Bhowanipore Election Battle: ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর হাই ভোল্টেজ লড়াইয়ে বদলে যাচ্ছে ভোটের সমীকরণ, ওয়ার্ডভিত্তিক শক্তির লড়াইয়ে কে এগিয়ে—সমীক্ষায় উঠে আসছে চমকপ্রদ তথ্য
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দক্ষিণ কলকাতার রাজনৈতিক মানচিত্রে আবারও কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভবানীপুর—একটি বিধানসভা কেন্দ্র, যা শুধু একটি আসন নয়, বরং ক্ষমতার প্রতীক, আবেগের লড়াই এবং রাজনৈতিক সম্মানের প্রশ্ন। একদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক গড় এই অঞ্চল; অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, যিনি ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে চমকপ্রদ জয় ছিনিয়ে এনে রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছিলেন। এই সরাসরি মুখোমুখি লড়াই ভবানীপুরকে করে তুলেছে এবারের সবচেয়ে হাই ভোল্টেজ কেন্দ্র।
এই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে—আগে যেখানে মোট ভোটার ছিল দুই লক্ষ বাষট্টি হাজার বাহাত্তর, সেখানে বর্তমানে তা নেমে এসেছে দুই লক্ষ পনেরো হাজারে; এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাতিল হয়েছেন সাতচল্লিশ হাজার চুরানব্বই জন ভোটার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই পরিবর্তিত সমীকরণে কার লাভ, কার ক্ষতি? বামফ্রন্টের সৃজীব বিশ্বাস এবং কংগ্রেসের প্রদীপ প্রসাদও এই লড়াইয়ে থাকলেও মূল নজর যে দুই প্রধান মুখের ওপরই, তা বলাই বাহুল্য।
ভবানীপুরে কোথায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে, কোন ওয়ার্ড বা বুথে শুভেন্দু অধিকারীর প্রভাব বাড়ছে, আর এই লড়াই কি নন্দীগ্রামের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের এই বিশ্লেষণ।
দুজন হেভিওয়েট প্রার্থী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর সরাসরি লড়াই নিয়ে যতটা উত্তাপ, ঠিক ততটাই ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে বামফ্রন্ট প্রার্থী সৃজীব বিশ্বাসের গলায়। পেশায় আইনজীবী সৃজীব বিশ্বাস স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর মতে ভবানীপুরের এই নির্বাচন শুধুমাত্র দুই বড় নেতার ব্যক্তিগত লড়াই নয়; বরং এটি মূলত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, এলাকার উন্নয়ন এবং সরকারের কাজকর্মের বিরুদ্ধে এক গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
তিনি দাবি করেছেন, জল-নিষ্কাশন, রাস্তার অবস্থা, নাগরিক পরিষেবা, কর্মসংস্থান—এই সব ইস্যুই ভবানীপুরের ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, “হেভিওয়েট প্রার্থী” তকমা যতই আলোচনায় থাকুক, বাস্তবে মানুষ ভোট দেবেন তাঁদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সমস্যার ভিত্তিতেই। ফলে তিনি মনে করেন না যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত দ্বৈরথই এই নির্বাচনের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তব চিত্র অনেকটাই জটিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারী যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন, তা এখনও প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে, ভবানীপুরের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে নিজের শক্ত ঘাঁটির প্রমাণ দিয়েছিলেন।
সংখ্যার হিসেবে দেখা যাচ্ছে—
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপনির্বাচনে পেয়েছিলেন পঁচাশি হাজার দুশো তেষট্টি ভোট এবং তিনি জিতেছিলেন আটান্ন হাজার আটশো পঁয়ত্রিশ ভোটের বিশাল ব্যবধানে। সেই সময় তাঁর ভোট শতাংশ ছিল একাত্তর দশমিক নয় শূন্য শতাংশ—যা নিঃসন্দেহে একতরফা জয়ের ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের এই একই সেগমেন্টে ছবিটা একেবারেই বদলে যায়। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট শতাংশ নেমে আসে ছেচল্লিশ দশমিক ছয় পাঁচ শতাংশে, আর বিজেপি উঠে আসে চল্লিশ দশমিক চার পাঁচ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যবধান অনেকটাই কমেছে, এবং লড়াই হয়েছে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
বিভিন্ন সমীক্ষা সংস্থা এবং বুথভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে উঠে আসা তথ্য আরও চমকপ্রদ। কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মোট আটটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ভবানীপুরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে।
ওয়ার্ডভিত্তিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে— প্রায় পাঁচটি ওয়ার্ডে বিজেপি এগিয়ে, এবং তিনটি ওয়ার্ডে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে। আর বুথভিত্তিক বিশ্লেষণে— মোট একশো পঞ্চাশটি বুথে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে, যেখানে একশো কুড়িটি বুথে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভবানীপুরে লড়াই এবার আর একতরফা নয়; বরং অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে।
সমীক্ষায় উঠে আসা ওয়ার্ডভিত্তিক চিত্র ভবানীপুরের রাজনৈতিক লড়াইকে আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে। সংখ্যার নিরিখে দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে বিজেপি তাদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে, আবার কিছু ওয়ার্ডে তৃণমূল কংগ্রেস এখনও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে।
যে ওয়ার্ডগুলোতে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে, সেগুলি হল—৬৩, ৭০, ৭১, ৭২ এবং ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড।
এর মধ্যে ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সাল থেকে এই ওয়ার্ডে ধারাবাহিকভাবে বিজেপির প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে। ২০২১ সালের উপনির্বাচনেও এই ধারা বজায় ছিল। চেতলা–কালিঘাট সংলগ্ন এই অঞ্চলে মারওয়ারি, গুজরাটি এবং অন্যান্য অবাঙালি ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা বিজেপির একটি ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত।
৭০ নম্বর ওয়ার্ড বিজেপির সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে গোটা ভবানীপুরে যেখানে তৃণমূলের একচেটিয়া প্রভাব ছিল, সেখানে একমাত্র এই ওয়ার্ডেই বিজেপি এগিয়ে থাকতে পেরেছিল—যা তাদের সংগঠনিক শক্তির বড় প্রমাণ।
৭১ নম্বর ওয়ার্ড-এও বিজেপি ক্রমশ জমি শক্ত করছে। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে তৃণমূলকে ধাক্কা দেওয়া তিনটি ওয়ার্ডের মধ্যে এটি একটি ছিল, এবং ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে এখানে তৃণমূলের জন্য লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
৭২ নম্বর ওয়ার্ড-এ রয়েছে মিশ্র জনসংখ্যা, যেখানে অবাঙালি ভোটারের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। ফলে এখানে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে এবং বিজেপি তার প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
৭৪ নম্বর ওয়ার্ড-এ ২০২১ সালের উপনির্বাচনেই তৃণমূল বড় ধাক্কা খেয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে বিজেপির লিড আরও বেড়েছে—যা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস যেসব ওয়ার্ডে শক্ত অবস্থানে রয়েছে, সেগুলি হল—৭৩, ৭৭ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ড।
৭৩ নম্বর ওয়ার্ড, যা কালিঘাট সংলগ্ন ও চেতলার মধ্য অঞ্চলের অন্তর্গত, তৃণমূলের একেবারে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে সংগঠন এবং জনভিত্তি—দুইই শক্তিশালী। ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড তৃণমূলের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গগুলির একটি। এই ওয়ার্ডে দলীয় প্রভাব এতটাই সুসংহত যে, বিরোধীদের পক্ষে এখানে বড় লড়াই গড়ে তোলা কঠিন। ৮২ নম্বর ওয়ার্ড-এও তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। যদিও বিজেপি এখানে কিছুটা শক্তি বাড়িয়েছে, তবে এখনও পর্যন্ত তারা লিড নিতে পারেনি।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুর কেন্দ্রে ১৪৯টি বুথে বিজেপি এগিয়ে ছিল—যা তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। তবে ২০২১ সালের উপনির্বাচনের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় সব ৮টি ওয়ার্ডেই জয়লাভ করেছিলেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং সংগঠনের শক্তিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সমীক্ষা ও বুথভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভবানীপুরের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ—যেখানে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে বিজেপি এগিয়ে, এবং এই এলাকাগুলিতেই গেরুয়া শিবির তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে বিজেপি প্রায় ১,৪৬৮টি ভোটে এগিয়ে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে—প্রায় ২০১০ সাল থেকে—এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তৃণমূল কংগ্রেসের হলেও, লোকসভা নির্বাচনে বারবার এখানে পিছিয়ে পড়েছে ঘাসফুল শিবির। এর একটি বড় কারণ হল জনসংখ্যার গঠন—এই ওয়ার্ডের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ভোটার অবাঙালি হিন্দু, যা বিজেপির পক্ষে একটি স্বাভাবিক সুবিধা তৈরি করে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ভরসা এখন ৭৩, ৭৭ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ড। এই তিনটি এলাকাতেই দলীয় সংগঠন শক্তিশালী এবং ভোটব্যাঙ্ক সুসংহত। বিশেষ করে ৭৩ নম্বর ওয়ার্ড (কালিঘাট সংলগ্ন) এবং ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড—এই দুটি তৃণমূলের “কোর স্ট্রংহোল্ড” হিসেবে ধরা হয়। এখানে বড় লিড তুলতে পারলে সামগ্রিক ব্যবধান ধরে রাখা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। ৮২ নম্বর ওয়ার্ড-এও তৃণমূল এগিয়ে, যদিও বিজেপি ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী মালা রায় ভবানীপুর বিধানসভা সেগমেন্টে মাত্র সাড়ে ছয় হাজারের কাছাকাছি ভোটে এগিয়ে ছিলেন। অথচ ২০২১ সালের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়ের ব্যবধান ছিল বিশাল—আটানব্বই হাজার আটশো বত্রিশ ভোট।
এই বিপুল পার্থক্যই দেখিয়ে দিচ্ছে—ভোটের মাটিতে সমীকরণ কতটা বদলে গেছে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবারও সাত হাজারের বেশি ভোটে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বলছে লড়াই সহজ নয়। কারণ, ২০২১ সালের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ২৩১টি বুথে এগিয়ে ছিল—যা ছিল একপ্রকার রেকর্ড। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরনো আধিপত্য বজায় রাখা বেশ কঠিন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ওয়ার্ড ও বুথভিত্তিক এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এই লড়াই আর একতরফা নয়। বরং প্রতিটি ভোট, প্রতিটি বুথ এবং প্রতিটি ওয়ার্ড এখন ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে।
#BhowaniporeElectionBattle #MamataBanerjee #SuvenduAdhikari #KolkataPolitics #WestBengalElection #TMCvsBJP #Bhabanipur #ElectionAnalysis #IndiaPolitics
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স চাইছেন পঙ্কজ-ডিম্পল! মাঝখানে ফেঁসে গেলেন অপরশক্তি খুরানা?
- ‘গুজারিশ’-এর ইথান মাসকারেনহাস আজ বাস্তব! ১৩ বছরের যন্ত্রণার অবসান, দেশে প্রথমবার ইউথেনেশিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যুর) অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের
- স্বেচ্ছামৃত্যু কি ভারতে বৈধ? স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন কে করতে পারেন? ভারতে ইউথানেসিয়া নিয়ে কী বলছে আইন
- মাছ-মাংস না খেলেও শরীর থাকবে ফিট! জেনে নিন, ৩টি হেলদি সুস্বাদু নিরামিষ রেসিপি
- যোটক বিচার কি সত্যিই কাজ করে? বিয়ের আগে আসলে কোনটা জরুরি, কী বলছে আধুনিক বিজ্ঞান?

