নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আমেরিকা থেকে কলকাতায় ফেরার পরই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে ওঠা বিতর্ক নিয়ে সরব হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন—দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরই দেশজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই আবহে কলকাতায় ফিরে জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদ থেকে সরানোর দাবি তুলেছেন অভিষেক। পাশাপাশি আদালতের নজরদারিতে তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ভোটারদের ভোটাধিকার, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন।
কলকাতায় ফিরেই অভিষেকের সরাসরি দাবি
তিন সপ্তাহ পর দেশে ফিরে কলকাতায় পা রাখার পরই নির্বাচন কমিশন নিয়ে নিজের বক্তব্য সামনে আনেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, অনেকেরই চিন্তা ছিল তিনি ফিরবেন কি না। সেই প্রসঙ্গেই তাঁর বক্তব্য—
“অনেকের চিন্তা ছিল আমি ফিরব কি না। আমি ফিরে এলাম, আমি কলকাতায়।”
এর পরেই নির্বাচন কমিশন ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। অভিষেকের দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে সরিয়ে দেওয়া উচিত এবং পুরো বিষয়টির তদন্ত আদালতের নজরদারিতে হওয়া দরকার। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টেও একই দাবি উঠে এসেছে।
১০ মাসে ১৪ বার আপত্তির প্রতিবেদন ঘিরেই বিতর্ক
অভিষেকের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সেই প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন ভোটার যুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার তথ্যভাণ্ডার সংক্রান্ত বিষয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য ছিল, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা বা তাঁদের জ্ঞাতসারে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ভোটার তালিকা সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পরই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অবস্থান নিয়ে একাধিক দাবি সামনে এসেছে।
ভোট দিতে না পারা মানুষদের প্রসঙ্গ তুলে অভিষেক
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে ভোটারদের ভোটাধিকার নিয়েও সরব হন। তিনি বলেন, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের শক্তির কথা মনে রাখা দরকার। যাঁরা ভোট দিতে পারেননি, তাঁদের চোখের জল এবং অভিশাপ বিফলে যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অভিষেকের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের সমস্যার প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, ভোট দেওয়ার জন্য মানুষকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে এবং ফর্ম পূরণের নাম করে বহু মানুষকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বয়স্ক মানুষ এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদেরও দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ তোলেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল—
“একশো চল্লিশ কোটি ভারতীয় দেশের শক্তি। আজকে যারা ভোট দিতে পারেনি, তাদের অভিশাপ, তাদের চোখের জল—যারা লাইনে দাঁড়িয়ে মারা গেছে, … পঁচাশি বছর বয়স, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মহিলাদের লাইনে, লম্বা লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ফর্ম ফিল আপের নাম করে। এদের চোখের জল, অভিশাপ মিথ্যা যাবে না।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই ভোটারদের ভোটাধিকার নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন অভিষেক।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরিয়ে তদন্তের দাবি
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে অভিষেক সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর দাবি জানান। একই সঙ্গে আদালতের নজরদারিতে তদন্তের কথাও বলেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য—
“মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অবিলম্বে সরিয়ে দিতে হবে এবং আদালতের নজরদারিতে তদন্ত করতে হবে।”
অভিষেক আরও অভিযোগ করেন, কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তা হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। তবে এই বক্তব্য তাঁর অভিযোগ ও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের পর বিরোধীদের চিঠির প্রসঙ্গ
নিজের পোস্টে অভিষেক পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কাছে পাঠানো চিঠির কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি লিখেছেন—
“পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর ইন্ডিয়া জোটের সমস্ত বিরোধী দল প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কাছে চিঠি লিখে গুরুতর উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযোগগুলি পরীক্ষা করা হয়নি এবং যে পর্যায়ের পর্যালোচনা প্রয়োজন ছিল, তাও করা হয়নি।”
এর পরেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এমন গুরুতর প্রশ্ন বারবার ওঠার পরও যদি তা শোনা না হয়, তা হলে প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
অভিষেকের ভাষায়—
“গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এমন গুরুতর প্রশ্ন বারবার ওঠার পরও যদি তা শোনা না হয়, তা হলে অনিবার্যভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।”
সুপ্রিম কোর্টের দিকে সরাসরি প্রশ্ন
পোস্টের শেষাংশে অভিষেক সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন—
“সুপ্রিম কোর্ট চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। এর দায় সেখানেই গিয়ে থামে।”
এর পরেই তাঁর সরাসরি প্রশ্ন—
“প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কি পদক্ষেপ করবে?”
এভাবেই কলকাতায় ফেরার পর নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে চলা বিতর্কে নিজের অবস্থান সামনে আনলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মূল দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার গণেশ কুমারকে অবিলম্বে সরানো এবং আদালতের নজরদারিতে তদন্ত করা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনারের একাধিক আপত্তির কথা উঠে এলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সব সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে দেশজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, তিন কমিশনারের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে।
#AbhishekBanerjee #GyaneshKumar #ElectionCommission #ChiefElectionCommissioner #SIR #ElectoralRoll #TMC #WestBengalPolitics
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

