ভারতের বেসরকারি মহাকাশ অভিযানে নতুন ইতিহাস গড়ল স্কাইরুট। সফলভাবে কক্ষপথমুখী উৎক্ষেপণের মাধ্যমে Skyroot Vikram-1 Mission দেশের মহাকাশ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিল এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের সক্ষমতার শক্তিশালী বার্তা তুলে ধরল।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে ১৮ জুলাই ২০২৬ দিনটি স্মরণীয় হয়ে রইল। দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিক প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং কয়েক বছরের নিরলস গবেষণার পর অবশেষে দেশের প্রথম বেসরকারি সংস্থার তৈরি কক্ষপথগামী রকেট সফলভাবে মহাকাশে পাঠাল হায়দরাবাদভিত্তিক স্কাইরুট অ্যারোস্পেস। ‘আগমন’ নামে এই ঐতিহাসিক অভিযানের মাধ্যমে শুধু একটি রকেট উৎক্ষেপণই নয়, আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ পরিষেবার বাজারে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটল।
এই সাফল্য ভারতের মহাকাশ অভিযানে এক নতুন যুগের সূচনা করল। এতদিন পর্যন্ত কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানোর দায়িত্ব মূলত সরকারি সংস্থা ইসরোর হাতেই ছিল। এবার সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করল একটি ভারতীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
বহু বছরের প্রস্তুতির পর ঐতিহাসিক সাফল্য
স্কাইরুট অ্যারোস্পেস ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ভারতের বেসরকারি মহাকাশ প্রযুক্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। এরপর দীর্ঘ গবেষণা, নকশা তৈরি, ইঞ্জিন পরীক্ষা, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত যাচাই এবং ২০২২ সালে বিক্রম-এস সাব-অরবিটাল রকেটের সফল উৎক্ষেপণের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা হয় বিক্রম-১।
শনিবার শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে দুপুর ১২টা ৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে আকাশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে সাততলা সমান উচ্চতার এই রকেট।
যদিও নির্ধারিত সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে উৎক্ষেপণের কথা ছিল, উৎক্ষেপণের কয়েক মিনিট আগে মিশন কন্ট্রোল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় চিহ্নিত করে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে উৎক্ষেপণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। সমস্ত ব্যবস্থা পুনরায় পরীক্ষা করে সবুজ সংকেত মেলার পর পুনরায় কাউন্টডাউন শুরু হয়।
অবশেষে সফল উৎক্ষেপণের পর মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যেই, দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে, নির্ধারিত কক্ষপথে পেলোড সফলভাবে স্থাপন করা হয়। তখনই উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ভেসে আসে ঐতিহাসিক ঘোষণা—
“হ্যালো মহাকাশ, আমরা এসে গেছি।”
ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পে নতুন যুগের সূচনা
এই সাফল্যের মাধ্যমে স্কাইরুট অ্যারোস্পেস বিশ্বের সেই অল্প কয়েকটি বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার তালিকায় জায়গা করে নিল, যারা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে কক্ষপথগামী রকেট তৈরি এবং সফল উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘আগমন’ মিশন শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; এটি বিশ্ব বাণিজ্যিক মহাকাশ বাজারে ভারতের বেসরকারি শিল্পের সক্ষমতারও শক্তিশালী ঘোষণা। ক্ষুদ্র উপগ্রহ উৎক্ষেপণের আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত এখন আরও বড় ভূমিকা নিতে পারবে।
বিক্রম-১ কী কী বহন করেছে?
এই ঐতিহাসিক অভিযানে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত পরীক্ষা নয়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পেলোডও বহন করেছে বিক্রম-১।
রকেটে ছিল—
- গ্রাহা স্পেসের প্রযুক্তি প্রদর্শনকারী পেলোড
- কসমোসার্ভের পরীক্ষামূলক সরঞ্জাম
- ডিকিউবডের মহাকাশ প্রযুক্তি
- স্কাইরুটের নিজস্ব SCOPE প্ল্যাটফর্ম
- কসমোস ডায়মন্ডসের শিল্পকর্ম “কসমিক ব্লুম”
- ক্ষুদ্র শিল্পকর্মে নোবেলজয়ী সি. ভি. রমন, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জনক ড. বিক্রম সারাভাই এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম-এর মাইক্রো ভাস্কর্য
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বিক্রম-১
বিক্রম-১ একটি বহু-ধাপবিশিষ্ট কক্ষপথগামী উৎক্ষেপণযান।
রকেটটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য—
- সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট কাঠামো
- স্কাইরুটের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি থ্রিডি-প্রিন্টেড ইঞ্জিন
- উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কঠিন জ্বালানির বুস্টার
- দ্রুত ও চাহিদাভিত্তিক উৎক্ষেপণের উপযোগী নকশা
এই উৎক্ষেপণযান পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit) ৩৫০ কেজি পর্যন্ত ক্ষুদ্র উপগ্রহ বহন করতে পারে।
প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ানে ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে ৬০ ডিগ্রি ঢালে পেলোড সফলভাবে স্থাপন করে বিক্রম-১।
বিক্রম সারাভাইকে শ্রদ্ধা
রকেটটির নাম রাখা হয়েছে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জনক ড. বিক্রম সারাভাই-এর স্মৃতিতে।
এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে স্কাইরুট বিক্রম-এস সাব-অরবিটাল রকেট উৎক্ষেপণ করে ভারতের প্রথম বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে আরও উন্নত বিক্রম-১।
প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
উৎক্ষেপণের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই অভিযাত্রাকে ভারতের মহাকাশ ইতিহাসের “ঐতিহাসিক নতুন দিগন্ত” বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, চার ধাপবিশিষ্ট এই উৎক্ষেপণযান দ্রুত এবং চাহিদাভিত্তিক উৎক্ষেপণ পরিষেবা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। ভারতের তরুণ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী শক্তিরই প্রতিফলন এই সাফল্য।
স্কাইরুট দলের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিক্রম-১ নতুন ইতিহাস গড়ে আগামী প্রজন্মের উদ্ভাবকদের অনুপ্রাণিত করবে।
মহাকাশে পৌঁছল প্রধানমন্ত্রীর বার্তাও
‘আগমন’ মিশনের সঙ্গে একটি বিশেষ স্মারক কার্ডে লেখা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তাও মহাকাশে পাঠানো হয়েছে, এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের শুভেচ্ছাবার্তাও এই অভিযানের সঙ্গে কক্ষপথে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের হাতে লেখা বার্তাটি ছিল মাত্র দুটি শব্দ—“বন্দে মাতরম।”
বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের সম্মান জানিয়ে বিশেষ উদ্যোগ
স্কাইরুট অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, বিক্রম-১ রকেটের গায়ে সংস্থার বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং কর্মীদের স্বাক্ষর সংরক্ষণ করা হয়েছে।
যাঁদের বহু বছরের পরিশ্রম, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ফল এই ঐতিহাসিক সাফল্য, তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতেই নেওয়া হয়েছে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
‘আগমন’ মিশনের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ভারত শুধু আর একটি রকেট মহাকাশে পাঠায়নি। একই সঙ্গে বিশ্বকে জানিয়ে দিল, সরকারি সংস্থার পাশাপাশি ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পও এখন আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ পরিষেবার বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বৈশ্বিক বাজার আগামী কয়েক বছরে দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। সেই বাজারে স্কাইরুটের মতো ভারতীয় সংস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং ভারতের মহাকাশ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
রাত পেরিয়েও অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা এল না? এবার কী করতে হবে জেনে নিন, মিস করবেন না
রাজ্যে চালু প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা, ১১ হাজার টাকা পাবেন কারা? জেনে নিন কীভাবে আবেদন করবেন?
মহিলাদের বাসে টিকিট কাটতে হবে না! জানুন, এই কার্ড থাকলেই দিঘা থেকে দার্জিলিং সফর ফ্রী তে
আপনার এলাকায় কি মিলবে ১২৫ দিনের কাজ? আজ থেকেই চালু নতুন প্রকল্প, জানুন কারা পাবেন এই সুবিধা

