Trump Xi Putin G3: ট্রাম্প, শি জিনপিং ও পুতিনকে ঘিরে সম্ভাব্য ত্রিমুখী সমীকরণ এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক জোট নয়। তবু তিন শক্তির মধ্যে সরাসরি বোঝাপড়া তৈরি হলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই ব্রিকস, চিন-রাশিয়া সম্পর্ক এবং নিজের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে সতর্ক নজর রাখছে ভারত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু বৈঠক থাকে, যার কোনও আনুষ্ঠানিক জোট তৈরি না হলেও তার সম্ভাব্য প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে সম্ভাব্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আলোচনা এখন তেমনই একটি বিষয়। এই তিন দেশের মধ্যে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক জোট তৈরি হয়নি। এমনকি তাঁদের সম্ভাব্য বৈঠককে কোনও নতুন শক্তিজোটের সূচনা বলেও ঘোষণা করা হয়নি। তবু এই আলোচনা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ভারত এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে যেখানে একাধিক শক্তিকেন্দ্র পাশাপাশি থাকবে এবং কোনও একটি দেশ বা জোট পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। এরই মধ্যে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। সেখানে চিন ও রাশিয়ার নেতৃত্বের উপস্থিতি এই আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ট্রাম্প-শি-পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে এত আলোচনা কেন? Trump Xi Putin G3
ট্রাম্প, শি জিনপিং এবং পুতিনের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকের আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে রুশ প্রেসিডেন্টের দফতরের এক আধিকারিক ইউরি উশাকভের বক্তব্যের পর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চিনে নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে চলা এপেক সম্মেলনের সময় তিন নেতার বৈঠকের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এই বৈঠক এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক নতুন জোটের ঘোষণা নয়। রাশিয়ার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, বৈঠক হলে তার আগে আলোচ্য বিষয় এবং উদ্দেশ্য নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
তিন দেশের স্বার্থও এক নয়। ট্রাম্পের কাছে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় ইউক্রেনের যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ। চিনের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, বিরল খনিজ, তাইওয়ান এবং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক বড় বিষয়। অন্যদিকে পুতিনের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ইউক্রেন-সংক্রান্ত চাপ কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। শি জিনপিংয়ের জন্য সরাসরি আলোচনার আর একটি তাৎপর্য রয়েছে—চিনকে এমন এক শক্তি হিসেবে তুলে ধরা, যে আমেরিকার সঙ্গে সমান স্তরে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা করতে পারে।
অর্থাৎ তিন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের হাতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেখানে সরাসরি কথাবার্তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। আর এখানেই ভারতের নজর।
এই ত্রিমুখী সমীকরণ কি ব্রিকসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে? Trump Xi Putin G3
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার—এই সম্ভাব্য ত্রিমুখী বৈঠককে এখনই ব্রিকসের বিকল্প বলা যায় না। ব্রিকস একটি বিস্তৃত বহুপাক্ষিক মঞ্চ, যেখানে একাধিক দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বিদেশনীতি একে অপরের থেকে যথেষ্ট আলাদা। সেখানে আলোচনা করতে গেলে বহু দেশের মতামতকে একসঙ্গে সামলাতে হয়।
ভারত, চিন ও রাশিয়া একই ব্রিকস মঞ্চে থাকলেও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে তাঁদের অবস্থান সবসময় এক নয়। ব্রিকসের সম্প্রসারণের পর এই জটিলতা আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো সদস্যদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্যও সামনে এসেছে। ফলে এগারো দেশের একটি বিস্তৃত মঞ্চে কোনও বিষয়ে একমত হওয়া স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ।
অন্যদিকে তিন দেশের সরাসরি আলোচনা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হতে পারে। মাত্র তিনটি শক্তির মধ্যে কোনও বিষয়ে বোঝাপড়া তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য দেশগুলির উপরও পড়তে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকস অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। বরং দুই ধরনের কূটনৈতিক কাঠামোর উদ্দেশ্য আলাদা। ব্রিকসের পরিসর বড় এবং সেখানে উদীয়মান অর্থনীতি ও শক্তিশালী উন্নয়নশীল দেশগুলি একসঙ্গে কাজ করে। আর ট্রাম্প-শি-পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠক হলে সেটি মূলত তিনটি বড় শক্তির সরাসরি যোগাযোগের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
ভারত কেন এতটা সতর্কভাবে নজর রাখছে? Trump Xi Putin G3
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তগুলি কি এমন কোনও ছোট পরিসরের আলোচনায় নেওয়া শুরু হবে, যেখানে ভারত থাকবে না?
ভারতের বিদেশনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল একাধিক শক্তির সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রাখা। নয়াদিল্লি চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করে, আবার আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই নীতির লক্ষ্য কোনও একটি শক্তিশিবিরে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে পড়া নয়। বরং নিজের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করা।
এই কারণে ব্রিকস ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভারত একই মঞ্চে চিন, রাশিয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়। আবার ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী শক্তিজোটে পরিণত করার ক্ষেত্রেও ভারত সতর্ক।
কিন্তু যদি আমেরিকা, চিন এবং রাশিয়া নিজেদের মধ্যে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে শুরু করে, তাহলে ভারতের কূটনৈতিক পরিসর কিছুটা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের মতো বিষয় যদি কয়েকটি বড় শক্তির আলোচনায় নির্ধারিত হতে থাকে, তাহলে ভারতের পক্ষে সেই আলোচনার বাইরে থাকা কৌশলগতভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে।
রাশিয়া কি আমেরিকার দিকে এগিয়ে গেলে ভারতের সমস্যা বাড়বে? Trump Xi Putin G3
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহু দশকের। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে মস্কো এখনও নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই রাশিয়া যদি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন পথ তৈরি করে, তা ভারতকে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য করতে পারে।
তবে এখানেও সরল সমীকরণ টানা ঠিক হবে না। রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হলেও মস্কো যে চিন বা ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেড়ে দেবে, এমন কোনও ইঙ্গিত নেই। একইভাবে চিনও আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করলেই রাশিয়া বা অন্য অংশীদারদের থেকে দূরে সরে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় শক্তিগুলি একাধিক মঞ্চে একই সঙ্গে কাজ করতে চাইছে। চিন একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গেও বাণিজ্য ও কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা করছে। রাশিয়াও পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
এই বাস্তবতা ভারতের জন্য একটি শিক্ষা বহন করে। নয়াদিল্লির পক্ষেও কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে স্থির বা চিরস্থায়ী সমীকরণ হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। বরং প্রতিটি সম্পর্ককে ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।
চিনের ভূমিকা নিয়েই ভারতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন? Trump Xi Putin G3
ট্রাম্প-শি-পুতিনের সম্ভাব্য সমীকরণে ভারতের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক সম্ভবত চিন। কারণ, ভারত ও চিন একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী এবং আলোচনাসঙ্গী।
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে টানাপোড়েন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। ব্রিকস সম্মেলনের সময় শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফর সেই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০১৯ সালের পর এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন পর্যায় তৈরির সুযোগও তৈরি করতে পারে।
কিন্তু সম্পর্কের উন্নতি মানেই পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। চিন যদি একই সময়ে আমেরিকার সঙ্গে নতুন ধরনের সমঝোতায় পৌঁছতে পারে এবং রাশিয়ার সঙ্গে নিজের সম্পর্কও আরও শক্তিশালী করে, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সেক্ষেত্রে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে—চিনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বজায় রেখেও নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।
ভারত তাই ব্রিকসকে শুধু একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে দেখছে না। এই মঞ্চে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা, একই সঙ্গে অন্য শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা—দুটিই নয়াদিল্লির বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলের অংশ।
তাহলে কি ব্রিকসের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে? Trump Xi Putin G3
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। বরং ভারতের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব এখনও যথেষ্ট। কারণ এই মঞ্চে ভারত একসঙ্গে চিন, রাশিয়া এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে কাজ করতে পারে।
২০২৬ সালে ভারত ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে। এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সরবরাহব্যবস্থার মতো বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলিতে জোর দেওয়ার কথা সামনে এসেছে। অর্থাৎ ব্রিকসকে শুধু রাজনৈতিক বিবৃতির মঞ্চ না রেখে বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে কার্যকর করার চেষ্টা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ব্রিকসের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে। এই সংগঠন কি এমন একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে, যেখানে সদস্যরা নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ নিয়ে কাজ করবে? নাকি বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বিরোধ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও ধীর হয়ে যাবে?
ভারতের অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লি চায় ব্রিকস কার্যকর হোক, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনও শক্তিজোটে পরিণত না হোক, যাকে সরাসরি আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরোধী মঞ্চ হিসেবে দেখা হবে। কারণ ভারত একই সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও এগিয়ে নিতে চাইছে।
#TrumpXiPutinG3 #TrumpXiPutin #G3GlobalPolitics #BRICS #IndiaForeignPolicy #IndiaRussiaRelations #IndiaChinaRelations
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?
১লা আগস্ট থেকে স্কুলের খাবারের দায়িত্ব ইস্কনের, ডিম বিতরণ, ও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা
কেন জেন জির ‘ক্রাশ’ সৌরভ দাস ও অভিজিৎ দীপকে? নেপথ্যে কী রহস্য?

