Allergy Causes and Prevention: অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা, বদলে যাওয়া জীবনযাপন আর আধুনিক পরিবেশের সঙ্গে শরীরের পুরনো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সংঘাত থেকেই বাড়ছে অ্যালার্জি। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁচি-চুলকানির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে শরীরের একটি গভীর সতর্ক সংকেত, যা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সকালের আলো ঠিকমতো ফুটে ওঠার আগেই হাঁচির শব্দে ঘুম ভাঙে। চোখ লাল, নাক দিয়ে জল পড়ছে, বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ। শহরের ফ্ল্যাটে জানলা বন্ধ, চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন—তবু শরীর যেন হঠাৎ করেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে নিজের চারপাশের বিরুদ্ধে। একসময় যা ছিল ঋতুর বদলের সঙ্গে আসা সামান্য অস্বস্তি, আজ তা অনেকের কাছে রোজকার সঙ্গী। এই অস্বস্তির নাম—অ্যালার্জি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে অ্যালার্জি আর বিচ্ছিন্ন কোনও সমস্যা নয়। ধীরে ধীরে, নীরবে, কিন্তু ভয়ংকর গতিতে তা ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। প্রশ্ন উঠছে—কেন হঠাৎ এত বেশি মানুষ অ্যালার্জিতে ভুগছেন? কেন শরীর নিরীহ ধুলো, ফুলের রেণু বা খাবারকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করছে? এই প্রতিবেদনে উঠে আসছে সেই সব প্রশ্নের উত্তর, যা সাম্প্রতিক এক আলোচনায় তুলে ধরেছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা।
অ্যালার্জি এখন কতটা বড় সমস্যা
গবেষণায় উঠে আসা তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩০% থেকে ৪০% মানুষ কোনও না কোনও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী ১০ বছরের মধ্যেই এই হার ৫০%-এ পৌঁছাতে পারে।
এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে। অর্থাৎ, যত আধুনিকতা, তত অ্যালার্জির ঝুঁকি—এই সমীকরণই এখন গবেষণার কেন্দ্রে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দশ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত দেশগুলিতেই অ্যালার্জির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এই বাস্তবতাই এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাঁচি, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট—এই উপসর্গগুলো আজ আর ছোটখাটো সমস্যা নয়। একসময় যা ছিল ঋতুভিত্তিক অস্বস্তি, আজ তা পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যচিন্তার বিষয়ে। চিকিৎসকদের মতে, আগামী দিনে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কোনও না কোনও অ্যালার্জিতে ভুগতে পারেন। প্রশ্ন একটাই—আমাদের শরীর কেন হঠাৎ এত বেশি ‘ভুল সংকেত’ দিচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ডঃ রঙ্গন চ্যাটার্জির সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী তেরেসা ম্যাকফেল। তাঁদের কথোপকথনে উঠে এসেছে অ্যালার্জির বিবর্তন, কারণ, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসা—যা বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যালার্জি কেন হয়?
যখন শরীরের এডাপটিভ ইমিউনিটি সিস্টেম কোন ক্ষতিকারক নয় এমন বস্তু, পিনাট ধুলো বা ফুলের রেনু কে মারাত্মক শত্রু মনে করে ভুল করে তখনই এলার্জি হয়। শরীরের আই জি ই অ্যান্টিবডি গুলো এই বস্তুগুলোকে ধ্বংস করতে গিয়ে শরীরে সমস্যা সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তৈরি হয়েছে। সেই পরিবেশে ছিল কৃমি, পরজীবী, নানা ধরনের জীবাণু। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত তাদের সঙ্গেই লড়াই করার জন্য গড়ে উঠেছে।
কিন্তু গত মাত্র দু’শো বছরে মানুষের জীবনযাত্রা নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, আধুনিক বাসস্থান, জীবাণুনাশক ব্যবহার—সব মিলিয়ে সেই পুরনো শত্রুরা প্রায় উধাও। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখন আর আগের মতো কাজ পায় না। এর ফলেই শুরু হয়েছে সমস্যা। শত্রু না পেয়ে শরীর ভুল করে নিরীহ জিনিসকেই শত্রু বলে চিহ্নিত করছে। ধুলো, ফুলের রেণু, নির্দিষ্ট খাবার—এসবের বিরুদ্ধেই শুরু হচ্ছে প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর সেখান থেকেই জন্ম নিচ্ছে অ্যালার্জি।

হাঁচি থেকে মৃত্যুঝুঁকি
সাধারণভাবে অ্যালার্জিকে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন—অ্যালার্জির একটি মারাত্মক রূপ রয়েছে, যা জীবনঘাতী হতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শরীরের প্রতিক্রিয়া এতটাই তীব্র হয় যে অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসরোধ, রক্তচাপ হঠাৎ নেমে যাওয়া এবং মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়।
একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মৌমাছির কামড়ের মতো ঘটনা থেকেও এমন ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যদিও এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল, তবু তা যে অসম্ভব নয়, সেটাই এই উদাহরণ মনে করিয়ে দেয়।
খাবারের অ্যালার্জি বাড়ছে সবচেয়ে দ্রুত
সব ধরনের অ্যালার্জির মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে খাবারজনিত অ্যালার্জি। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও স্কুলে হয়তো হাতে গোনা এক-দু’জন শিশুর খাবারের সমস্যা থাকত। আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।বর্তমানে বহু স্কুলে একই শ্রেণির জন্য একাধিক ধরনের খাবার আলাদা করে তৈরি করতে হয়। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প নয়, বরং একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
অ্যালার্জির প্রতিকারের উপায় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালার্জি এমন কোনও সমস্যা নয় যার একবারের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো যায়। তবে সঠিক জীবনযাপন, সচেতনতা ও চিকিৎসার মাধ্যমে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কোন জিনিসে অ্যালার্জি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি
অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হল—নিজের ট্রিগার চেনা। ধুলো, নির্দিষ্ট খাবার, ফুলের রেণু, পশুর লোম বা কোনও বিশেষ পরিবেশ—কোনটি শরীরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে, তা বুঝতে পারলে অনেকটাই ঝুঁকি কমানো যায়।বিশেষজ্ঞদের মতে, অকারণে সবকিছু এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং সচেতনভাবে ঝুঁকির উৎস জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে সমস্ত খাবারে এলার্জি আছে, তা এড়িয়ে চলা। যেমন ডিম, দুধ, বেগুন, বাদাম, চিংড়ি মাছ, আখরোট,কাঁকড়া ইত্যাদি।
চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী ও গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনও অ্যালার্জি বাড়ার অন্যতম কারণ। শিশুকাল থেকেই যদি শরীর খুব সীমিত জীবাণুর সংস্পর্শে আসে, তবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরবর্তীতে ভুল সংকেত দিতে শুরু করে।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে—
- সব সময় জীবাণুনাশক ব্যবহার না করা
- প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা
- স্বাভাবিক পরিবেশে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া
এই অভ্যাসগুলি দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হতে পারে।
কত ধরনের অ্যালার্জি হয়?
- ওষুধ থেকে এলার্জি
- খাবার থেকে এলার্জি
- পতঙ্গ থেকে এলার্জি
- ল্যাটেক্স এলার্জি
- ছত্রাক জনিত এলার্জি
- পশম যুক্ত পোষ্য প্রাণীর এলার্জি
- রেণুজনিত এলার্জি
অ্যালার্জি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
আমেরিকান কলেজ অফ এলার্জি, অ্যাজমা এবং ইমিউনোলজির বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালার্জি আসলে কোনও নতুন রোগ নয়। নতুন হল আমাদের পরিবেশ ও জীবনযাপন। মানুষের শরীর লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলেছে, আধুনিক সমাজ সেই পরিবেশ থেকে অনেকটাই আলাদা। চিকিৎসাবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসা শুধুই ওষুধে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নতুন করে শেখানোর দিকেই জোর দেওয়া হবে—কোনটা সত্যিকারের বিপদ, আর কোনটা নয়।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ

