জেফরি এপস্টিন মারা গিয়েছেন ২০১৯ সালে। কিন্তু ফাইল প্রকাশ পেল ২০২৬-এ (Epstein Files 2026)। এর পেছনে কি শুধুই ন্যায়বিচার, নাকি লুকিয়ে আছে ট্রাম্পের গভীর রাজনৈতিক চাল? ক্লিনটন থেকে গেটস—কেন বলি দেওয়া হলো ‘সাবেক’দের? পড়ুন এই গভীর বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন। —লিখেছেন তন্ময় সামন্ত
হঠাৎই বদলে গেল দৃশ্যপট। এত বড় নাটকীয় মোড়, যা হার মানাবে নেটফ্লিক্সের বাঘা বাঘা থ্রিলার সিরিজের চিত্রনাট্যকেও। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুটা হয়েছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা আর বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক মন্দার ত্রাস দিয়ে। আন্তর্জাতিক মহলের চোখ আটকে যুদ্ধের ময়দানে। মনে হচ্ছিল, বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার দাপট বুঝি অস্তমিত, আর নতুন শক্তির উত্থান কেবল সময়ের অপেক্ষা।ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় যত এগিয়েছে, বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার দাপট নিয়ে প্রশ্ন তত জোরালো হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন সব থমকে গেল। ইউক্রেন, গাজা বা তাইওয়ান নয়—বিশ্বের সমস্ত মিডিয়ার লেন্স এখন একটা পুরনো কবরের দিকে। জেফরি এপস্টিন। লোকটা মরেছে ২০১৯ সালে। কিন্তু তার প্রেতাত্মা যেন ২০২৬-এ জীবন্ত হয়ে উঠল।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আমেরিকার বিচার বিভাগ বা ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) ঘোষণা করেন এপস্টিনের সেই কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক বুক’ এবং লক্ষ লক্ষ পাতার সিল করা নথিপত্র জনসমক্ষে আনা হবে। তখন সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন, অবশেষে বিচার পাওয়া যাবে। অবশেষে মুখোশ খুলবে। মুখোশ খুলল ঠিকই, কিন্তু যেভাবে ভাবা হয়েছিল, সেভাবে নয়। এই ফাইল রিলিজ সাধারণ কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়। রাজনীতির অলিগলি যারা চেনেন, তারা বুঝতে পারছেন, ওয়াশিংটনের বাতাসে এখন বারুদের গন্ধ। এই বারুদ বন্দুকের নয়, তথ্যের। আর এই বিস্ফোরণের রিমোট কন্ট্রোল যার হাতে, তিনি আর কেউ নন—স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু কেন এখনই? আর কেনই বা নিজের এবং নিজের পরিবারের নাম থাকার ঝুঁকি নিয়েও এই ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খোলার অনুমতি দিলেন ট্রাম্প?
টাইমিং-ই আসল খেলা: কেন ২০২৬?
জেফরি এপস্টিন যখন জেলের কুঠুরিতে রহস্যজনকভাবে মারা যান (বা ‘মেরে ফেলা হয়’ বলে অনেকের বিশ্বাস), তখন থেকেই এই ফাইলগুলো এফবিআই-এর ভল্টে ছিল। বাইডেন জমানায় বা তার আগেও এগুলো প্রকাশ করা যেত। কিন্তু করা হয়নি। ২০২৬ আমেরিকার রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে যখন ডলারের আধিপত্য কমছে, ব্রিকস (BRICS) যখন মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন আমেরিকার দরকার ছিল এমন একটা ‘শক ওয়েভ’, যা তাদের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক শত্রুদের এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
রাজনীতিতে একটা কথা আছে—“Never let a good crisis go to waste.” কিন্তু এখানে কোনো ক্রাইসিস ছিল না, তাই ট্রাম্প প্রশাসন একটা ক্রাইসিস তৈরি করল। এই ফাইল রিলিজের টাইমিংটা খেয়াল করুন। ঠিক যখন ট্রাম্প প্রশাসন কিছু কঠোর অভিবাসন নীতি এবং অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই বোমা ফাটানো হলো। মিডিয়ার নজর পলকে সরে গেল। কিন্তু এটা শুধুই ‘ডিস্ট্রাকশন’ বা নজর ঘোরানো নয়, এটা হলো ‘কনসোলিডেশন অফ পাওয়ার’ বা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক গভীর চক্রান্ত।
ট্রাম্পের ‘মাস্টারস্ট্রোক’: নিজের গায়ে কাদা মেখে শত্রুকে কবর দেওয়া
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ট্রাম্প কেন এমন কিছু প্রকাশ করবেন যেখানে তার নিজের বা তার পরিবারের সদস্যদের (যেমন তার মেয়ে ইভঙ্কার নাম জল্পনায় এসেছে) নাম থাকতে পারে? এখানেই ট্রাম্পের সেই বিখ্যাত ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা ‘Unpredictability’-র খেলা। ট্রাম্প বিশ্বকে একটা বার্তা দিতে চাইলেন: “আমি কাউকেই পরোয়া করি না। আমার নিজের গায়ে কাদা লাগলে লাগুক, কিন্তু আমি তোমাদের সবাইকে উলঙ্গ করে দেব।” যখন একজন নেতা নিজের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেন, তখন প্রতিপক্ষরা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। তারা ভাবে, “যে লোক নিজের মেয়ের নাম থাকার পরেও ফাইল রিলিজ করতে পারে, সে আমাদের সাথে কী করতে পারে!” এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা ‘Psy-Op’।
নিজের নাম বা পরিবারের নাম থাকাটা ট্রাম্পের কাছে এখন আর কলঙ্ক নয়, বরং একটা ‘শিল্ড’ বা বর্ম। তিনি এর মাধ্যমে বোঝাচ্ছেন, “দেখো, আমি স্বচ্ছ। আমি কিছুই লুকাইনি। কিন্তু তোমরা? তোমরা কি পারবে তোমাদের নোংরামি লুকাতে?” এই সাহসের প্রদর্শনী তাকে তার কট্টর সমর্থকদের কাছে আরও বেশি ‘হিরো’ বা ‘মসিহা’ করে তুলেছে। তারা ভাবছে, ট্রাম্পই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই পচা সিস্টেমটাকে ভাঙতে পারেন, এমনকি নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও।
‘খরচের খাতা’র নামগুলো: কেন ক্লিনটন, গেটস বা প্রিন্স এন্ড্রু?
প্রকাশিত ফাইলে যাদের নাম বড় বড় করে হেডলাইনে এসেছে—বিল ক্লিনটন, প্রিন্স এন্ড্রু, বিল গেটস, স্টিফেন হকিং বা অ্যালান ডারশোইৎজ—এদের দিকে একটু ঠান্ডা মাথায় তাকান।এরা কারা? এরা প্রত্যেকেই একসময় ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা বা ‘পলিটিক্যাল লিভারেজ’ প্রায় শূন্য।
- বিল ক্লিনটন: বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ, ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতেও এখন তিনি আর ‘ডিসিশন মেকার’ নন।
- প্রিন্স এন্ড্রু: ব্রিটিশ রাজপরিবার আগেই তাকে একঘরে করে দিয়েছে। তার সম্মান ধুলোয় মিশলে ব্রিটেনের বর্তমান রাজা বা সরকারের কোনো ক্ষতি নেই।
- বিল গেটস: প্রযুক্তি বিশ্বে তার প্রভাব থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে তিনি এখন আর বড় কোনো থ্রেট নন।
ট্রাম্প প্রশাসন বা যারা এই ফাইল রিলিজের কলকাঠি নাড়ছেন, তারা খুব সচেতনভাবেই এই নামগুলোকে ‘বলি’ দিয়েছেন। এদের নাম প্রকাশ পেলে পাবলিক ক্ষোভ মিটবে, মিডিয়া টিআরপি পাবে, আর সাধারণ মানুষ ভাববে—বিচার হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন করুন—বর্তমান বিশ্বের কোনো বড় রাষ্ট্রনেতা, কোনো কর্মরত সিইও, বা কোনো প্রভাবশালী গোয়েন্দা প্রধানের নাম কি এই লিস্টে এসেছে? যারা এই মুহূর্তে ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করছেন বা যারা বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের নাম কোথায়?
নেই। আর এটাই হলো আসল রহস্য।
যাদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, তারা হলো ‘Dead Weight’ বা মৃত ভার। জাহাজ হালকা করতে নাবিক যেমন অপ্রয়োজনীয় ভার সমুদ্রে ফেলে দেয়, ট্রাম্প প্রশাসনও এই ‘খরচের খাতা’র নামগুলো জনসমক্ষে ফেলে দিয়েছে। আর আসল বা ‘Active Players’-দের ফাইলগুলো সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছে পরবর্তী দাবার চালের জন্য।
‘কম্প্রোম্যাট’ (Kompromat) এবং জিওপলিটিক্যাল ওয়ার্নিং
রাশিয়ান শব্দ ‘কম্প্রোম্যাট’ মানে হলো—কাউকে ব্ল্যাকমেইল করার মতো আপত্তিকর তথ্য হাতে রাখা। জেফরি এপস্টিন এবং তার সহযোগী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল মূলত ছিলেন এই কম্প্রোম্যাট সংগ্রহের কারিগর। অনেকের মতে, এপস্টিন কোনো সাধারণ ফিনান্সিয়াল ব্রোকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন মোসাদ বা সিআইএ-র হয়ে কাজ করা এক ‘হানি ট্র্যাপ’ অপারেটর। তার কাজই ছিল বিশ্বের রাঘব-বোয়ালদের দুর্বল মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দি করা।
২০২৬ সালে এই ফাইল প্রকাশের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বনেতাদের কাছে একটি ‘Warning Shot’ বা সতর্কবার্তা পাঠাল। বার্তাটি পরিষ্কার:
“আমরা জানি তোমরা ওই দ্বীপে কী করেছিলে। বিল ক্লিনটনের নাম যদি আমরা প্রকাশ করতে পারি, প্রিন্স এন্ড্রুকে যদি আমরা রাস্তায় নামাতে পারি, তবে ভেবো না তোমরা নিরাপদ। আমাদের কথা মতো চলো, নাহলে পরবর্তী লিক-এ তোমার নাম থাকবে।”
এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক নজিরবিহীন অধ্যায়। সাধারণত দেশগুলো একে অপরকে নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক দিয়ে চাপ দেয়। কিন্তু আমেরিকা এবার খেলল ‘লজ্জা’ বা ‘Shame’ কার্ড। জি-সেভেন (G7) বা ন্যাটোর (NATO) কোনো সদস্য দেশ যদি এখন আমেরিকার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে চায়, তাদের দুবার ভাবতে হবে। কারণ তাদের রাষ্ট্রপ্রধান বা মন্ত্রীদের গোপন ভিডিও হয়তো ওয়াশিংটনের কোনো সার্ভারে আপলোড হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
খালি চোখে মনে হতে পারে, এত বছর পর নির্যাতিত কিশোরীরা হয়তো বিচার পাচ্ছে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যাবে, নির্যাতিতরা এখানে শুধুই দাবার ঘুঁটি। তাদের কান্নাকে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক মাইলেজ পাওয়ার জন্য। যদি সত্যিই বিচার উদ্দেশ্য হতো, তবে ২০১৯ সালেই সব নাম প্রকাশ করা হতো। ২০২৬ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হতো না। এই সিলেক্টিভ বা বাছাই করা তথ্য প্রকাশ প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা বিশ্বে বিচারব্যবস্থা এখন আর অন্ধ নয়, বরং সে এখন রাজনীতির নির্দেশে এক চোখ খোলে আর এক চোখ বন্ধ রাখে। আমেরিকা বোঝাতে চাইল, তারা এখনো কতটা ভয়ঙ্কর। তারা শুধু মিসাইল দিয়ে দেশ ধ্বংস করে না, তারা তথ্য দিয়ে মানুষের চরিত্র, সম্মান এবং লিগ্যাসি ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’-এর ভয় পরমাণু বোমার চেয়েও বেশি। কারণ মৃত্যু একবার হয়, কিন্তু সম্মানহানি প্রতিদিন মারে।
বিশ্বাসের মৃত্যু ও ভবিষ্যতের পৃথিবী
এই এপস্টিন ফাইলস ২০২৬ রিলিজের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হলো, তা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নয়, বরং ‘বিশ্বাস’-এর। সাধারণ মানুষ দেখল, তাদের আইডলরা—যাদের তারা বিজ্ঞান, রাজনীতি বা সমাজসেবার ভগবান মানত—তারা আসলে মুখোশধারী দানব। স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিজ্ঞানীর নাম যখন এমন নোংরা কেলেঙ্কারিতে জড়ায় (যদিও অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচার্য), তখন বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধে চিড় ধরে। ক্লিনটন বা গেটসের মতো ‘ফিলানথ্রপিস্ট’ বা সমাজসেবীদের আসল রূপ দেখে মানুষ এখন আর কোনো এনজিও বা চ্যারিটিকে বিশ্বাস করতে পারবে না। ট্রাম্প হয়তো তার রাজনৈতিক শত্রুদের ঘায়েল করেছেন, কিন্তু এর ফলে পশ্চিমা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডটাই ভেঙে গেছে। মানুষ বুঝে গেছে, পুরো সিস্টেমটাই পচে গেছে। ওপরতলায় যারা বসে আছে, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে একে অপরের কুকর্মের অংশীদার।
আমরা যা দেখছি, তা হলো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। ট্রাম্প প্রশাসন যেটুকু দেখাল, সেটুকু নিয়েই আমরা লাফালাফি করছি। কিন্তু যে ৯৫% তথ্য এখনো ‘National Security’ বা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রকাশ করা হলো না, সেখানেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য। সেই ফাইলগুলোতে হয়তো আছে বর্তমানের কোনো আরব শেখের নাম, ইউরোপের কোনো বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নাম, কিংবা সিলিকন ভ্যালির এমন কোনো সিইও-র নাম—যাদের ইশারায় কালকের শেয়ার বাজার ওঠে বা নামে। তাদের নাম প্রকাশ হবে না। কারণ তারা এখন ট্রাম্পের পকেটে। তারা এখন ‘Compromised’।
২০২৬-এর এই এপস্টিন ফাইলস রিলিজ কোনো ন্যায়বিচারের দলিল নয়। এটি হলো একুশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ‘Power Move’। ট্রাম্প প্রমাণ করলেন, তথ্যই আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর সেই অস্ত্রের ট্রিগার এখন তার আঙুলের ডগাতেই। শুরুতে যে প্রশ্নটা ছিল—বিচার নাকি ব্ল্যাকমেইল? উত্তরটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বিচারের মোড়কে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সফল ব্ল্যাকমেইল। দাবার বোর্ড সাজানো শেষ। রাজারা সব বন্দি, মন্ত্রীরা সব ভয়ে তটস্থ। আর ট্রাম্প? তিনি হাসছেন, কারণ তিনি জানেন—খেলা সবে শুরু হয়েছে।
EpsteinList #Trump2026 #Geopolitics #BillClinton #USPolitics #ConspiracyTheories

