Uttam Kumar Fashion: উত্তম কুমারের পোশাক, সানগ্লাস, চুলের স্টাইল আর পর্দায় নিজেকে বহন করার অনন্য ভঙ্গি শুধু তাঁর নায়কসুলভ আকর্ষণকেই বাড়ায়নি, তৈরি করেছিল বাঙালি পুরুষের ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বের এক স্বতন্ত্র, চিরকালীন সিগনেচার স্টাইল।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তম কুমারকে মনে পড়লেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর সেই মায়াবী হাসি। মনে পড়ে তাঁর অভিনয়, তাঁর হেঁটে চলার ভঙ্গি, কথা বলার নিজস্ব ধরন, কিংবা নায়িকাদের সঙ্গে পর্দার সেই চিরপরিচিত রোম্যান্স। নাকি ধুতি-পাঞ্জাবিতে এক পরিপাটি বাঙালি পুরুষ, কিংবা শার্ট-প্যান্টে আত্মবিশ্বাসী শহুরে নায়ক? আবার ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখার্জির চোখে সেই কালো সানগ্লাস, গায়ে পরিপাটি পোশাক—সেই ছবিটিও কি আলাদা করে মনে পড়ে না? আসলে উত্তম কুমারের আকর্ষণ শুধু তাঁর চেহারা বা অভিনয়ে আটকে ছিল না। তাঁর পোশাক, চুলের ধরন, চশমা, হাঁটার ভঙ্গি, হাসি এবং শরীরী ভাষা মিলেই তৈরি হয়েছিল এক সম্পূর্ণ নায়ক-ব্যক্তিত্ব। ধুতি-পাঞ্জাবিতে বাঙালি পুরুষের পরিশীলিত সৌন্দর্য, কখনও শার্ট-প্যান্টে আধুনিক শহুরে ব্যক্তিত্ব, আবার কখনও স্যুট, কোট কিংবা কালো সানগ্লাসে আত্মবিশ্বাসী তারকার উপস্থিতি—প্রতিটি লুক যেন তাঁর চরিত্রের আলাদা একটি পরিচয় তৈরি করত।
‘সপ্তপদী’-র কৃষ্ণেন্দু: হাফহাতা শার্ট, ধুতি আর এক চিরন্তন প্রেমিকের চেহারা
উত্তম কুমারের পোশাকের কথা উঠলে ‘সপ্তপদী’ আলাদা করে আসবেই। ১৯৬১ সালের এই ছবিতে তিনি কৃষ্ণেন্দু চরিত্রে। এখানে তাঁর পোশাকের সৌন্দর্য ছিল তার স্বাভাবিকতায়। হাফহাতা শার্ট, ধুতি, কখনও শার্টের হাতা গুটিয়ে নেওয়া—সব মিলিয়ে তিনি যেন সেই সময়ের শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, কর্মজীবী বাঙালি যুবকের এক পরিচিত অথচ পর্দায় আরও আকর্ষণীয় সংস্করণ।
এই সাজে কোনও অতিরিক্ত জাঁকজমক নেই। বরং সেটিই ছিল শক্তি। ধুতির সঙ্গে হাফহাতা শার্ট উত্তমের শরীরী ভাষাকে একদিকে বাঙালি রেখেছে, অন্যদিকে তাঁকে তরুণ ও স্বচ্ছন্দ করেছে। শার্টের হাতা গুটিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে তৈরি হয়েছে কাজের মানুষের স্বাভাবিকতা, আবার মুখের হাসি ও চোখের চাহনিতে এসেছে প্রেমিকের কোমলতা।
‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ দৃশ্যটি সেই ব্যক্তিত্বকে আরও গভীর করে দেয়। কৃষ্ণেন্দু ও রীনা ব্রাউনের প্রেমের সেই যাত্রা, গোধূলির আবহ, মোটরবাইক এবং উত্তমের হাসি—সব মিলিয়ে পোশাক আর চরিত্র যেন একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। গানটি ১৯৬১ সালের ‘সপ্তপদী’-র অন্যতম স্মরণীয় অংশ হয়ে আছে।

‘নায়ক’-এর অরিন্দম: স্যুট, সানগ্লাস আর শহুরে আত্মবিশ্বাস
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ উত্তম কুমারের পোশাক একেবারেই অন্য জগতের। এখানে তিনি অরিন্দম মুখার্জি—সফল চলচ্চিত্র তারকা, যার জীবন, খ্যাতি এবং ভিতরের দ্বন্দ্ব ট্রেনযাত্রার মধ্যে ধীরে ধীরে সামনে আসে। আর সেই চরিত্রের বাইরের আত্মবিশ্বাসকে দৃশ্যমান করে তোলে তাঁর পোশাক।
ধূসর স্যুট, পরিপাটি পোশাক এবং চোখে গাঢ় সানগ্লাস—‘নায়ক’-এর অরিন্দমের চেহারাকে এগুলি শুধু ‘স্টাইলিশ’ করেনি, চরিত্রের সামাজিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। ভারতীয় একাধিক ফ্যাশন বিশ্লেষণেও ‘নায়ক’-এ উত্তমের সানগ্লাস ব্যবহারের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
পরিপাটি স্যুটের সঙ্গে সানগ্লাস, চুলের সাজ, ট্রেনের কামরায় বসার ভঙ্গি— তৈরি হয় মধ্য-শতকের শহুরে আধুনিকতার এক ছবি। ‘নায়ক’-এর পোশাক তাই শুধু ফ্যাশন নয়, চরিত্রের ভাষা। উত্তমের এই স্যুট তৈরির সঙ্গে তাঁর পরিচিত দর্জি বরকত আলী ও গোলাম মহম্মদের নাম জড়িয়ে আছে।
উত্তম কুমারের ধুতি-পাঞ্জাবি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচয়গুলির একটি। বিশেষ করে তাঁর ধুতি পরার ধরন ছিল আলাদা। ধুতির কোঁচা, পাড়ের ব্যবহার, পাঞ্জাবির গড়ন এবং পোশাকের সঙ্গে শরীরী ভাষা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব ছাঁচ। এমনকি তাঁর ধাক্কাপাড় ধুতির নকশা নিয়ে অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের ভূমিকার কথাও বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়। সাদা ধুতি, সুতি বা সিল্কের পাঞ্জাবি, কখনও কাঁধে ভাঁজ করা শাল—এই সাজে তিনি কখনও গৃহস্থ, কখনও প্রেমিক, কখনও পরিবারের দায়িত্বশীল মানুষ। অর্থাৎ একই পোশাক বিভিন্ন চরিত্রে আলাদা অর্থ পেয়েছে। এটাই উত্তমের পোশাকের আসল জাদু।
উত্তম কুমারের ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু স্যুট বা জমকালো পোশাকের কথা বললে তাঁর আসল বৈচিত্র্য ধরা পড়ে না। তাঁর অন্যতম শক্তি ছিল সাধারণ পোশাককেও আকর্ষণীয় করে তোলা। ‘সাগরিকা’-র মতো ছবিতে তাঁর পোশাকের মধ্যে সেই সময়ের শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষের স্বাভাবিকতা পাওয়া যায়। শার্ট, ট্রাউজার্স, ধুতি—পরিস্থিতি অনুযায়ী পোশাক বদলেছে, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব বদলায়নি। কখনও পোশাক ঢিলেঢালা, কখনও পরিপাটি; কোথাও শার্ট গুঁজে পরা, কোথাও হাতা গুটিয়ে নেওয়া—এই ছোট ছোট বৈশিষ্ট্যই চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
উত্তমের পোশাকে একটি বিষয় বারবার দেখা যায়—অতিরিক্ত আঁটসাঁট বা শরীর প্রদর্শনের বদলে ছিল স্বচ্ছন্দতা। সেই সময়ের নায়কের পৌরুষকে তিনি মূলত পেশির প্রদর্শন দিয়ে তৈরি করেননি। তাঁর শক্তি ছিল দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে, হাঁটার ছন্দে, মুখের অভিব্যক্তিতে এবং পোশাক বহন করার ক্ষমতায়।
এই কারণেই তাঁর ঢিলেঢালা ট্রাউজার্সও অগোছালো লাগত না। বরং তাতে একটা স্বচ্ছন্দ নাগরিক ব্যক্তিত্ব তৈরি হত। আজকের ভাষায় যাকে বলা যায় ‘effortless style’—উত্তমের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। ‘অমানুষ’: শার্টের নতুন ভাষা এবং মধ্যবিত্তের বাইরে এক অন্য উত্তম
সত্তরের দশকে উত্তম কুমারের পর্দার চরিত্র আরও জটিল হতে শুরু করে। ‘অমানুষ’-এর মতো ছবিতে তাঁর পোশাকেও সেই পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায়। সাধারণ শার্টের পাশাপাশি জ্যাকেট-ধাঁচের পোশাক, রেখাযুক্ত নকশা কিংবা একটু বেশি কাঠামোবদ্ধ সাজ তাঁর চরিত্রকে আগের দশকের রোম্যান্টিক নায়ক থেকে আলাদা করে দেয়।
উত্তম কুমারের পোশাকের বৈচিত্র্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয় যখন তিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত চরিত্র থেকে রাজকীয় বা অভিজাত চরিত্রে যান। ‘জিন্দের বন্দি’-র মতো ছবিতে তাঁর সাজে দেখা যায় রাজকীয় আবহ—পাগড়ি, মুকুট, আভিজাত্যপূর্ণ পোশাক এবং নিয়ন্ত্রিত শরীরী ভাষা।
উত্তম কুমারের স্টাইলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর সানগ্লাস। পোশাকের সঙ্গে চশমার ফ্রেম বদলালেই যেন বদলে যেত চরিত্রের মেজাজ। কখনও সেই চশমা তাঁকে দিয়েছে শহুরে, আধুনিক পুরুষের আত্মবিশ্বাসী চেহারা, কখনও আবার তৈরি করেছে রহস্যময়, দূরত্ব বজায় রাখা এক নায়কের উপস্থিতি।
রেট্রো লুক: চওড়া বা মোটা ফ্রেমের কালো চশমা তাঁর মুখে এনে দিত ষাট-সত্তরের দশকের সেই পুরনো দিনের সিনেমাটিক আকর্ষণ। বিশেষ করে গাঢ় ফ্রেমের চশমার সঙ্গে পরিপাটি চুল, শার্ট বা স্যুট—এই সমন্বয় তাঁকে আরও পরিণত এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে তুলত।
অ্যাভিয়েটার লুক: তুলনামূলক বড়, নিচের দিকে খানিকটা বাঁকানো লেন্সের অ্যাভিয়েটার ধরনের চশমা ব্যবহার করলে তাঁর চেহারায় আসত আরও সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী ভাব। এই ধরনের ফ্রেম পশ্চিমি পোশাক, খোলা কলারের শার্ট বা জ্যাকেটের সঙ্গে বিশেষভাবে মানানসই ছিল।
ওয়েফেয়ারার-ধাঁচের লুক: চওড়া, কোণাকুণি এবং শক্ত ফ্রেমের চশমা তাঁর চেহারায় এনে দিত আরও আধুনিক শহুরে ভাব। আজকের চোখে যাকে আমরা রেট্রো-ফ্যাশনের অন্যতম পরিচিত চেহারা বলি, উত্তমের পর্দার উপস্থিতিতেও সেই ধরনের গাঢ় ফ্রেমের চশমা আলাদা স্টাইল-স্টেটমেন্ট তৈরি করত।
আর ‘নায়ক’-এ এই চশমার ব্যবহার যেন অন্য মাত্রা পেয়েছিল। অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে কালো সানগ্লাস তাঁর তারকাসুলভ আত্মবিশ্বাস, জনপ্রিয়তা এবং একই সঙ্গে চরিত্রটির ভেতরের দূরত্বকে আরও দৃশ্যমান করেছিল। গবেষণাতেও ‘নায়ক’-এর উত্তমের কালো-সাদা পোশাক এবং কালো সানগ্লাসকে তাঁর আইকনিক পর্দা-ইমেজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
মহানায়ক উত্তম কুমারকে শুধু ‘সুদর্শন নায়ক’ বলা তাঁর প্রভাবকে ছোট করে দেখা। তিনি আসলে বাঙালি পুরুষের পর্দার উপস্থিতির একটি সম্পূর্ণ ভাষা তৈরি করেছিলেন—যেখানে ধুতি যেমন আধুনিক হতে পারে, স্যুটেও বাঙালিয়ানা থাকতে পারে, আর একটি সানগ্লাসও হয়ে উঠতে পারে চরিত্রের মনস্তত্ত্বের অংশ।
#UttamKumarFashion #UttamKumarStyle #UttamKumar #BengaliCinema #BengaliFashion #MensFashion #SignatureStyle #IconicFashion #IndianCinema #VintageFashion #RetroFashion #Tollywood
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

