নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দুর্গাপুজোর আনন্দের মধ্যেই চোরবাগানের মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনা ঘিরে শোকস্তব্ধ কলকাতা। দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর শহরের পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Kolkata Police Safety Guidelines) নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও প্রবেশপথ সংকীর্ণ, কোথাও বেরোনোর রাস্তা যথেষ্ট প্রশস্ত নয়, আবার কোথাও বিপুল দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রবিবার সকাল থেকে কলকাতা পুলিশের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে।
পুজোর ভিড় সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন নয়জন ভারতীয় পুলিশ পরিষেবার আধিকারিককে সাময়িকভাবে কলকাতা পুলিশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত, গিরিশ পার্ক থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের বদল, সমস্ত থানায় ১১ দফা নিরাপত্তা নির্দেশিকা পাঠানো এবং পুজোমণ্ডপগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিশেষ দল গঠনের মতো পদক্ষেপের কথা জানা যাচ্ছে। পাশাপাশি বিশেষ প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ভিড় আটকে দেওয়ার নির্দেশের কথাও উঠে এসেছে। তবে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলির আনুষ্ঠানিক আদেশ এবং সর্বশেষ হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে পদক্ষেপগুলি নেওয়া হয়েছে বলে যে তথ্য সামনে এসেছে, সেটিও সরকারি নথি ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
চোরবাগান বিপর্যয়ের পর কলকাতা পুলিশে ফিরছেন ৯ অভিজ্ঞ আধিকারিক
চোরবাগানের ঘটনার পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলির একটি হল পুজোর ভিড় সামলাতে অভিজ্ঞ নয়জন ভারতীয় পুলিশ পরিষেবার আধিকারিককে কলকাতা পুলিশে সাময়িকভাবে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রবিবার বিকেলের মধ্যেই তাঁদের কলকাতা পুলিশে যোগ দিতে বলা হয়েছে। এই আধিকারিকদের প্রত্যেকেরই অতীতে শহরের দুর্গাপুজোর নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের কাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পুজোর বাকি দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোই এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
যে নয়জন আধিকারিকের নাম সামনে এসেছে, তাঁরা হলেন শুভঙ্কর ভট্টাচার্য, মিরাজ খালিদ, রূপেশ কুমার, তরুণ হালদার, সৌম্য রায়, প্রিয়ব্রত রায়, দীপক সরকার, সুমনজিৎ রায় এবং মাহমুদ আক্তার।
প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, তাঁদের স্থায়ী বদলির পরিবর্তে পুজোর নিরাপত্তার প্রয়োজনে সাময়িকভাবে কলকাতা পুলিশে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে প্রত্যেককে কোন এলাকায় বা কোন নির্দিষ্ট দায়িত্বে রাখা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি নির্দেশ এখনও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
কলকাতার দুর্গাপুজোয় একাধিক বড় মণ্ডপে একই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। কোনও একটি মণ্ডপের প্রবেশপথ বা বেরোনোর রাস্তায় হঠাৎ চাপ বেড়ে গেলে তার প্রভাব আশপাশের রাস্তা এবং অন্য মণ্ডপের দর্শনার্থীদের উপরেও পড়তে পারে। এই কারণেই অভিজ্ঞ আধিকারিকদের মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
গিরিশ পার্ক থানার ওসি বদল, অতিরিক্ত দায়িত্বে হীরক দলপতি
চোরবাগানের ঘটনার পর গিরিশ পার্ক থানার নেতৃত্বেও পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গিরিশ পার্ক থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক সুমিতকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিক হীরক দলপতিকে রবিবার থেকে ওই থানার অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে বলা হয়েছে।
হীরক দলপতি এর আগে তারাতলার একটি ঘটনার তদন্তকারী দলের সদস্য ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে, সুমিত অতীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি সভাকে কেন্দ্র করে গিরিশ পার্ক থানা এলাকায় অশান্তির ঘটনার পর অন্য থানা থেকে এখানে বদলি হয়ে এসেছিলেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
তবে সুমিতকে সরানোর প্রশাসনিক কারণ কী, তাঁকে অন্য কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এই পরিবর্তন সরাসরি চোরবাগানের ঘটনার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা আনুষ্ঠানিক নির্দেশ ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
একটি বড় দুর্ঘটনার পরে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশি ব্যবস্থাপনা নতুন করে সাজানো প্রশাসনিক পদক্ষেপের অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনও আধিকারিককে বদলি করা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে দায় প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
চোরবাগানের ঘটনার ক্ষেত্রে ভিড় নিয়ন্ত্রণে কোথায় ঘাটতি ছিল, মণ্ডপের প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ ছিল এবং বিপদের সময় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
লালবাজার থেকে ১১ দফা নির্দেশ, মণ্ডপের প্রবেশ ও প্রস্থানপথে বিশেষ নজর
চোরবাগানের ঘটনার পর কলকাতার সমস্ত থানায় লালবাজার থেকে ১১ দফা নিরাপত্তা নির্দেশিকা পাঠানোর কথা জানা যাচ্ছে। প্রাপ্ত বিবরণে এই নির্দেশিকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পুজোমণ্ডপের প্রবেশপথ এবং বেরোনোর রাস্তা বাধামুক্ত রাখার উপর। কোনও মণ্ডপের বাইরে বা ভিতরে এমন কোনও সামগ্রী রাখা যাবে না, যার কারণে দর্শনার্থীদের চলাচলে সমস্যা হতে পারে।
মণ্ডপ থেকে বেরোনোর প্রতিটি রাস্তা পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও অস্থায়ী কাঠামো, নির্মাণসামগ্রী বা অন্য কোনও জিনিসপত্র পড়ে থাকলে তা সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে ভিড়ের চাপে মানুষ যাতে কোনও বাধায় আটকে না যান, সেদিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মণ্ডপের ভিতরে এবং বাইরে দর্শনার্থীদের চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের নির্দেশও রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কোনও এলাকায় ভিড় বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হলে আগেভাগেই দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য নতুন দর্শনার্থীদের প্রবেশ আটকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিতে হবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভিড় সামলানোর অর্থ শুধু মানুষকে দ্রুত এগিয়ে দেওয়া নয়। বরং কোথায় চাপ তৈরি হচ্ছে, কোন দিকে মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কোন পথে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব, তা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া।
১১টি নির্দেশের পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা নেই। ফলে উল্লিখিত বিষয়গুলিকেই নিশ্চিতভাবে জানা নির্দেশের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে; বাকি নির্দেশগুলি অনুমান করে যোগ করা হচ্ছে না।
স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে পুলিশি সমন্বয়, দড়ি ও গার্ডরেল রাখার নির্দেশ
পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ এবং পুজো কমিটির স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিক ও কনস্টেবলদের পুজো কমিটির পাঁচ থেকে ছয়জন স্বেচ্ছাসেবকের একটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করতে বলা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, মণ্ডপের ভিতরে বা বাইরে কোথাও অস্বাভাবিক ভিড় তৈরি হলে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদান করা। কোনও একটি প্রবেশপথে চাপ বাড়লে স্বেচ্ছাসেবকেরা পুলিশকে সতর্ক করতে পারবেন। আবার পুলিশ প্রয়োজনে দর্শনার্থীদের অন্য পথে পাঠানো কিংবা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত দড়ি, গার্ডরেল এবং ছোট আকারের শব্দবর্ধক যন্ত্র রাখার নির্দেশের কথাও জানা যাচ্ছে।
দড়ি ও গার্ডরেলের সাহায্যে দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ আলাদা করা যায়। অন্যদিকে, শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করে ভিড়ের মধ্যে দ্রুত নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে এই সরঞ্জামগুলি যথাযথভাবে ব্যবহার না করলে উল্টে চলাচলের পথে বাধা তৈরি হতে পারে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ প্রবেশাধিকার বা তথাকথিত অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রবেশপত্র বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথাও সামনে এসেছে। এর উদ্দেশ্য সাধারণ দর্শনার্থীদের চলাচলে অতিরিক্ত চাপ বা আলাদা প্রবেশব্যবস্থার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া আটকানো বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা সমস্ত পুজোমণ্ডপের জন্য প্রযোজ্য কি না, কত দিন কার্যকর থাকবে এবং কারা এর আওতায় পড়বেন, তা সরকারি নির্দেশের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বিশেষ দল ঘুরে দেখবে পুজোমণ্ডপ, আটক ও গ্রেফতার নিয়ে কী জানা যাচ্ছে?
চোরবাগানের ঘটনার পর কলকাতার পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে বিশেষ দল গঠনের কথাও জানা যাচ্ছে। এই দল বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ ঘুরে প্রবেশ ও প্রস্থানপথ, দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করবে।
কোনও মণ্ডপে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নজরে এলে তা সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই সঙ্গে হোমগার্ডদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে তাঁদের সম্পর্কে ঠিক কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, চোরবাগানের পদপিষ্টের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনার পর ১৪ জনকে আটক এবং তাঁদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেফতার করার কথাও জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
নিয়োগ দুর্নীতি কি আগামী দিনে কমবে? জানুন, চাকরির নিয়মে এই পরিবর্তনে আসবে কি স্বচ্ছতা?
এক্সপোজড! ককরোচ জনতা পার্টির নেপথ্যে কোন চক্রান্তের গন্ধ? সত্যিটা জানলে চমকে উঠবেন
মহিলাদের বাসে টিকিট কাটতে হবে না! জানুন, এই কার্ড থাকলেই দিঘা থেকে দার্জিলিং সফর ফ্রী তে

