নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সকালবেলা খবরের কাগজ খুললেই এখন আর শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে প্রতারণার খবর, অনলাইন জালিয়াতি, অচেনা নম্বর থেকে আসা ভয়ের ফোন, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় চুরির গল্প। যে অপরাধগুলো এক সময় সিনেমার গল্প মনে হতো, আজ সেগুলোই বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। আর এই বদলে যাওয়া বাস্তবতার মাঝেই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে পড়াশোনার অর্থ, বদলে যাচ্ছে পেশার সংজ্ঞা।
কয়েক বছর আগেও ভালো ভবিষ্যৎ মানে ছিল ভালো কলেজ, ভালো ডিগ্রি। কিন্তু আজ প্রশ্নটা অন্য—এই ডিগ্রি দিয়ে আপনি কী করতে পারবেন? এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড়। ঠিক এই জায়গায় এসে দক্ষতা-ভিত্তিক পড়াশোনা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আর সেটা শুধু কথার কথা নয়। দেশের বাজেট পরিকল্পনাতেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল শিক্ষা, প্রযুক্তি নির্ভর দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎমুখী প্রশিক্ষণের উপর বাড়তি জোর। শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব দক্ষতা তৈরি করাই এখন মূল লক্ষ্য।
আরও পড়ুন : জানুন, আপার প্রাইমারিতে আপনার সাফল্যের কৌশল
এই প্রেক্ষাপটেই সামনে চলে আসছে সাইবার অপরাধ ও ফরেনসিক বিজ্ঞান। কারণ অপরাধ যখন ডিজিটাল হয়ে যায়, তখন তাকে ধরার জন্যও দরকার ডিজিটাল বুদ্ধি, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আর প্রশিক্ষিত হাত। বাজেটে যখন নতুন প্রযুক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন সেটা আসলে ভবিষ্যতের এই লড়াইয়ের প্রস্তুতি। যেখানে অপরাধ আর পুলিশের মধ্যে নয়, বরং তথ্য আর বিশ্লেষণের মধ্যে যুদ্ধ হয়।
এই গল্প শুধু অপরাধ দমনের নয়, এই গল্প ভবিষ্যৎ গড়ার। এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে পড়াশোনা মানে মুখস্থ নয়, বরং সত্য খুঁজে বের করার ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতার নামই আজ ফরেনসিক বিজ্ঞান ও সাইবার অপরাধ নিয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা।
পেশা বদলাচ্ছে, কেন বদলাচ্ছে পড়াশোনার ধরণ
বর্তমান চাকরির বাজারে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে—আপনি কী জানেন, তার চেয়ে আপনি কী করতে পারেন, সেটাই আসল। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বহু প্রচলিত পেশা ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র, যেখানে বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব দক্ষতাই প্রধান যোগ্যতা।
ফরেনসিক বিজ্ঞান ও সাইবার অপরাধ নিয়ে পড়াশোনা এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এখানে শুধু তত্ত্ব জানলেই চলবে না। তথ্য বিশ্লেষণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, ডিজিটাল সূত্র খুঁজে বের করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধের উৎস শনাক্ত করা—সবকিছুই শিখতে হয় হাতে-কলমে। এই কারণেই এই ক্ষেত্র সম্পূর্ণ দক্ষতা-নির্ভর। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যের গতি বাড়াবে, কিন্তু ফরেনসিক বিজ্ঞান নিশ্চিত করবে সেই তথ্যের সত্যতা। যেখানে প্রযুক্তি সাহায্য করবে, কিন্তু দায়িত্ব নেবে মানুষই। আর এই কারণেই দক্ষতা-ভিত্তিক পড়াশোনায় ফরেনসিক বিজ্ঞান ও সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত শিক্ষা ভবিষ্যতের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফরেনসিক বিজ্ঞান কীভাবে বদলে দিচ্ছে তদন্তের ভাষা
ফরেনসিক বিজ্ঞান মানে শুধু ময়নাতদন্ত নয়—এই ভুল ধারণা এখনও অনেকের মধ্যে রয়েছে। বাস্তবে ফরেনসিক বিজ্ঞান অনেক বড় একটি জগৎ। এর মধ্যে রয়েছে জৈব প্রমাণ বিশ্লেষণ, আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ, নথি পরীক্ষা, বিষ বিশ্লেষণ, আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল তথ্যের অনুসন্ধান।
আজকের দিনে অধিকাংশ অপরাধেই কোনো না কোনোভাবে ডিজিটাল প্রমাণ জড়িত থাকে। মোবাইল ফোনের তথ্য, অবস্থান সংক্রান্ত সূত্র, অনলাইন লেনদেনের ইতিহাস—সবকিছুই অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফরেনসিক বিজ্ঞান এই সমস্ত তথ্যকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে আদালতের সামনে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য কেন এই বিষয়গুলি ভবিষ্যৎমুখী
আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন একটি সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল পরিবেশে স্বচ্ছন্দ। এই প্রজন্ম যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তবে ফরেনসিক বিজ্ঞান ও সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত পড়াশোনা তাদের জন্য শক্তিশালী ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে।
এই ক্ষেত্রগুলিতে কাজ করার সুযোগ শুধু সরকারি সংস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সংস্থা, আইন সংক্রান্ত পরামর্শদাতা সংস্থা—সব জায়গাতেই দক্ষ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের চাহিদা বাড়ছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বহুমুখী।
ফরেনসিক বিজ্ঞান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতামত
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রিয়াংশী সিং (Priyanshi Singh) ফরেনসিক সায়েন্সের জগতের রোমাঞ্চকর এবং অজানা দিকগুলো তুলে ধরেছেন। প্রিয়াংশী জানান যে ফরেনসিক সায়েন্স হলো রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের মতো বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং বিচার ব্যবস্থায় সাহায্য করা। এর মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার (Justice) নিশ্চিত করা। বর্তমানে ভারতে প্রতিদিন প্রায় ৬৭,০০০ সাইবার জালিয়াতি হচ্ছে। একটি সাধারণ প্রতারণা হলো—বাবা-মাকে ফোন করে বলা হয় যে তাদের সন্তান কোনো ধর্ষণের মামলায় ধরা পড়েছে। ফোনের ওপাশ থেকে সন্তানের কান্নার মতো কৃত্রিম শব্দ শুনিয়ে ভয় দেখানো হয় এবং টাকা হাতানো হয়। প্রিয়াংশী সবাইকে এমন অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ফরেনসিক সাইকোলজি থেকে দেখা গেছে যে একজন অপরাধীর মস্তিষ্ক সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদাভাবে কাজ করে। অপরাধ করার পর তারা একদম শান্ত থাকতে পারে, যেমন দিল্লির আফতাব পুনাওয়ালা কেস। অনেক সময় অপরাধীরা জন্মগতভাবে খারাপ হয় না, বরং তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ বা ছোটবেলার কোনো ঘটনা তাদের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
আলোচিত কয়েকটি কেসের ফরেনসিক বিশ্লেষণ
- শিণা বোরা হত্যাকাণ্ড: ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে শিণা আসলে ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়ের বোন নয়, বরং মেয়ে ছিলেন এবং তাকে ইন্দ্রাণীই হত্যা করেছিলেন।
- আরুষি তলোয়ার মামলা: এই কেসে পুলিশের গাফিলতির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। পুলিশ ফরেনসিক টিম ডাকার আগেই সাধারণ মানুষকে ঢুকতে দিয়ে এবং প্রমাণ নষ্ট করে অপরাধস্থল (Crime Scene) নষ্ট করে ফেলেছিল।
- নির্ভয়া মামলা (২০১২): এই মামলায় অপরাধীদের ধরতে ফরেনসিক ওডোনটোলজি (Forensic Odontology) বা দাঁতের ছাপের পরীক্ষা খুব বড় ভূমিকা রেখেছিল। ভিকটিমের শরীরে কামড়ের দাগ থেকে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
ফরেনসিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা
প্রিয়াংশী সিং ফরেনসিকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কথা বলেন:
- ব্যালিস্টিকস (Ballistics): বন্দুক ও গুলির পরীক্ষা।
- টক্সিকোলজি (Toxicology): শরীরে বিষ বা ড্রাগসের উপস্থিতি পরীক্ষা।
- ডিজিটাল ফরেনসিক: মোবাইল, কম্পিউটার বা ইন্টারনেট সম্পর্কিত অপরাধের তদন্ত।
- ডিএনএ প্রোফাইলিং: রক্ত, চুল বা অন্য কোনো নমুনা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে অপরাধীকে শনাক্ত করা।
ভারতে অপরাধের ধরন যত আধুনিক হচ্ছে, ফরেনসিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব তত বাড়ছে। সরকারও ধীরে ধীরে এই বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছে। বিভিন্ন জেলায় ফরেনসিক দল গঠন, বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো উন্নয়ন—এই সব উদ্যোগ ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজকের পৃথিবীতে অপরাধ শুধু শক্তির লড়াই নয়, এটি বুদ্ধির লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে জিততে হলে দরকার বিজ্ঞান, দক্ষতা এবং নৈতিকতা। ফরেনসিক বিজ্ঞান সেই তিনেরই সমন্বয়। এই বিষয়ে পড়াশোনা করলে একজন শিক্ষার্থী শিখতে পারে কীভাবে প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়, কীভাবে তা সংরক্ষণ করতে হয়, কীভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এই দক্ষতাগুলি শুধু অপরাধ তদন্তেই নয়, বরং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতেও সাহায্য করে।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

