Cheetah Reintroduction Project Reality: আফ্রিকা থেকে ঘটা করে আনা চিতাগুলো কি সত্যিই ভারতের জঙ্গলে স্বাধীনভাবে ঘুরছে? নাকি এগুলো স্রেফ চিড়িয়াখানার মতো বন্দি দশায় দিন কাটাচ্ছে? পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় চার বছর পরেও অর্ধেকের বেশি চিতা বন্দি রয়েছে তারের ঘেরাটোপে! রোজ ৩৫ হাজার টাকার ছাগলের মাংস খাইয়ে কি বন্য চিতা তৈরি করা সম্ভব? সরকারের ‘সাফল্য’-এর দাবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত ব্যর্থতার চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ জানুন।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ১৯৫২ সালে ভারত থেকে সরকারিভাবে চিতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটা করে আফ্রিকা থেকে ভারতে চিতা ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ—ভারতের উন্মুক্ত জঙ্গলে আবারও চিতার অবাধ বিচরণ ফিরিয়ে আনা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দর যাদব (Bhupender Yadav) এই চিতা প্রজেক্ট বা ‘প্রজেক্ট চিতা’কে একটি “বিরাট সাফল্য” (great success) বলে আখ্যা দিয়েছেন। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি বতসোয়ানা (Botswana) থেকে আরও ৬টি স্ত্রী এবং ৩টি পুরুষ চিতা মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে (Kuno National Park) এসে পৌঁছেছে। এছাড়া সম্প্রতি কুনোর জঙ্গলে জন্ম নিয়েছে আরও ৫টি নতুন শাবক। সব মিলিয়ে বর্তমানে ভারতে চিতার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩-তে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম চিতা আসার পর থেকে এটি হলো দশম শাবক জন্মের ঘটনা (10th litter)।
খবরের কাগজের প্রথম পাতায় এই সংখ্যাগুলো দেখলে যে কারোরই মনে হতে পারে যে প্রজেক্টটি সত্যিই ১০০ শতাংশ সফল। কিন্তু বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে দেখলে এই ‘সাফল্য’-এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক চরম হতাশা এবং ব্যর্থতার ছবি। আজ NewsOffBeat-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বিশ্লেষণ করব যে, কেন ভারতের এই বহুল চর্চিত চিতা পুনর্বাসন প্রকল্পকে (Cheetah introduction project) আসলে ‘চিড়িয়াখানার এক্সটেনশন’ বা ‘ক্যাপটিভ ব্রিডিং’ (Captive breeding) বলা হচ্ছে। আপনার ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে চিতা আনা হলো, তাদের ভবিষ্যৎ আসলে কতটা সুরক্ষিত? আসুন, গভীরে প্রবেশ করা যাক।
৫৩টি চিতার মধ্যে স্বাধীন মাত্র ১৫টি! বাকিরা কোথায়?
যে প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য ছিল চিতাগুলোকে মুক্ত বা স্বাধীনভাবে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া (free-ranging population), সেই প্রজেক্টের চার বছর পর বাস্তব ছবিটা দেখলে আপনি চমকে উঠবেন।
সরকারি আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে থাকা মোট ৫৩টি চিতা বা তাদের শাবকদের মধ্যে এই মুহূর্তে মাত্র ১৫টি চিতা ঘেরাটোপের বাইরে স্বাধীনভাবে ঘুরছে (roaming freely outside fenced enclosures)। এই ১৫টির মধ্যে ১৩টি রয়েছে কুনো ন্যাশনাল পার্কে (Kuno National Park) এবং বাকি ২টি রয়েছে গান্ধী সাগর ন্যাশনাল পার্কে (Gandhi Sagar National Park)।
তাহলে বাকি ৩৮টি চিতা কোথায়? উত্তরটা হলো—বন্দিদশায়! ভারতের অর্ধেকেরও বেশি চিতা বর্তমানে তারের বেড়া দেওয়া ঘেরাটোপের (fenced enclosures) মধ্যে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। এই ঘটনা পরিবেশবিদ, ভেটেরিনারি ডাক্তার এবং বন্যপ্রাণ বিজ্ঞানীদের (wildlife scientists) মনে এই প্রজেক্টের আসল সাফল্য নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যে প্রাণীগুলো দিনের পর দিন খাঁচায় বন্দি থাকে, তাদের কি সত্যিই ‘বন্য’ বলা যায়?
বন্যপ্রাণের বদলে ‘ক্যাপটিভ ব্রিডিং’: বিশেষজ্ঞদের চাঞ্চল্যকর দাবি
সরকার যতই এই প্রজেক্টকে সফল বলুক না কেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা এর সঙ্গে মোটেও একমত নন।
বায়োডাইভার্সিটি কোলাবরেটিভ (Biodiversity Collaborative)-এর নেটওয়ার্ক কোঅর্ডিনেটর এবং লার্জ ক্যাট স্পেশালিস্ট (large cat specialist) রবি চেল্লম (Ravi Chellam) অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই প্রজেক্টের সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান, “এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, ভারতের জঙ্গলে বন্য পরিবেশে চিতাগুলো নিজেরা নিজেদের মতো করে বেঁচে আছে (self-sustaining populations in the wild), এমন কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।”
রবি চেল্লম আরও একটি ভয়ংকর দিক তুলে ধরেন। তাঁর মতে, “এই প্রজেক্টের পুরো জোর এখন বন্য পুনর্বাসন থেকে সরে গিয়ে ‘ক্যাপটিভ ব্রিডিং’ (captive breeding) বা ঘেরাটোপের মধ্যে প্রজনন করানো এবং প্রজেক্টের চারপাশে একটা মিথ্যা সফলতার আখ্যান (managing the narrative) তৈরি করার দিকে চলে গেছে।” তিনি মনে করেন, নতুন চিতা আনার সঙ্গে সঙ্গে সরকার যে হাইপ বা উত্তেজনা তৈরি করছে, তা আসলে এই প্রজেক্টের চরম ব্যর্থতাগুলোকে ঢাকতেই ব্যবহার করা হচ্ছে। মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে চিতা সংরক্ষণের (conservation of India’s open natural systems) যে আসল উদ্দেশ্য ছিল, তা এখন পুরোপুরি উপেক্ষিত।
জায়গার অভাব এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত: কুনো কি যথেষ্ট?
চিতা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রাণী। শিকার করার জন্য এবং নিজের এলাকা বা টেরিটরি (territory) তৈরি করার জন্য এদের বিশাল বড় ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন হয়। আর এখানেই রয়েছে কুনো ন্যাশনাল পার্কের সবচেয়ে বড় গলদ।
আফ্রিকার চিতার ওপর করা গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একটি বন্য চিতার ঘনত্ব (density) হওয়া উচিত প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বড়জোর একটি (one cheetah per 100sqkm)। সেই হিসাব অনুযায়ী, ৭৪৮ বর্গকিলোমিটারের (748sqkm) কুনো ন্যাশনাল পার্কে পর্যাপ্ত শিকার বা খাবার থাকলে সর্বোচ্চ ২১টি স্বাধীন চিতা (21 free-ranging cheetahs) থাকতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো, বাকি চিতাগুলোকে কোথায় রাখা হবে? জায়গা কম থাকার কারণেই কি তাদের ঘেরাটোপে আটকে রাখা হয়েছে?
জায়গার এই অভাবের কারণেই চিতাগুলো বারবার জঙ্গল ছেড়ে মানুষের লোকালয়ের দিকে চলে যাচ্ছে (approaching human settlements)। কুনো ফরেস্ট অথরিটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মধ্যে অন্তত চারবার (at least four such recaptures) এমন লোকালয়ে চলে যাওয়া চিতাকে পুনরায় বন্দি করে বা ঘুমপাড়ানি গুলি ছুঁড়ে কুনোতে ফিরিয়ে এনেছে।
কারনাসিয়ালস গ্লোবাল (Carnassials Global)-এর প্রধান বিজ্ঞানী এবং স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইকোলজিস্ট (statistical ecologist) অর্জুন গোপালস্বামী (Arjun Gopalaswamy) এই প্রসঙ্গে এক অত্যন্ত যৌক্তিক কথা বলেছেন। তিনি জানান, “যদি চিতাগুলোকে বারবার লোকালয় থেকে ধরে এনে আবার কুনোর জঙ্গলে আটকে রাখা হয় (repeatedly being caught and returned to Kuno), তবে কোনোভাবেই তাদের স্বাধীন বা ‘ফ্রি-রেঞ্জিং’ (free-ranging) চিতা বলা যায় না।” তাঁর মতে, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই “ধরো আর ছাড়ো” বা ‘ক্যাচ-ট্রান্সপোর্ট-রিলিজ’ (simplistic catch-transport-release) পদ্ধতি অত্যন্ত হাস্যকর এবং অবৈজ্ঞানিক।
দৈনিক ৩৫ হাজার টাকার ছাগলের মাংস! বন্যপ্রাণ নাকি পোষ্য?
সরকার দাবি করছে যে, ঘেরাটোপগুলো আসলে “ফেন্সড ন্যাচারাল হ্যাবিট্যাট” (fenced natural habitats), যেখানে চিতাগুলো স্বাধীনভাবে শিকার করতে পারে এবং ভারতীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এই দাবির পেছনের নগ্ন সত্যিটা শুনলে আপনি অবাক হবেন।
২০২৩-২৪ সালের একটি প্রজেক্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ঘেরাটোপগুলোর ভেতরে চিতাদের শিকার করার জন্য নিয়মিতভাবে চিতল হরিণ বা স্পটেড ডিয়ার (regularly supplemented with chital deer) ছেড়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে, এই চিতাগুলোকে খাওয়ানোর জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩৫,০০০ টাকা (₹35,000 per day) খরচ করে ছাগলের মাংস (goat meat) সরবরাহ করা হয়!
সমালোচকরা বলছেন, প্রতিদিন এত হাজার হাজার টাকা খরচ করে যদি ছাগলের মাংস বা সাপ্লিমেন্টারি খাবার (supplemental food) দেওয়া হয়, তবে খাঁচায় বন্দি প্রাণীর প্রজনন (captive breeding) এবং সত্যিকারের বন্য পুনর্বাসনের (true reintroduction) মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না। সত্যিকারের বন্য পরিবেশ মানে হলো, শিকারীকে নিজের দক্ষতায় শিকার খুঁজে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে (expected to hunt and survive on their own)। কিন্তু এখানে তাদের কার্যত ‘পোষ্য’ প্রাণীর মতো মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে চিতার জন্মগত শিকার করার ক্ষমতা বা ‘হান্টিং ইন্সটিংক্ট’ (hunting instinct) নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
সরকারের সাফাই: ‘সফট রিলিজ মডেল’
এত সমালোচনার পরেও প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা এই বন্দিদশাকে সমর্থন করছেন। প্রজেক্টের পশুচিকিৎসক সনৎ মুডিয়া (Sanath Mudiya) এবং তাঁর সহকর্মীরা ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন কনজারভেশন সায়েন্স’ (Frontiers in Conservation Science) জার্নালে একটি রিপোর্টে দাবি করেছেন যে, তাঁরা ‘সফট রিলিজ মডেল’ (soft release model) ব্যবহার করছেন।
তাঁদের মতে, এই সফট রিলিজ মডেলের কারণে আফ্রিকান চিতাগুলোর ভারতের পরিবেশে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় আড়াই গুণ (odds of reintroduction success 2.5-fold) বেড়ে গেছে। তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন যে, প্রজেক্টের মূল ফোকাস হলো এই প্রথম প্রজন্মের চিতাগুলোর (first-generation India-born cubs) বেঁচে থাকা এবং তাদের প্রজনন নিশ্চিত করা। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, “খাঁচায় জন্মানো যে শাবকগুলো জীবনে কখনো নিজের ক্ষমতায় শিকার করতে শিখবে না, তারা ভবিষ্যতে উন্মুক্ত জঙ্গলে কীভাবে বাঁচবে?” (We should see India-born cubs themselves surviving into adulthood in the wild)।
এক বিলাসবহুল সাফারি পার্কের জন্ম?
ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA) এবং পরিবেশ মন্ত্রকের কাছে এই বন্দি চিতাগুলো ঠিক কত সময় খাঁচায় আর কত সময় জঙ্গলে কাটিয়েছে, তা জানতে চেয়ে একটি রিপোর্ট চাওয়া হলেও এখনো কোনো উত্তর মেলেনি।
সব তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ভারতের চিতা প্রজেক্ট হয়তো সংখ্যায় চিতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু তাদের ‘বন্য’ সত্তাকে ফিরিয়ে দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে আফ্রিকার চিতা এনে তাদের রোজ ৩৫ হাজার টাকার ছাগলের মাংস খাইয়ে যদি তারের বেড়ার ভেতরেই রাখতে হয়, তবে তাকে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ না বলে ‘বিলাসবহুল চিড়িয়াখানা’ বা ‘সাফারি পার্ক’ বলাই হয়তো বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রকৃতি এবং বিজ্ঞানের সঙ্গে এই ছেলেখেলা বন্ধ না হলে, ভারতের জঙ্গলে চিতার অবাধ দৌড় হয়তো কোনোদিনও আর বাস্তব হবে না।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- খাঁচায় বন্দি চিতা, অথচ সরকারের খাতায় ‘সফল’ প্রজেক্ট! ভারতের চিতা পুনর্বাসন প্রকল্পের আসল সত্যিটা কী?
- সোনার বাজারে বড় পতন! মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আবহে গোল্ড ইটিএফ-এ (Gold ETF) বিনিয়োগ করা কি এখন বুদ্ধিমানের কাজ?
- হেঁশেলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ! গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে দেশজুড়ে হাহাকার, সাধারণ মানুষের বাঁচতে কী করতে হবে?
- বৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স চাইছেন পঙ্কজ-ডিম্পল! মাঝখানে ফেঁসে গেলেন অপরশক্তি খুরানা?
- ‘গুজারিশ’-এর ইথান মাসকারেনহাস আজ বাস্তব! ১৩ বছরের যন্ত্রণার অবসান, দেশে প্রথমবার ইউথেনেশিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যুর) অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের

