সৃষ্টির দেবতা হয়েও কেন তিনি ব্রাত্য? জানুন সরস্বতীর অভিশাপ, পুষ্পকের যজ্ঞ এবং Brahma Temple Story-র আড়ালে লুকিয়ে থাকা অহংকারের পতনের এক রোমহর্ষক উপাখ্যান।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : ভারতের যেকোনো প্রান্তে যান, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বা বিশাল মন্দিরে শিব, বিষ্ণু, দুর্গা কিংবা হনুমানের পূজা হতে দেখবেন। শঙ্খের ধ্বনি, ধূপের গন্ধ আর ভক্তদের ভিড়—সর্বত্রই এই দেবতাদের জয়জয়কার। কিন্তু কখনও কি খেয়াল করেছেন, এই ভিড়ের মাঝে একজন অনুপস্থিত? তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা।
যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, যিনি বেদ-এর রচয়িতা, তাঁর নিজেরই কোনো মন্দির নেই! সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি জায়গায় (যেমন রাজস্থানের পুষ্কর) তাঁর পূজা হয়। বাকি সব জায়গায় তিনি ব্রাত্য। কিন্তু কেন?
একজন পিতা কি তাঁর সন্তানদের দ্বারা পরিত্যক্ত হলেন? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর রহস্য? পুরাণের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এর নেপথ্যে রয়েছে এক ভীষণ অভিশাপ এবং মিথ্যে অহংকারের পতনের গল্প। আজ আমরা শুনব সেই কাহিনী, যা আমাদের শেখায়—ক্ষমতা বা পদমর্যাদা যত উঁচুই হোক না কেন, সত্যের অপলাপ করলে ঈশ্বরও ক্ষমা পান না।
আরও পড়ুন : ‘ওম’ শব্দের উৎপত্তি কোথায়? মহাবিশ্বের প্রথম ধ্বনির রহস্য
পুষ্করের যজ্ঞ এবং সাবিত্রীর ক্রোধ (The Great Yajna at Pushkar)
পদ্ম পুরাণ-এ বর্ণিত এই কাহিনীটি অনেকটা সিনেমার প্লটের মতো নাটকীয়। ঘটনার সূত্রপাত রাজস্থানের পবিত্র তীর্থস্থান পুষ্করে। সৃষ্টিপিতা ব্রহ্মা ঠিক করলেন, মর্ত্যলোকের মঙ্গলের জন্য তিনি এক বিশাল যজ্ঞ করবেন। এই যজ্ঞের মাহাত্ম্য এতটাই যে, সমস্ত দেব-দেবী সেখানে উপস্থিত হলেন।
কিন্তু হিন্দু শাস্ত্র মতে, কোনো বিবাহিত পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে ছাড়া যজ্ঞে পূর্ণাঞ্জলি দিতে পারেন না। ব্রহ্মা যজ্ঞের বেদিতে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী দেবী সাবিত্রী (যিনি সরস্বতীরই এক রূপ) তখনও এসে পৌঁছাননি। শুভ মুহূর্ত বা ‘মুহূর্ত’ পেরিয়ে যাচ্ছে। ব্রহ্মা অধৈর্য হয়ে পড়লেন। সৃষ্টিপিতা হয়ে তিনি কি সময়ের কাছে হার মানবেন?
ক্রোধ এবং অধৈর্য্যের বশে ব্রহ্মা দেবরাজ ইন্দ্রকে আদেশ দিলেন, “যাও, আমার পাশে বসার জন্য এখনই কোনো পাত্রী খুঁজে আনো।” ইন্দ্র দ্রুত এক গোয়ালিনী কন্যাকে নিয়ে এলেন, যার নাম গায়েত্রী। মন্ত্রপাঠ করে ব্রহ্মা চটজলদি গায়েত্রীকে বিবাহ করলেন এবং তাঁকে পাশে বসিয়ে যজ্ঞ শুরু করে দিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে প্রবেশ করলেন দেবী সাবিত্রী। নিজের আসনে অন্য নারীকে দেখে তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরতে লাগল। অপমান এবং রাগে তিনি কাঁপতে লাগলেন। ভরা সভায় সমস্ত দেব-দেবীর সামনে তিনি ব্রহ্মাকে অভিশাপ দিলেন, “হে জগৎপিতা, তুমি আজ কাম এবং ক্রোধের বশে আমাকে অপমান করেছ। আজ থেকে মর্ত্যলোকে কেউ তোমার পূজা করবে না। তোমার কোনো মন্দির থাকবে না, উৎসবে তোমার নাম উচ্চারিত হবে না!”
পরে অবশ্য অন্যান্য দেবতাদের অনুরোধে সাবিত্রী তাঁর অভিশাপ কিছুটা শিথিল করে বলেন, “শুধুমাত্র এই পুষ্করেই তোমার পূজা হবে, এর বাইরে অন্য কোথাও নয়।” সেই থেকেই পুষ্কর ছাড়া বিশ্বে ব্রহ্মার মন্দির বিরল।
মিথ্যে সাক্ষ্য ও অহংকারের পতন (The Shiva Purana Version)
যদি পদ্ম পুরাণ-এর গল্পটি হয় নারীর অপমানের, তবে শিব পুরাণ-এ বর্ণিত কাহিনীটি হলো মিথ্যে অহংকারের। সৃষ্টির শুরুতে একবার ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে তর্ক শুরু হলো—কে শ্রেষ্ঠ? ব্রহ্মা বললেন, “আমি সৃষ্টি করেছি, তাই আমি শ্রেষ্ঠ।” বিষ্ণু বললেন, “আমি পালন করি, তাই আমি শ্রেষ্ঠ।”
তর্ক যখন চরমে, তখন তাঁদের মাঝে আবির্ভূত হলো এক বিশাল অগ্নিস্তম্ভ বা জ্যোতির্লিঙ্গ। কোনো আদি নেই, কোনো অন্ত নেই। দৈববাণী হলো—”তোমাদের মধ্যে যে এই স্তম্ভের শেষ খুঁজে পাবে, সেই শ্রেষ্ঠ।”
বিষ্ণু বরাহ বা শূকরের রূপ ধরে মাটির নিচে গেলেন স্তম্ভের শেষ খুঁজতে। আর ব্রহ্মা হংস বা রাজহাঁসের রূপ ধরে উড়ে গেলেন ওপরের দিকে। হাজার বছর কেটে গেল। বিষ্ণু নিচে কিছুই পেলেন না, তিনি ফিরে এসে সত্য স্বীকার করলেন যে তিনি ব্যর্থ। কিন্তু ব্রহ্মার অহংকারে আঘাত লাগল। তিনি ফেরার পথে একটি ‘কেতকী’ ফুলকে দেখতে পেলেন। ব্রহ্মা ফুলটিকে মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য রাজি করালেন।
শিবের সামনে এসে ব্রহ্মা দাবি করলেন, “আমি স্তম্ভের শিখর দেখেছি এবং এই কেতকী ফুল তার সাক্ষী।” মহাদেব তো অন্তর্যামী। তিনি ব্রহ্মার এই জালিয়াতি ধরে ফেললেন। ক্রুদ্ধ শিব ভৈরব রূপ ধারণ করে ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তকটি (যেটি মিথ্যে বলেছিল) কেটে ফেললেন। এবং অভিশাপ দিলেন, “দেবতা হয়েও তুমি জালিয়াতি করেছ, তাই পৃথিবীতে তোমার পূজা হবে না।”
আধ্যাত্মিক অর্থ: কেন মন বা বুদ্ধির পূজা হয় না? (The Spiritual Symbolism)
পুরাণের গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর দর্শন। ব্রহ্মা হলেন ‘মন’ বা ‘বুদ্ধি’-র প্রতীক (Mind/Intellect)। বিষ্ণু হলেন ‘মনঃসংযোগ’ বা ‘পালন’ এবং শিব হলেন ‘আত্মা’ বা ‘চেতনা’। মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল। মন সবসময় এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায় (যেমন ব্রহ্মা মিথ্যে বলেছিলেন বা অধৈর্য হয়ে বিয়ে করেছিলেন)। চঞ্চল মন দিয়ে কখনও সত্য বা ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না। সত্যকে পেতে হলে দরকার বিষ্ণুর মতো ভক্তি বা শিবের মতো ত্যাগ।
এই কারণেই সনাতন ধর্মে বলা হয়, বুদ্ধির (ব্রহ্মা) কাজ শুধু সৃষ্টি করা বা পথ দেখানো, কিন্তু পূজা পাওয়ার যোগ্য হলো ভক্তি এবং বিশ্বাস। ব্রহ্মার মন্দির না থাকা আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অহংকারী বুদ্ধি বা চতুরতা দিয়ে জাগতিক সাফল্য পাওয়া গেলেও, আধ্যাত্মিক শান্তি পাওয়া যায় না।
ব্রহ্মার বিরল মন্দির: পুষ্কর (The Exception)
যদিও অভিশাপ ছিল, তবুও রাজস্থানের পুষ্কর হ্রদের তীরে চতুর্দশ শতাব্দীতে তৈরি ব্রহ্মার মন্দিরটি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। কার্তিক পূর্ণিমার সময় এখানে বিশাল মেলা বসে। সারা বিশ্ব থেকে ভক্তরা আসেন জগৎপিতার দর্শন পেতে। মন্দিরের গর্ভগৃহে ব্রহ্মার চতুর্মুখী মূর্তি স্থাপন করা আছে, যার পাশে বসে আছেন গায়েত্রী। আর সাবিত্রী? তিনি বসে আছেন মন্দিরের পেছনের রত্নাগিরি পাহাড়ের ওপর, যেন আজও অভিমান করে দূরে তাকিয়ে আছেন।
দেবতারাও যে কর্মফলের ঊর্ধ্বে নন, ব্রহ্মার এই কাহিনী তার জ্বলন্ত প্রমাণ। স্রষ্টা হয়েও তিনি সম্মান পাননি শুধুমাত্র একটি ভুলের কারণে। এই গল্প আমাদের শেখায়, পরিস্থিতি যেমনই হোক—সত্যের পথ এবং ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে তার মাশুল গুনতে হয়। তাই পুষ্করে যখন যাবেন, তখন শুধু স্থাপত্য দেখবেন না, মনে করবেন সেই প্রাচীন অভিশাপের কথা—যা আজও আমাদের অহংকার ত্যাগ করার শিক্ষা দিয়ে চলেছে।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

