Arijit Singh Quit Playback | জিয়াগঞ্জের ছেলের গলায় কি অভিমানের সুর? নাকি ইঁদুর দৌড় থেকে মুক্তি নিয়ে তিনি হাঁটতে চাইছেন স্বাধীন মিউজিকের পথে? বোনের বার্তা এবং অরিজিতের পুরনো ভবিষ্যৎবাণী মিলিয়ে তৈরি বিশেষ প্রতিবেদন।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: “মুসাফির ম্যায় হুঁ ইয়ারো… না ঘর হ্যায় না ঠিকানা…”
হাজার ওয়াটের আলো ঝলকাচ্ছে স্টেজে। সামনে জনসমুদ্র। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে জ্বলছে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট, যেন রাতের আকাশ থেকে একঝাঁক জোনাকি নেমে এসেছে কনসার্ট হলে। মাঝখানে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কোকড়ানো চুল, সাধারণ একটা জ্যাকেট, আর গলায় সেই মায়াবী সুর যা গত এক দশক ধরে ভারতের প্রতিটি প্রেমিকের হৃদস্পন্দন হয়ে আছে। গান গাইতে গাইতে হঠাৎ তিনি থামলেন। মাইকটা মুখের কাছে এনে এমন একটা কথা বললেন, যাতে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা স্টেডিয়াম। হাততালি আর চিৎকারের শব্দ ডুবে গেল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়।
তিনি বললেন, “আর হয়তো খুব বেশি দিন নয়। প্লেব্যাক আর ভালো লাগছে না।”
কথাটা ছোট। কিন্তু এর অভিঘাত পারমাণবিক বোমার চেয়ে কম নয়। যে মানুষটার গান ছাড়া বলিউডের কোনো সিনেমা মুক্তি পায় না, যাঁর গান শুনে মানুষ প্রেমে পড়ে, আবার যাঁর গানেই বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় উপশম খোঁজে—তিনিই কি না বলছেন, “আর নয়”?
গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া, চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে অফিস ক্যান্টিন—সব জায়গায় একটাই আলোচনা। অরিজিৎ সিং কি সত্যিই অবসর নিচ্ছেন? নাকি এটা নিছকই এক শিল্পীর সাময়িক ক্লান্তি? জিয়াগঞ্জের যে ছেলেটা একদিন রিয়েলিটি শো-এর মঞ্চ থেকে ছিটকে গিয়েও নিজের জেদ আর সাধনায় বিশ্বজয় করেছিল, সে আজ কেন বলছে—”আমি ক্লান্ত”?
অনেকে বলছেন, এটা অভিমান। অনেকে বলছেন, এটা কৌশল। কিন্তু নিউজ অফবিটের বিশ্লেষণে উঠে আসছে এক অন্য সত্য। এটা শুধু গান ছাড়া বা না ছাড়ার গল্প নয়। এটা হলো যান্ত্রিকতার যুগে একজন রক্ত-মাংসের শিল্পীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সুর যেখানে পণ্য, আর গায়ক যেখানে মেশিন—সেখানে দাঁড়িয়ে অরিজিৎ সিং হয়তো এক নতুন বিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন না, তিনি আসলে নিজেকে খুঁজে পেতে চাইছেন।
আসুন, খবরের গভীরে গিয়ে মিলিয়ে দেখি অরিজিৎ সিং-এর এই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ এবং আগামীর সম্ভাবনা।
১. জল্পনার ধোঁয়াশা বনাম বাস্তবের মাটি: ঠিক কী ঘটেছে?
ঘটনার সূত্রপাত খুব সাধারণ একটি মন্তব্য থেকে। একটি লাইভ কনসার্টে অরিজিৎ সিং নিজের ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যে, তিনি আর প্লেব্যাক গাইতে চান না বা হয়তো খুব শীঘ্রই এই জগত থেকে বিদায় নেবেন। কথাটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তবে কি ‘তুম হি হো’ বা ‘কেশরিয়া’র মতো ম্যাজিক আর শোনা যাবে না?
এই জল্পনার আগুনের মধ্যে জল ঢেলেছেন অরিজিতের বোন অমৃতা সিং। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর দাদা গান গাওয়া ছাড়ছেন না। অরিজিৎ গানের সঙ্গেই আছেন, স্টেজের সঙ্গেই আছেন। তিনি শুধু সরে আসতে চাইছেন গৎবাঁধা প্লেব্যাক গাওয়ার ইঁদুর দৌড় থেকে। অমৃতা জানিয়েছেন, অরিজিৎ এখন দিনে একটা-দুটো গান গেয়ে খুশি থাকতে চান। তিনি চান না প্রতিদিন মেশিনের মতো গান রেকর্ড করতে। তিনি চান নিজের মতো করে গান তৈরি করতে, স্বাধীন মিউজিক বা ‘Indie Music’-এর ওপর জোর দিতে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বোনের এই আশ্বাসের পরেও কি সব ধোঁয়াশা কাটল? একদমই নয়। কারণ, অরিজিৎ সিং এমন একজন মানুষ, যিনি খুব ভেবেচিন্তে কথা বলেন। আজ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “বলিউডে গায়কদের আয়ু বড়জোর ৫-৭ বছর। তারপর নতুন কেউ আসবে, পুরনোরা হারিয়ে যাবে। আমি চাই সেই সময় আসার আগেই আমি নিজের শর্তে সরে যাই।”
আজকের এই পরিস্থিতি কি তবে সেই পুরনো ভবিষ্যৎবাণীরই প্রতিফলন? অরিজিৎ সিং হয়তো বুঝতে পারছেন, বলিউডের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন গায়ক আসছেন। ইউটিউব আর ইনস্টাগ্রামের দৌলতে ‘ভাইরাল’ হওয়া এখন জলভাত। এই ভিড়ের মধ্যে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখার লড়াইটা বড্ড ক্লান্তিকর।
অমৃতা সিংয়ের কথায় একটা বিষয় পরিষ্কার—অরিজিৎ গান ছাড়ছেন না, তিনি আসলে ‘চাকরি’ ছাড়ছেন। প্লেব্যাক গায়ক হওয়াটা বলিউডে অনেকটা চাকরির মতো। মিউজিক ডিরেক্টর যা বলবেন, প্রডিউসার যা চাইবেন, হুবহু তাই গাইতে হবে। সেখানে নিজস্বতার জায়গা খুব কম। অরিজিৎ সেই শেকলটাই ভাঙতে চাইছেন। তিনি চাইছেন, গানটা তাঁর পেশা না হয়ে নেশা হয়েই থাকুক। তিনি চাইছেন, শ্রোতারা অরিজিৎকে শুনুক তাঁর নিজের সৃষ্টির জন্য, কোনো সিনেমার হিরোর লিপ-সিঙ্ক বা ভয়েস হিসেবে নয়।

২. বলিউডের ‘মিউজিক মাফিয়া’ ও প্রযুক্তির দাপট: নেপথ্যের অভিমান
অরিজিৎ সিংয়ের এই বৈরাগ্যের পেছনে কি শুধুই ব্যক্তিগত ইচ্ছা, নাকি আছে বলিউডের কুখ্যাত ‘মিউজিক পলিটিক্স’?
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বলিউডের অনেক কালো সত্য সামনে এসেছিল। সেই সময় অরিজিৎ সিং এবং সলমন খানের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও শিরোনামে আসে। শোনা গিয়েছিল, অরিজিতের রেকর্ড করা গান অন্য গায়ককে দিয়ে গাওয়ানো হয়েছে বা সিনেমা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইগোর কারণে। যদিও সেই বরফ এখন গলেছে, কিন্তু ক্ষতটা কি শুকিয়েছে?
বলিউডে এখন একটা নতুন ট্রেন্ড চলছে—’মাল্টিপল রেকর্ডিং’। অর্থাৎ, একটি গান ৫-৬ জন গায়ককে দিয়ে গাওয়ানো হয়। তারপর মিউজিক লেবেল বা প্রযোজক ঠিক করেন কার গলা রাখা হবে। অনেক সময় গায়ক জানতেই পারেন না যে তাঁর গাওয়া গানটা শেষমেশ সিনেমায় রাখা হলো কি না। একজন প্রথম সারির শিল্পীর জন্য এটা চরম অসম্মানের। অরিজিৎ সিং বারবার এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তিনি মনে করেন, গান কোনো পণ্য নয় যে ১০টা স্যাম্পল দেখে একটা বেছে নেওয়া হবে। গান হলো আত্মা থেকে আসা এক অনুভূতি।
তার ওপর যোগ হয়েছে প্রযুক্তির অত্যাচার। ‘অটো-টিউন’ (Auto-tune) বা পিচ কারেকশনের বাড়াবাড়ি। অরিজিৎ সিং ছোটবেলা থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেওয়া একজন বিশুদ্ধ শিল্পী। তিনি বিশ্বাস করেন গলার ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা শ্বাস ফেলার শব্দও গানেরই একটা অংশ। কিন্তু আধুনিক মিক্সিং ইঞ্জিনিয়াররা গানকে এতটাই পালিশ করেন যে, মানুষের গলা আর রোবটের গলার মধ্যে তফাত করা মুশকিল হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি এআই (AI) বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দাপট নিয়েও অরিজিৎ চিন্তিত। এআই ব্যবহার করে মৃত শিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানো হচ্ছে বা একজন গায়কের গলা নকল করে গান তৈরি হচ্ছে। এই যান্ত্রিকতার ভিড়ে অরিজিৎ হয়তো নিজেকে বড্ড বেমানান মনে করছেন। তিনি জিয়াগঞ্জের মাটির মানুষ। তিনি স্কুটারে বাজার করতে যান, চায়ের দোকানে আড্ডা দেন। মুম্বাইয়ের গ্ল্যামার আর কৃত্রিমতা তাঁকে কখনোই টানেনি।
তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে খবর, অরিজিৎ প্রায়ই বলেন, “আমি গান গাইতে এসেছি, রেস লড়তে আসিনি।” যখন দেখেন গানের গুণমানের চেয়ে গানের ‘ভিউ’ বা ‘লাইক’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাঁর শিল্পীসত্তা আহত হয়। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তাঁকে এমন অনেক গান গাইতে হয়, যা হয়তো তাঁর নিজেরই পছন্দ নয়, বা যে লিরিক্সের সঙ্গে তিনি একমত নন। কিন্তু পেশাদারিত্বের খাতিরে তাঁকে তা গাইতে হয়। এই ‘কম্প্রোমাইজ’ বা আপস করার ক্লান্তিই হয়তো তাঁকে আজ এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি মুক্তি চাইছেন এই বাণিজ্যিক সমীকরণ থেকে।
আরও পড়ুনঃ মফস্বলের নাট্যশিল্পীদের জন্য অনীকের বড় উদ্যোগ │ Free Stage in Kolkata
৩. ফরমায়েশি সুর বনাম স্বাধীন গান: অরিজিতের ‘ওরিয়ন’ যাত্রা
“প্লেব্যাক গাইব না”—এই কথার মানে কিন্তু “গান গাইব না” নয়। এখানেই অরিজিৎ সিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। তিনি আসলে হাঁটতে চাইছেন স্বাধীন সঙ্গীতের পথে, যাকে আমরা ‘Indie Pop’ বা ‘Independent Music’ বলি।
পশ্চিমা বিশ্বে শিল্পীরা অ্যালবাম রিলিজ করেন। তাঁদের পরিচয় কোনো সিনেমার মাধ্যমে হয় না। টেলর সুইফট বা এড শিরান প্লেব্যাক গায়ক নন, তাঁরা স্বতন্ত্র শিল্পী। ভারতেও একসময় এই চল ছিল—লাকি আলি, কেকে, শান বা সিল্ক রুটের অ্যালবামের যুগ ছিল। কিন্তু মাঝখানে বলিউড মিউজিক সেই স্বাধীন গানের গলা টিপে ধরেছিল। অরিজিৎ সিং আবার সেই যুগটাকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।
তিনি ইতিমধ্যেই তাঁর নিজস্ব মিউজিক লেবেল ‘ওরিয়ন মিউজিক’ (Oriyon Music) শুরু করেছেন। লক্ষ্য করলে দেখবেন, গত এক-দেড় বছরে অরিজিৎ এমন অনেক গান রিলিজ করেছেন যা কোনো সিনেমার অংশ নয়। সেই গানগুলোতে অরিজিৎ অনেক বেশি সাবলীল, অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্টাল। সেখানে তাঁকে কোনো হিরোর গলার সঙ্গে মানানসই করে গাইতে হয় না, সেখানে তিনি নিজের মনের মতো সুর লাগাতে পারেন।
এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে অরিজিৎ সিং কতটা দূরদর্শী। তিনি জানেন, সিনেমার গান হিট হয় সিনেমার সাফল্যের ওপর নির্ভর করে। সিনেমা ফ্লপ হলে, গানও হারিয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীন গান যদি মানুষের মনে ধরে, তবে তা চিরকাল থেকে যায়। প্রতীক কুহাদ বা অনুব জৈনের মতো তরুণ শিল্পীরা যদি স্বাধীন গান গেয়ে স্টেডিয়াম ভরাতে পারেন, তবে অরিজিৎ সিং তো একাই একশ।
তাছাড়া, স্বাধীন মিউজিক তাঁকে সেই স্বাধীনতা দেয় যা তিনি মুম্বাইয়ের স্টুডিওতে পান না। তিনি ফোক মিউজিক, ক্লাসিক্যাল ফিউশন বা বাংলার মাটির গান নিয়ে কাজ করতে চান। প্লেব্যাকের ধরাবাঁধা ছকে সেটা সম্ভব নয়। সেখানে তাঁকে সারাক্ষণ ‘স্যাড সং’ বা ‘রোমান্টিক ব্যালাড’ গাইতে বলা হয়। অরিজিৎ এখন নিজেকে ভাঙতে চাইছেন। তিনি চাইছেন শ্রোতারা জানুক, অরিজিৎ মানেই শুধু কান্নার গান নয়, অরিজিৎ মানে সঙ্গীতের এক বিশাল মহাসমুদ্র।
তাঁর বোন অমৃতার কথায়ও সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, “দাদা এখন সিলেক্টিভ হতে চায়।” এর মানে, অরিজিৎ এখন থেকে বেছে বেছে কাজ করবেন। যে গানে তাঁর আত্মা তৃপ্ত হবে, শুধু সেটাই গাইবেন। টাকার জন্য বা টি-সিরিজের চুক্তির জন্য তিনি আর গাইতে রাজি নন। এই সাহসটা দেখানোর জন্য যে শিরদাঁড়া দরকার, তা অরিজিতের আছে। কারণ তিনি জানেন, তাঁর শ্রোতারা তাঁর সিনেমার জন্য নয়, তাঁর গলার জন্য তাঁকে ভালোবাসেন।
৪. ক্লান্তি নাকি আগামীর প্রস্তুতি? একজন ‘ফকির’ মানুষের দর্শন
অরিজিৎ সিংকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন বা চেনেন, তাঁরা জানেন মানুষটা আসলে একজন ‘ফকির’। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েও তিনি জিয়াগঞ্জের সাধারণ সরকারি স্কুলে ছেলেকে পড়ান, সাধারণ জামাকাপড় পরেন, ট্রেনের স্লিপার ক্লাসে যাতায়াত করেন। এই জীবনদর্শনটাই তাঁর সঙ্গীতের মূল শক্তি।
যিনি জীবনে এত সাধারণ, তিনি খ্যাতির মোহে আটকে থাকবেন—এটা ভাবাই ভুল। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তিনি খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখর ছুঁয়েছেন। আর পাওয়ার কিছু নেই। মানুষের ধর্মই হলো, যখন সে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে, তখন সে বুঝতে পারে যে ওই উচ্চতায় অক্সিজেন কম, নিঃশ্বাস নেওয়া কষ্টকর। অরিজিৎ এখন সেই উচ্চতা থেকে নেমে আবার সমতলে, মাটির কাছাকাছি আসতে চাইছেন।
অনেকে বলছেন তিনি ক্লান্ত। হ্যাঁ, শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। গত ১০ বছর ধরে তিনি বিরতিহীনভাবে কাজ করেছেন। এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন ভারতের কোথাও না কোথাও তাঁর গান বাজেনি। এই অতিরিক্ত এক্সপোজার (Overexposure) একজন শিল্পীর জন্য ভয়ের কারণ হতে পারে। মানুষ একঘেয়েমিতে ভুগতে পারে। অরিজিৎ হয়তো চাইছেন মানুষ তাঁকে একটু মিস করুক। সব সময় সহজলভ্য হলে জিনিসের কদর কমে যায়। তাই নিজেকে একটু গুটিয়ে নেওয়াটা তাঁর স্ট্র্যাটেজির অংশ হতে পারে।
তাছাড়া, তিনি এখন নিজের সময়ের একটা বড় অংশ ব্যয় করছেন সমাজসেবায়। জিয়াগঞ্জে হাসপাতাল তৈরি করা, দুস্থ শিশুদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া—এগুলো এখন তাঁর প্রায়োরিটি। প্লেব্যাকের ব্যস্ত শিডিউলে তিনি এই কাজগুলোর জন্য সময় পাচ্ছিলেন না। গান গাওয়ার মেশিনে পরিণত হয়ে তিনি হয়তো নিজের ভেতরের ‘মানুষ’টাকে হারিয়ে ফেলছিলেন। এখন তিনি সেই মানুষটাকে আবার সময় দিতে চান।
তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, অরিজিৎ এখন গান শেখানোয় মন দিতে চান। তিনি চান তাঁর মতো আরও অনেক প্রতিভার জন্ম হোক। তিনি চান না কোনো প্রতিভাবান গায়ক রিয়েলিটি শো-এর টিআরপির যুপকাষ্ঠে বলি হোক। তাই তিনি নিজের একটা মিউজিক স্কুল এবং ইকো-সিস্টেম তৈরি করতে চাইছেন। প্লেব্যাক থেকে সরে আসা মানে অবসর নয়, বরং নিজের দায়িত্বগুলো বদলে ফেলা।
৫. বদলই ধ্রুব সত্য, অরিজিৎ তো পথপ্রদর্শক মাত্র
শেষমেশ একটা কথা বলতেই হয়—অরিজিৎ সিং প্লেব্যাক ছাড়ুন বা না ছাড়ুন, তিনি যা করছেন তা ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করছে। তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, একজন শিল্পী যদি নিজের প্রতি সৎ থাকেন, তবে তাঁকে বলিউডের দাদাগিরির কাছে মাথা নত করতে হয় না।
প্লেব্যাক না গাইলেও অরিজিতের কনসার্টে ভিড় কমবে না। বরং বাড়বে। কারণ মানুষ এখন আর সিনেমা দেখতে যায় না গান শুনতে, বরং গান শুনে সিনেমা দেখতে যায়। অরিজিৎ সিং নিজেই এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি।
হয়তো আগামী দিনে আমরা দেখব, অরিজিৎ সিং মাসে একটা গান গাইছেন, কিন্তু সেই গানটা শোনার জন্য মানুষ চাতক পাখির মতো বসে আছে। হয়তো দেখব, তিনি বছরে মাত্র কয়েকটা লাইভ শো করছেন, কিন্তু সেগুলোর টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে লক্ষ টাকায়।
এই যে “আমি আর প্লেব্যাক গাইব না” বা “কম গাইব”—এটা আসলে অরিজিতের ক্লান্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, এটা তাঁর উত্তরণের সংকেত। তিনি ক্যাটারপিলার বা শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। শুয়োপোকা যখন গুটিপোকার মধ্যে ঢোকে, তখন মনে হয় সে মরে গেছে বা হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছুদিন পর সে যখন রঙবেরঙের ডানা মেলে ওড়ে, তখন পৃথিবী মুগ্ধ হয়ে দেখে।
অরিজিৎ সিং-ও এখন সেই গুটিপোকার স্তরে বা ‘ককুন ফেজ’-এ যেতে চাইছেন। প্লেব্যাকের খোলস ছেড়ে তিনি এক স্বাধীন, মুক্ত এবং বিশুদ্ধ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পুনর্জন্ম নিতে চাইছেন।
তাই ভক্তদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অরিজিতের গানে বিরতি পড়েনি, শুধু স্কেলটা বদলেছে। আর এই বদলটা খুব জরুরি ছিল। কারণ, স্টেজ আছে, শ্রোতা আছে, আর আছে অরিজিতের সেই জাদুকরী গলা। মাধ্যমটা প্লেব্যাক হোক বা ইউটিউব—কিচ্ছু যায় আসে না। সোনা যেখানেই রাখা হোক, তার দ্যুতি কি কমে?
অরিজিৎ সিং প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু গাইতে জানেন না, তিনি থামতেও জানেন। আর ঠিক সময়ে থামতে পারাটাই একজন মহৎ শিল্পীর সবচেয়ে বড় গুণ।
১. অরিজিৎ সিং কি সত্যিই প্লেব্যাক গাওয়া ছেড়ে দিচ্ছেন?
না, পুরোপুরি ছাড়ছেন না। তাঁর বোন অমৃতা সিং স্পষ্ট করেছেন যে অরিজিৎ গান গাওয়া বা স্টেজ পারফরম্যান্স বন্ধ করছেন না। তবে তিনি গৎবাঁধা প্লেব্যাক গাওয়ার ইঁদুর দৌড় থেকে সরে এসে বেছে বেছে কাজ করতে চাইছেন এবং স্বাধীন সঙ্গীতে (Independent Music) বেশি মনোযোগ দিতে চাইছেন।
২. অরিজিৎ সিং কেন প্লেব্যাক থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিলেন?
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, গত এক দশকের অবিরাম কাজের ক্লান্তি। দ্বিতীয়ত, বলিউডের মিউজিক পলিটিক্স, অতিরিক্ত অটো-டியুনের ব্যবহার এবং যান্ত্রিকতার প্রতি তাঁর অনীহা। তিনি এখন বাণিজ্যিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে নিজের শর্তে ও স্বাধীনভাবে গান তৈরি করতে চাইছেন।
৩. অরিজিৎ সিং-এর ‘ওরিয়ন মিউজিক’ (Oriyon Music) কী?
‘ওরিয়ন মিউজিক’ হলো অরিজিৎ সিং-এর নিজস্ব স্বাধীন মিউজিক লেবেল। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি সিনেমার বাইরে তাঁর নিজের তৈরি মৌলিক গানগুলো রিলিজ করেন। এর উদ্দেশ্য হলো স্বাধীন সঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নতুন প্রতিভাদের সুযোগ করে দেওয়া।
৪. প্লেব্যাক না গাইলে অরিজিৎ সিং-এর ক্যারিয়ারের কী হবে?
অরিজিৎ সিং এখন নিজেই একটি ব্র্যান্ড। তাঁর কনসার্ট এবং স্বাধীন গানের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। তাই প্লেব্যাক কমিয়ে দিলেও তাঁর ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। বরং স্বাধীন শিল্পী হিসেবে তিনি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন এবং তাঁর সঙ্গীত আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
৫. অরিজিৎ সিং-এর পরবর্তী বড় প্রোজেক্ট কী?
প্লেব্যাকের বাইরে অরিজিৎ এখন তাঁর জিয়াগঞ্জের হাসপাতাল এবং স্কুলের প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত। পাশাপাশি, তিনি নিয়মিত তাঁর লেবেল থেকে স্বাধীন গান রিলিজ করার পরিকল্পনা করছেন এবং বিশ্বজুড়ে লাইভ কনসার্ট চালিয়ে যাবেন।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটে বিশ্বকাপ জয়, তাকিয়ে ক্রিকেট বিশ্ব │ জানুন, তার ক্রিকেটে উত্থানের কাহিনী
- রেলে মিলবে এমার্জেন্সি কোটায় সিট | জানুন, কারা পাবেন এই বিশেষ সুবিধা, কীভাবে হয় অনুমোদন
- টাইম স্ট্রেটে প্রেমের পরীক্ষা │ জেনে নিন, ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে এই ৫টি কাজ করলেই জমে উঠবে রোমান্স
- জানেন কি, হাঁচি থেকে হতে পারে মৃত্যু? | নীরবে বাড়ছে অ্যালার্জির অজানা বিপদ | কী সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
- আলপনা শিল্প: লক্ষ্মীপুজোর উঠোনে আঁকা বাংলার নীরব ইতিহাস

