Alpona Art of Bengal: আলপনা শিল্প শুধু নকশা নয়, বাংলার লোকজ বিশ্বাস ও নারীর ইতিহাসের প্রতীক। লক্ষ্মীপুজো থেকে গ্রামবাংলার উঠোন—আলপনার জন্ম, অর্থ ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা জানুন এই ফিচার স্টোরিতে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি উঠোন ছুঁয়ে দেখেনি। কুয়াশার নরম চাদরে ঢাকা গ্রাম। উঠোনে বসে আছেন মা, কাকিমা, দিদিমা—কারও হাতে চালের গুঁড়ো, কারও হাতে খড়ি। আজ লক্ষ্মীপুজো। ঘরের দোরগোড়া, উঠোনের মাঝখান, গোয়ালঘরের সামনে—সব জায়গায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে সাদা রেখার এক জাদু। কারও মুখে মন্ত্র, কারও ঠোঁটে গান, কারও চোখে বিশ্বাস—এই রেখাগুলো শুধু নকশা নয়, এ আশীর্বাদ। এটাই আলপনা।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আলপনাকে অনেকেই “ডেকোরেশন” বলে ভাবেন। কিন্তু গ্রামবাংলার মাটিতে, নারীর হাতে আঁকা এই শিল্প আসলে বিশ্বাস, সংস্কার, স্মৃতি ও সমাজের এক গভীর দলিল। আপনি এই লেখায় জানবেন—আল্পনা কীভাবে বাংলার লোকজীবনের সঙ্গে মিশে আছে, কেন এটি শুধু ছবি নয় বরং এক ভাষা, কেন লক্ষ্মীপুজো বা বিশেষ পুজোর ভোরে আলপনা ছাড়া গ্রামবাংলার ঘর অসম্পূর্ণ থেকে যায়, আর কীভাবে এই শিল্প আজও টিকে আছে আধুনিকতার চাপের মধ্যেও।
উঠোন থেকে ইতিহাস: আলপনার জন্মকথা
আল্পনা কোনও একদিন হঠাৎ তৈরি হওয়া শিল্প নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে বাংলার আদিম সমাজে। যখন মানুষ লিখতে জানত না, তখন সে আঁকত। অক্ষরের আগেও ছিল রেখা, চিহ্ন, প্রতীক। আলপনা সেই চিহ্নভাষার উত্তরাধিকার। গবেষকেরা মনে করেন, আলপনার মধ্যে আদিম চিত্রলিপি বা hieroglyph-এর ছায়া আছে—যেখানে রেখা দিয়ে ভাব প্রকাশ করা হতো।
গ্রামবাংলায় আলপনা মূলত ছিল নারীর শিল্প। পুরুষ বাইরে কাজ করত, নারী সামলাত সংসার, আচার, উৎসব। সেই আচারেই জন্ম নেয় আলপনা। চালের গুঁড়ো, জল, কখনও দুধ বা রঙ—এই সহজ উপকরণে তৈরি হত নকশা। কোথাও পদ্ম, কোথাও সূর্য, কোথাও পাখি, কোথাও জ্যামিতিক বৃত্ত। প্রত্যেকটি নকশার ছিল আলাদা অর্থ—সমৃদ্ধি, উর্বরতা, মঙ্গল, সুরক্ষা। বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে আলপনার ধরন আলাদা। কোথাও মোটা রেখা, কোথাও সূক্ষ্ম; কোথাও ভরাট, কোথাও ফাঁকা। কিন্তু একটি জিনিস অভিন্ন—আলপনা কখনও কেবল চোখের আরাম ছিল না, এটি ছিল বিশ্বাসের প্রকাশ।
এই লেখাগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—আলপনা ক্ষণস্থায়ী। আজ আঁকা, কাল মুছে যাবে। বৃষ্টি, পায়ের ছাপ, সময়—সবকিছুতেই সে হারিয়ে যায়। কিন্তু লেখাটি বলছে, এই ক্ষণস্থায়ীতাই আলপনার দার্শনিক শক্তি। কারণ আলপনা সংরক্ষণের জন্য নয়, ব্যবহারের জন্য। এটি গ্যালারির শিল্প নয়, জীবনের শিল্প। এই কারণেই আলপনা কখনও ভারী হয় না। এটি দাবি করে না স্থায়িত্ব, দাবি করে অংশগ্রহণ।
আলপনার প্রধান শিল্পী নারী। পুরুষের হাতে আলপনা আঁকার রীতি ছিল না বললেই চলে। মা থেকে মেয়ে, শাশুড়ি থেকে বউ—এইভাবে আলপনার শিক্ষা চলত। এই শিক্ষা কোনও স্কুলে শেখানো হতো না। কোনও ডিগ্রি, কোনও স্বীকৃতি ছিল না। তবু এই শিল্পে ছিল এক আশ্চর্য শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য ও ধারাবাহিকতা। ইতিহাস যেখানে নারীর নাম রাখেনি, সেখানে আলপনার রেখায় লুকিয়ে আছে তাঁদের উপস্থিতি।
আলপনা প্রকৃতির নকল নয়। এটি গাছের ছবি আঁকে না, গাছের ভাব আঁকে। পাখির অবয়ব নয়, পাখির ইচ্ছা।
এই কারণেই আলপনায় বাস্তবের মতো অনুপাত, পার্সপেক্টিভ বা শারীরিক সঠিকতা নেই। এখানে আছে মানসিক ভারসাম্য। বড় বৃত্তের মধ্যে ছোট বৃত্ত—জীবনের কেন্দ্রে সংসার, তার মধ্যে মানুষ, তার মধ্যে আশা।
এখানেই আলপনা আধুনিক বিমূর্ত শিল্পের সঙ্গে কথা বলে, এটি বাংলার লোকজ চেতনার গল্প। এমন এক শিল্পের গল্প, যা নিজের নাম রাখেনি, নিজের দাবি করেনি, তবু শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থেকেছে। উঠোনে বসে যে নারী আলপনা আঁকেন, তিনি জানেন না তিনি শিল্পী। কিন্তু তাঁর হাতেই লেখা হচ্ছে বাংলার এক নীরব ইতিহাস—যা বইয়ে নেই, কিন্তু মাটিতে আছে।
আধুনিক সময়ে আলপনা
আজকের দিনে আলপনার ভবিষ্যৎ কী? শহরে রেডিমেড স্টিকার, রঙিন পাউডার, ডিজিটাল প্রিন্ট ঢুকে পড়েছে। অনেক বাড়িতে হাতে আঁকা আলপনা আর দেখা যায় না।
কিন্তু ছবিটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। আজ অনেক শিল্পী আলপনাকে নতুন মাধ্যমে নিয়ে যাচ্ছেন—ক্যানভাস, দেওয়াল, ফ্যাব্রিক, এমনকি আধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইনেও। কলেজ, চারুকলা, লোকশিল্প গবেষণায় আলপনা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আলপনা বদলাচ্ছে, কিন্তু মরে যাচ্ছে না। কারণ এটি কেবল নকশা নয়—এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
লক্ষ্মীপুজো আর আলপনা
লক্ষ্মীপুজো মানেই আলপনা—এ কথা গ্রামবাংলায় প্রশ্নাতীত। বিশ্বাস করা হয়, লক্ষ্মী দেবী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন। তাই উঠোন ধুয়ে-মুছে, সাদা আলপনায় সাজিয়ে রাখা হয় তাঁর পথ। আলপনার পদ্ম যেন লক্ষ্মীর আসন, বৃত্ত যেন সমৃদ্ধির চক্র।
আগেকার দিনে মা-ঠাকুমারা বলতেন—“আলপনা ঠিক না হলে লক্ষ্মী রাগ করে ফিরে যান।” এই কথার মধ্যে হয়তো আধুনিক যুক্তি নেই, কিন্তু আছে এক সামাজিক শৃঙ্খলা। পরিষ্কার উঠোন, গোছানো ঘর, নিয়ম মেনে কাজ—এই সবই আলপনার মাধ্যমে শেখানো হতো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। আজও অনেক গ্রামে ভোরবেলা লক্ষ্মীপুজোর দিনে মেয়েরা দল বেঁধে আলপনা দেয়। কেউ শেখায়, কেউ শেখে। কোনও বই নয়, কোনও স্কেচ নয়—মুখে মুখে, হাতে হাতে এই শিল্পের উত্তরাধিকার চলে।
লক্ষ্মীপুজোর সকালে যখন কোনও গ্রামবাংলার উঠোনে সাদা আলপনা আঁকা হয়, তখন তা শুধু পুজোর আচার নয়। তা আসলে শতাব্দী পেরোনো এক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি। কোনও মিউজিয়ামে নয়, কোনও ফ্রেমে নয়—মাটির উপরেই বেঁচে থাকে এই শিল্প। আলপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিল্প সবসময় গ্যালারিতে থাকে না, অনেক সময় তা থাকে ঘরের দোরগোড়ায়, মায়ের হাতের আঙুলে, আর স্মৃতির ভাঁজে।
AlponaArt, #আলপনা_শিল্প, #BanglarLokoshilpo, #LakshmiPuja, #BengaliCulture, #FolkArt
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

