Ashis Banerjee Death: প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। মৃত্যুর আগে লেখা চিঠিতে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং জানিয়েছেন, জীবনের কোনও পর্যায়েই কোনও দুর্নীতির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রামপুরহাটে প্রাক্তন বিধায়ক ও রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে রবিবার সকালে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রামপুরহাট থানার পুলিশ। দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিঠিও উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিঠিটির প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করেছে উদ্ধার হওয়া সেই হাতে লেখা নোট। সেখানে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক জীবন, দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ওঠা প্রশ্ন, দলীয় দায়িত্ব এবং তাঁর বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনও অভিযোগ ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে নিজের বক্তব্য লিখে গিয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নোটে তিনি নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি বলেও প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ রয়েছে।
বাড়ির পাশের দলীয় কার্যালয় থেকেই উদ্ধার দেহ, ছড়াল শোক ও চাঞ্চল্য
রামপুরহাটের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলা পাড়ায় আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। বাড়ির লাগোয়া ছিল একটি দলীয় কার্যালয়। রবিবার সকালে সেখান থেকেই তাঁর দেহ উদ্ধার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় মানুষের ভিড় জমে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচিতি এবং রামপুরহাটের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের কারণে খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়। মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না প্রশাসন।
ঘটনাস্থল থেকে হাতে লেখা একটি চিঠি পাওয়ার বিষয়টি এই মৃত্যুকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। চিঠিটি সত্যিই তাঁর লেখা কি না, কখন লেখা হয়েছে এবং এর সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনার কী সম্পর্ক—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠিতে তিনি দুর্নীতির সঙ্গে নিজের কোনও যোগ থাকার কথা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি।
পঁচিশ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়ে ইতি, পাঁচবারের বিধায়ক ছিলেন আশিস
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় রামপুরহাটের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মুখ। ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন এবং মোট পাঁচবার নির্বাচিত হন। ২০২১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট কেন্দ্রে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী, তিনি ৮৭,৬৮৭ ভোট পেলেও বিজেপির ধ্রুব সাহা ১,১১,৯২০ ভোট পেয়ে জয়ী হন। অর্থাৎ ২৪,২৩৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভাতেও বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কৃষি দফতরের মন্ত্রী ছাড়াও একাধিক দফতরের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষিমন্ত্রী ছিলেন।
তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনী পরাজয়ের পর তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতে আগের মতো দেখা যাচ্ছিল না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্বে দলীয় দায়িত্ব, নির্বাচনী পরাজয় এবং সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল।
হাতে লেখা নোটে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার, কী লিখে গেলেন আশিস?
উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা চিঠিটিই এখন এই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। আপনার দেওয়া নোটের অনুলিপি অনুযায়ী, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে স্পষ্ট করে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে দুর্নীতির কোনও সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন যে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনীতিতে যোগ দেননি এবং কোনও দুর্নীতির সঙ্গে নিজেকে জড়াননি। ছাত্রজীবনে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে উল্লেখ করেছেন। ছাত্রজীবনে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করলেও সেখানেও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না থাকার দাবি করেছেন তিনি।
চিঠির একটি বড় অংশে প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজের ভূমিকার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বিশেষ করে টেন্ডার কমিটির সিদ্ধান্ত, চেক ব্যবহারের ক্ষমতা, পরিকল্পনা অনুমোদন কিংবা কোনও আপত্তিহীনতার শংসাপত্র দেওয়ার মতো বিষয়গুলিতে তাঁর গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না—এমন বক্তব্য নোটে রয়েছে বলে আপনার দেওয়া অনুলিপিতে দেখা যাচ্ছে।
সুইসাইড নোটে তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি জীবনে কারও কাছ থেকে এক পয়সাও নেননি এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেননি। পাশাপাশি রাজনীতিতে আসাকে জীবনের বড় ভুল হিসেবেও দেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—হাতে লেখা নোটের কয়েকটি অংশের পাঠোদ্ধার সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। ফলে অস্পষ্ট বাক্যকে নিশ্চিত বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না। তদন্তকারী সংস্থার যাচাই এবং নোটটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই এর প্রতিটি বক্তব্যকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা যাবে।
সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও নোটে, রাজনৈতিক বিরোধকে শত্রুতা বলেননি
চিঠিতে নিজের একটি সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গও রয়েছে। সেখানে তিনি কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে পদে থাকার চেষ্টা করেননি বলে দাবি করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এবং শিক্ষক হিসেবে তাঁদের প্রতি ভালোবাসার কথাও উঠে এসেছে।
আপনার দেওয়া অনুলিপি অনুযায়ী, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন যে রাজনৈতিক জীবনে মতবিরোধ বা বাকবিতণ্ডা থাকলেও তা শত্রুতার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার কথা তিনি বলেননি। বরং তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা শিক্ষক, ছাত্র এবং পরিচিত মানুষের ভালোবাসার কথাই নোটে স্মরণ করেছেন।
চিঠির শেষদিকে তাঁর বক্তব্য আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে। নিজের রাজনৈতিক পথচলা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজের অবস্থান নিয়ে তিনি যেন একটি আত্মপক্ষসমর্থনের ভাষায় নিজের কথা রেখে যেতে চেয়েছেন। সবশেষে লেখা একটি বাক্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—“আর সত্যের সঙ্গে কেউ পারল না।”
এই বাক্যটি এখন স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে। তবে এর নির্দিষ্ট তাৎপর্য কী ছিল, তিনি কোন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এই কথা লিখেছিলেন, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
“কাউকে দায়ী করছি না”—নোট ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
উদ্ধার হওয়া চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলির মধ্যে একটি হল, নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার বক্তব্য। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
একই সঙ্গে চিঠিতে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখার প্রবল চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কোনও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকার দাবি করেছেন তিনি। এমনকি দলীয় ও প্রশাসনিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে কোন কোন সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে ছিল না, সেই বিষয়টিও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন বলে নোটের অনুলিপিতে দেখা যাচ্ছে।
এ কারণেই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া চিঠিটি নিছক একটি ব্যক্তিগত লেখা হিসেবে না দেখে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চিঠিতে যা লেখা রয়েছে, তা তাঁর নিজের বক্তব্য—সেগুলি কোনও অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
দীর্ঘদিনের সহকর্মীর মৃত্যুতে স্তম্ভিত রাজনৈতিক মহল
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমেছে। বীরভূমের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে কাজ করা অনুব্রত মণ্ডলও সংবাদমাধ্যমের কাছে বিস্ময় ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল বলে তিনি মনে করেন না। দুর্নীতির সঙ্গে আশিসের যোগ ছিল বলেও তিনি মনে করেন না বলে মন্তব্য করেছেন অনুব্রত।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনী ফলাফলে রামপুরহাটে তাঁর পরাজয় ছিল উল্লেখযোগ্য। নির্বাচন কমিশনের সরকারি ফল অনুযায়ী, বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে তিনি ২৪ হাজারের বেশি ভোটে হেরে যান।
তবে নির্বাচনী পরাজয়, সাংগঠনিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানো বা অন্য কোনও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। এসব বিষয় নিয়ে অনুমান না করে পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের ফলাফলের দিকে তাকানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু তাই একদিকে যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আকস্মিক পরিসমাপ্তি, অন্যদিকে তাঁর রেখে যাওয়া হাতে লেখা চিঠি একাধিক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন, দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন এবং নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার কথা লিখেছেন—এমনটাই প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, নোটের সম্পূর্ণ সত্যতা এবং নোটে উল্লিখিত বিষয়গুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্তই।
#AshisBanerjeeDeath #AshisBanerjee #DeputySpeaker #AshisBanerjeeSuicideNote #WestBengalPolitics #Rampurhat #DeathMystery
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?

