শাড়ী শুধুমাত্র ফ্যাশানের অঙ্গ নয়, ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক (Baluchari Saree History)। সেই শাড়ি যদি ঐতিহ্যের আর পৌরাণিকতার মেলবন্ধনে বোনা হয় তাহলে তো কথাই নেই। বালুচরীর গল্প তেমনি। জানুন ৫০০ বছরের পুরানো ইতিহাসের সাক্ষী, আজ ও আপনি কীভাবে বহন করছেন?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার তাঁতের শিল্প মানেই শুধু পোশাক নয়, একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে সুতোয় বোনা হয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, আর পৌরাণিক কাহিনীর গাথা। শাড়ি অলংকারের মতোই মহিলাদের খুবই পছন্দের পোশাক। যেকোনো ঐতিহ্যবাহী শাড়ি আপনারা আপনাদের ওয়ারড্রোবে অবশ্যই রাখতে চাইবেন। তেমনি একটি শাড়ি হল বালুচরী। যার ইতিহাস ৫০০ বছরের পুরানো। এই শাড়ির বুননে ইতিহাসের সাথে পুরাণের মেলবন্ধন ঘটেছে। কি আপনিও জানতে চাইছেন সেই ইতিহাসের গল্প? এই প্রতিবেদনে আপনি পাবেন বালুচরীর ইতিহাস, কীভাবে সাত খন্ড রামায়ণ স্থান পেয়েছে বারো হাত শাড়িতে?
আরও পড়ুন : একশো বছরের ঐতিহ্য থেকে GI Tag│ জানুন জয়নগরের মোয়ার আসল ইতিহাস │Joynagarer Moa History
বালুচরী শাড়ির উৎপত্তি (Baluchari Saree History)
১৭ শতকের মুর্শিদাবাদের বালুচর গ্রামে এই শিল্পের সূচনা। মুর্শিদকুলি খাঁ তখন বাংলার স্বাধীন নবাব। বালুচরী শাড়ি তখন তৈরি হচ্ছে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের কাছে বালুচর গ্রামে। আচমকা বালুচরি শিল্পীদের জীবনে নেমে আসে দুর্দিন। বন্যা হয়। তাদের তৈরি শাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বালুচরী শিল্পীদের আশ্রয় ছিল না। সেই সময় বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে রাজত্ব করছেন মল্ল রাজারা। পোড়ামাটির তৈরী মন্দিরের শহরে স্থান হলো বালুচরী শিল্পীদের। এই ভাবেই জন্মস্থান থেকে বিষ্ণুপুরের বুকে বালুচরীর প্রসার বৃদ্ধি পেল। এখানেই পুনর্জন্ম ঘটে বালুচরীর, নতুন রঙে, নতুন ছন্দে।
নকশায় পৌরাণিক কাহিনী (Baluchari Saree History)
একটি বালুচরী শাড়ির আঁচল-এ আপনি খুঁজে পাবেন রাম ও সীতার বনবাস, হনুমানের লঙ্কাদহন, কৃষ্ণের বংশীবাজনা বা রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা—সব কিছুই সূক্ষ্ম সুতোয় বোনা। নকশাগুলি একদিকে যেমন শিল্পীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বোধকে প্রকাশ করে, অন্যদিকে ইতিহাসের দলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৮০৪ সালে ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ মেরি জ্যাকোয়ার্ড এই তাঁত এবং যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন, যা পাঞ্চ কার্ড ব্যবহার করে জটিল প্যাটার্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বোনার প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। এই কাজের জন্য ব্যবহৃত হয় “জাকার্ড কার্ড” (Jacquard Card), ছোট ছিদ্রযুক্ত কার্ড, যেখানে প্রতিটি গর্ত নির্ধারণ করে এক একটি নকশার লাইন। একেকটি শাড়িতে এমন ২০০০-২৫০০ কার্ড ব্যবহৃত হয়।
বিষ্ণুপুরের বালুচরী শাড়িতে রামায়ণের গল্প বোনা হয় তাঁতের মাকুতে জটিল নকশার সুতো দিয়ে, যেখানে জ্যাকোয়ার্ড তাঁত কৌশল ও জালা বুনন পদ্ধতি ব্যবহার করে আঁচল ও শাড়ীর ভিতরে পৌরাণিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়, যা মূলত সিল্কের সুতোয় তৈরি হয়, একজন শিল্পীর নিখুঁত ডিজাইন করতে ২৫ দিন সময় লাগে। যা শিল্পীর ধৈর্য ও নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে। বর্তমানে এই শিল্প টিকে আছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং শিল্পীদের ঐকান্তিক নিরলস প্রচেষ্টায়, যা এর ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে বজায় রেখেছে।

ছবি সৌজন্যে: কনিষ্কের বালুচরী শাড়ি
আধুনিক ফ্যাশনে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
স্থানীয় রেশমকীট থেকে সংগৃহীত সুতো প্রথমে ধোয়া, রঙ করা এবং শুকনো করা হয়। শিল্পী ধীরে ধীরে মাকু চালিয়ে নকশা ফুটিয়ে তোলেন, যেন সুতো নয়, গল্পের রেশ। শেষে রেশমের জৌলুস বাড়াতে পালিশ ও ধোয়ার প্রক্রিয়া হয়।আজকের বালুচরী শুধু শাড়ি নয়। বালুচরী শাড়িতে আগে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হলেও এখন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। তবে সে ক্ষেত্রে শাড়ির গুণমানের সাথে কখনোই আপস করা হয় না। কলকাতায় বাঁকুড়ার শাড়ির অন্যতম বিপণী কনিষ্কতে আপনারা বালুচরী পাবেন। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের শাড়ি বিপনী সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত তন্তুজ থেকেও নিতে পারবেন মহাকাব্যের স্পর্শে সিক্ত বালুচরীকে।
এর নকশা ব্যবহার করা হচ্ছে জ্যাকেট, ব্যাগ, হোম ডেকোরেশনে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে তৈরি করছেন নতুন কালেকশন যেখানে ঐতিহ্যের পাশাপাশি স্থায়িত্বের কথাও ভাবা হচ্ছে। এটি একটি জীবন্ত শিল্প, কিছু মানুষের নিঃশব্দ কান্নার বিনিময়ে এক টুকরো গল্প ফুটে উঠেছে। একটা সময় বালুচরী শাড়ি মূলত জমিদার এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলারা উৎসব এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে পরতেন। এই শাড়ির সাথে বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতি জড়িত।
২০০৯ এবং ২০১০ সালে ভারতের তৎকালীন মাননীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি প্রধান বয়ন শিল্প হিসাবে বালুচরী শাড়িকে পুরস্কৃত করেছিলেন। ২০১১ সালে বালুচরী শাড়ি জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন পায় (Baluchari Saree History)। বিষ্ণুপুরের বালুচরী শাড়ি তৈরির শিল্প আমাদের শেখায়, সময় বদলায়, কিন্তু শিল্পের আত্মা চিরকাল অমর থাকে। যখন মাকুতে বাজে একসুরে তাঁতের আওয়াজ, তখন সেখানে শুধু সুতো বোনা হয় না, বোনা হয় বাংলার প্রাণ।
#BaluchariSareeHistory, #BishnupurSilk, #BengalHandloom, #BaluchariWeaving, #TraditionalSaree, #SilkWeavingBengal
Most Viewed Posts
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra
- জানেন কি নবরাত্রির চতুর্থ দিনে মা কুষ্মাণ্ডা পূজা কেন বিশেষ? ︱Why Ma Kushmanda Puja on Navratri Day 4 is Special?
- Digha Jagannath Temple Facts ︱দীঘা জগন্নাথ মন্দির সম্পর্কে জানুন এই দশটি অজানা তথ্য

