মহাবীর কর্ণ সারাজীবন মানুষকে হীরে-জহরত দান করেছেন, তবুও মৃত্যুর পর একমুঠো ভাতের জন্য কেন তাঁকে কাঁদতে হয়েছিল? জানুন মহাভারতের সেই অজানা অধ্যায় এবং Karna Charity Legend-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্নদানের মহিমা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর তখন নিস্তব্ধ। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে রণক্ষেত্রে। সেই রক্তিম আলোয় শেষবারের মতো চোখ বুজলেন সূর্যপুত্র কর্ণ। সারা জীবন যিনি বঞ্চনা আর অপমানের শিকার হয়েছেন, মৃত্যুর মুহূর্তেও তাঁকে লড়তে হয়েছিল নিজের ভাগ্যের সঙ্গে।
আমরা সবাই জানি, কর্ণ ছিলেন ‘দানবীর’। প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে সূর্যের উপাসনা করার সময় তাঁর কাছে যে যা চাইত, তিনি হাসিমুখে তাই দান করতেন। এমনকি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগের দিনও তিনি নিজের কবচ-কুন্ডল কেটে দান করে দিয়েছিলেন ইন্দ্রদেবকে।
কিন্তু জানেন কি, এত বড় দাতা হওয়ার পরেও মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে কর্ণের ভাগ্যে জুটল চরম লাঞ্ছনা? স্বর্গের দেবতারা তাঁকে খেতে দিলেন সোনা, আর পান করতে দিলেন গলানো রুপো! ক্ষুধার্ত কর্ণ যখন একমুঠো অন্ন চাইলেন, তখন তাঁর থালায় সাজিয়ে দেওয়া হলো হীরে-জহরত আর পাথর।
কেন এমন হলো? যে হাত সারাজীবন শুধু দিয়ে গেছে, মৃত্যুর পর সেই হাত কেন শূন্য রইল? মহাভারতের এই অজানা উপাখ্যানটি শুধু একটি গল্প নয়, এটি আমাদের শেখায় জাগতিক ধন আর আধ্যাত্মিক পুন্যের আসল পার্থক্য। আসুন, ফিরে যাই সেই অলৌকিক সময়ে।
জানেন কি? অন্নপূর্ণা দেবীর মন্দিরে কেন ভিক্ষা দেন শিব
স্বর্ণের প্রাসাদে ক্ষুধার্ত আত্মা
মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা যখন ঊর্ধলোকে পৌঁছাল, তখন স্বর্গের দ্বার খুলে গেল। দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং তাঁকে স্বাগত জানালেন। গন্ধর্বদের গান আর অপ্সরাদের নৃত্যে চারদিক মুখরিত। কর্ণকে নিয়ে যাওয়া হলো এক বিশাল স্বর্ণপ্রাসাদে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো কিছুক্ষণ পরেই। দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে কর্ণের ভীষণ খিদে আর তেষ্টা পেয়েছিল। তিনি ইন্দ্রদেবকে বললেন, “দেবরাজ, আমি ক্ষুধার্ত। আমাকে সামান্য অন্ন দিন।” ইন্দ্রদেব মৃদু হাসলেন। তিনি ইশারা করতেই স্বর্ণপাত্রে খাবার এল। কিন্তু এ কী! থালায় ভাতের বদলে সাজানো আছে সোনার টুকরো। ডালের বাটিতে তরল সোনা, আর জলের গ্লাসে জ্বলজ্বল করছে হীরের টুকরো। কর্ণ অবাক হয়ে বললেন, “এসব কী? মানুষ কি সোনা খেতে পারে? আমাকে খাবার দিন।” ইন্দ্র উত্তর দিলেন, “রাধেয়, তুমি সারাজীবন যা দান করেছ, স্বর্গে তোমাকে তাই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তুমি মানুষকে প্রচুর স্বর্ণ, রত্ন আর ধনসম্পদ দিয়েছ। তাই তোমার প্রাপ্য শুধুই এই রত্নরাজি। তুমি তো কখনো কাউকে অন্ন দান করোনি!”
কর্ণ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “কিন্তু আমি তো কাউকে ফেরাইনি। কেউ আমার কাছে অন্ন চাইলে আমি নিশ্চয়ই দিতাম। কিন্তু আমার কাছে তো সবাই ধনরত্নই চাইতে আসত। আর আমি তো জানতাম না যে আমার পূর্বপুরুষরা কারা, তাই তাঁদের উদ্দেশ্যে আমি কখনও তর্পণ বা অন্নদান করার সুযোগ পাইনি। এতে আমার কী দোষ?”
কর্ণের এই হাহাকার স্বর্গের বাতাস ভারী করে তুলল। তাঁর যুক্তি ছিল অকাট্য। কুন্তীর পুত্র হয়েও তিনি সারাজীবন সুতপুত্র বা রাধাপুত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পিতৃপরিচয় না জানায় তিনি পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল বা পিন্ড দান করতে পারেননি। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যই কি তাঁকে অনন্তকাল না খেয়ে থাকতে হবে?
আরও পড়ুন : পনেরো দিনের মুক্তি এবং পিতৃপক্ষের সূচনা
কর্ণের এই দুর্দশা দেখে ধর্মরাজ যম এবং ইন্দ্রদেবের দয়া হলো। তাঁরা বুঝতে পারলেন, কর্ণের এই ভুল ইচ্ছাকৃত নয়। সূর্যদেবও তাঁর পুত্রের হয়ে অনুরোধ করলেন। তখন এক বিশেষ বিধান দেওয়া হলো। ইন্দ্রদেব বললেন, “হে দানবীর, তোমার দানের কোনো তুলনা নেই। কিন্তু ‘অন্নদান’ হলো মহাদান। স্বর্ণ মানুষের লোভ মেটায়, কিন্তু অন্ন মানুষের আত্মাকে তৃপ্ত করে। তুমি সেই পরম পুন্য থেকে বঞ্চিত। তোমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তোমাকে আমরা পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যলোকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি।”
সেই বিশেষ অনুমতি নিয়ে কর্ণের আত্মা পনেরো দিনের জন্য পৃথিবীতে ফিরে এল। এই সময়কালটি ছিল আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষ। পৃথিবীতে এসে কর্ণ এই পনেরো দিন ধরে দরিদ্র, ক্ষুধার্ত মানুষদের নিজের হাতে অন্ন দান করলেন। তৃষ্ণার্তকে জল দিলেন। এবং জেনে নিলেন তাঁর পূর্বপুরুষদের পরিচয়। ভক্তিভরে তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করলেন।
কর্ণের হাতের সেই অন্ন গ্রহণ করে তৃপ্ত হলো হাজার হাজার মানুষের আত্মা। সেই সঙ্গে তৃপ্ত হলেন তাঁর পিতৃপুরুষরা। পনেরো দিন পর যখন তিনি স্বর্গে ফিরে গেলেন, তখন আর তাঁকে স্বর্ণ খেতে হয়নি। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল অমৃতসমান অন্ন।
শাস্ত্র মতে, কর্ণের পৃথিবীতে ফিরে আসা ওই পনেরোটি দিনই হিন্দু ধর্মে ‘পিতৃপক্ষ’ বা ‘মহালয়া পক্ষ’ নামে পরিচিত। বিশ্বাস করা হয়, আজও এই সময়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা মর্ত্যলোকে নেমে আসেন আমাদের হাত থেকে জল ও অন্ন গ্রহণ করার আশায়। কর্ণের সেই কাহিনী থেকেই এই প্রথার গুরুত্ব ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষ্ণের শিক্ষা এবং দানের প্রকৃত অর্থ
যদিও এই ঘটনাটি মৃত্যুর পরের, তবুও এর পেছনে ছিল শ্রীকৃষ্ণের এক সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। কৃষ্ণ জানতেন, কর্ণ মহৎ হৃদয়বান। কিন্তু তাঁর দানে ‘করুণা’র চেয়ে ‘যশ’ বা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা হয়তো কিছুটা মিশ্রিত ছিল। কিংবা তিনি জাগতিক ঐশ্বর্যকেই সবথেকে বড় দান মনে করতেন।
কৃষ্ণ জগতকে এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে, ক্ষুধার্তের পেটের জ্বালা সোনা দিয়ে মেটে না। একজন মুমূর্ষু মানুষের কাছে এক ঘটি জল যা মূল্য রাখে, এক বস্তা হীরা সেই মূল্য রাখে না। কর্ণকে এই কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে আসলে জগতবাসীকে একটি চিরকালীন শিক্ষা দেওয়া হলো। তা হলো—তৃপ্তির চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। আপনি কত টাকা রোজগার করলেন বা কত সোনা জমালেন, তা মৃত্যুর পর আপনার সঙ্গে যাবে না। কিন্তু আপনি কতজন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন, কতজন তৃষ্ণার্তের তেষ্টা মিটিয়েছেন—সেই ‘কর্মফল’ বা পুন্যই হবে পরলোকে আপনার একমাত্র সম্বল।
মহাভারতের যুদ্ধ শেষ হয়েছে হাজার হাজার বছর আগে। কিন্তু কর্ণের সেই হাহাকার আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের ধ্রুব সত্য। আমরা অনেকেই ভাবি, টাকা থাকলেই সব হয়। কিন্তু যেদিন জীবনের শেষ হিসেবনিকেশ হবে, সেদিন দেখা যাবে—ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স নয়, বরং আপনার দেওয়া একমুঠো চালই আপনার সবথেকে বড় সঞ্চয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সুযোগ পেলেই ক্ষুধার্তকে অন্ন দিন। কারণ, শাস্ত্র বলছে, “অন্নদানং পরমং দানং” (অন্নদানই সর্বশ্রেষ্ঠ দান)। কে জানে, হয়তো এই ছোট কাজের মাধ্যমেই আপনি নিজের অজান্তে স্বর্গের পথ প্রশস্ত করছেন, যা মহাবীর কর্ণকেও কষ্ট করে অর্জন করতে হয়েছিল।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

