল যে, ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভেবে দেখতে। এতটা চরম সিদ্ধান্ত না নিলেও তো হয়। কিন্তু আমি তাঁদের সেদিনই বলেছিলাম, এটা আমার প্রতিজ্ঞা, আমি কোনোভাবেই এটা ভাঙব না।” তাঁর স্ত্রী প্রীতি এই দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর এই লড়াইয়ে নীরবে পাশে থেকেছেন। স্বামীর প্রতি দিনের ওই ব্যঙ্গ সহ্য করা, শারীরিক অসুস্থতায় সেবা করা— সবই তিনি মুখ বুজে করেছেন। আর আজ যখন জয়ের হাসি হাসছেন কৌস্তভ, তখন সবচেয়ে বেশি খুশি হয়তো তাঁর স্ত্রীই। টিভির ক্যামেরার সামনে কৌস্তভ একগাল হেসে জানান, “আমার স্ত্রী প্রীতি তো ইতিমধ্যেই অনেক প্ল্যান করে ফেলেছে। কবে থেকে চুল গজানো শুরু হবে, চুলের যত্নের জন্য কী কী করতে হবে, কোন তেল বা শ্যাম্পু মাখতে হবে— তার একটা লম্বা তালিকা সে বানিয়ে ফেলেছে। আজ থেকে আমার বাড়িতে চুলের যত্ন নেওয়ার উৎসব শুরু হয়ে গেল।” এই ছোট্ট কথাটার মধ্যে দিয়ে একজন স্ত্রীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান এবং ভালোবাসার এক অপূর্ব ছবি ফুটে ওঠে, যা যেকোনো শুষ্ক রাজনৈতিক খবরের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলার রাজনীতিতে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, অনেক প্রতিজ্ঞা করা হয়, কিন্তু তার বেশিরভাগই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু কৌস্তভ বাগচীর এই ঘটনা এক বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবে। একজন মানুষ তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্যের জন্য নিজের শারীরিক সৌন্দর্যকে কীভাবে বছরের পর বছর বিসর্জন দিতে পারেন, তা আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে একটি শিক্ষার বিষয় হয়ে উঠবে। ৪ মে-র এই সকাল কৌস্তভের জীবনে শুধু একটি রাজনৈতিক বিজয় নিয়ে আসেনি, এটি ফিরিয়ে এনেছে তাঁর সেই হারানো অহংকার, তাঁর সেই প্রিয় চুল, আর সবার ওপরে তাঁর সেই অপরাজিত আত্মসম্মানবোধ। বাংলার রাজনীতিতে আজ থেকে শুরু হলো কৌস্তভ বাগচীর এক নতুন অধ্যায়— যেখানে ন্যাড়া মাথার জেদ এবার পরিণত হবে এক নতুন দায়িত্ববোধের মুকুটে।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- জেনে নিন বন্দেমাতরম (National Song) সম্পর্কে নানা অজানা কথা। unknown story of vande mataram
- মহিলাদের বাসে টিকিট কাটতে হবে না! জানুন, এই কার্ড থাকলেই দিঘা থেকে দার্জিলিং সফর ফ্রী তে
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই

