স্বর্ণলঙ্কা কি সত্যিই রাবণের ছিল? জানুন সৎ ভাই কুবেরকে ছলনা করে রাবণের সিংহাসন দখলের নেপথ্য কাহিনী এবং Golden Lanka History-র পাতায় লুকিয়ে থাকা এক পারিবারিক ষড়যন্ত্রের উপাখ্যান।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : “লঙ্কা দহন”-এর কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগুনের লেলিহান শিখা আর হনুমানের আস্ফালন। কিন্তু সেই লঙ্কা কেমন ছিল? বাল্মীকি রামায়ণে বলা হয়েছে, লঙ্কার দেওয়াল ছিল সোনার তৈরি, প্রাসাদের সিঁড়িগুলো ছিল হীরে-মানিক্য দিয়ে বাঁধানো। এমন ঐশ্বর্য স্বর্গের অমরাবতীকেও হার মানাত।
আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি, লঙ্কার রাজা রাবণ। তাঁকে বলা হয় ‘লঙ্কেশ্বর’। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, যে রাবণ জন্মসূত্রে ছিলেন এক ঋষির সন্তান, তিনি হঠাৎ করে এত বড় সোনার শহরের মালিক হলেন কীভাবে? তিনি কি এই শহর তৈরি করেছিলেন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক জবরদখলের ইতিহাস?
ইতিহাস বা পুরাণ ঘাঁটলে দেখা যায়, রাবণ আসলে লঙ্কার স্থপতি বা প্রথম রাজা ছিলেন না। এই স্বর্ণনগরীর আসল মালিক ছিলেন তাঁরই বড় ভাই—ধনপতি কুবের। কিন্তু ক্ষমতার লোভ আর মায়ের ঈর্ষা কীভাবে এক ভাইকে আরেক ভাইয়ের শত্রুতে পরিণত করল, সেই গল্প আজ আপনাদের শোনাব। এ এক এমন কাহিনী, যেখানে রক্তের সম্পর্ক হার মেনেছিল সোনার জৌলুস আর ক্ষমতার কাছে।
৩. ঋষি বিশ্রবা ও দুই মায়ের গল্প
গল্পের শুরুটা হয়েছিল লঙ্কা থেকে অনেক দূরে। প্রজাপতি পুলস্ত্যের পুত্র ছিলেন মহর্যি বিশ্রবা। তিনি ছিলেন পরম জ্ঞানী ও তপস্বী। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন মহর্যি ভরদ্বাজের কন্যা ইড়াবিড়া। তাঁদের পুত্রের নাম বৈশ্রবণ বা কুবের।
কুবের ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ এবং শান্ত স্বভাবের। তিনি কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে ‘ধনপতি’ হওয়ার বর এবং দিকপাল হওয়ার সম্মান লাভ করেছিলেন। শিবের আশীর্বাদে তিনি লঙ্কার অধিপতি হন। তাঁর রাজত্বে লঙ্কা হয়ে উঠেছিল আনন্দের স্বর্গ। সেখানে রাক্ষসদের ভয় ছিল না, ছিল যক্ষদের সমৃদ্ধি। কুবেরের বাহন ছিল আকাশ পথে চলা ‘পুষ্পক বিমান’।
অন্যদিকে, সুমালী নামক এক রাক্ষস চাইছিল তার বংশের কেউ বিশ্ব শাসন করুক। সে তার সুন্দরী কন্যা কৈকেসীকে পাঠাল ঋষি বিশ্রবার কাছে। কৈকেসীর রূপে মুগ্ধ হয়ে ঋষি তাকে বিবাহ করেন। এই কৈকেসীর গর্ভেই জন্ম হয় দশানন রাবণ, কুম্ভকর্ণ এবং বিভীষণের।
একই পিতার সন্তান হলেও, দুই মায়ের ভিন্ন শিক্ষার কারণে কুবের হলেন দেবতা, আর রাবণ হলেন রাক্ষস প্রবৃত্তির।
৩. মায়ের ঈর্ষা ও রাবণের প্রতিজ্ঞা
বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ড-এ একটি চমৎকার দৃশ্যের বর্ণনা আছে। একদিন কুবের তাঁর পুষ্পক বিমানে চড়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। সেই বিমানের জৌলুস আর কুবেরের গায়ে হীরে-জহরত দেখে কৈকেসীর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ঈর্ষায় তাঁর বুক জ্বলে উঠল।
কুবের চলে যাওয়ার পর কৈকেসী রাবণকে ডেকে বললেন, “দেখলি তোর ভাইয়ের ঠাটবাট? একই ঋষির সন্তান হয়ে ও আজ স্বর্গের সমান সুখ ভোগ করছে, আর তোরা রাক্ষস হয়ে বনে-জঙ্গলে ঘুরে মরছিস। ধিক্কার তোদের শক্তিতে! তুই যদি কুবেরের চেয়ে বড় হতে না পারিস, তবে তুই আমার সন্তান নস।”
মায়ের এই কটু কথা রাবণের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সেই মুহূর্তেই রাবণের মনে বপন করা হলো ভাই কুবেরের প্রতি ঘৃণার বীজ। রাবণ প্রতিজ্ঞা করলেন, তিনি কুবেরের চেয়েও বড় হবেন। শুরু হলো এক কঠোর তপস্যা। হাজার হাজার বছর ধরে রাবণ ব্রহ্মার আরাধনা করলেন এবং শেষমেশ অমরত্বের কাছাকাছি এক বর চেয়ে নিলেন—যেখানে দেবতা, দানব, গন্ধর্ব বা যক্ষ কেউ তাঁকে মারতে পারবে না (তিনি তুচ্ছ ভেবে মানুষ ও বানরের কথা উল্লেখ করেননি)।
৩. লঙ্কা দখল: অধিকার নাকি গায়ের জোর?
বর পাওয়ার পর রাবণের শক্তি তখন আকাশছোঁয়া। তিনি সোজা লঙ্কায় ফিরে এলেন। তবে এবার আর তিনি একা নন, সঙ্গে নিলেন রাক্ষস সেনাপতি প্রহস্তকে। রাবণ কুবেরের কাছে দূত পাঠালেন। বার্তা স্পষ্ট—”লঙ্কা নগরী আগে রাক্ষসদের (রাবণের মামা সুমালী ও মাল্যবানদের) ছিল। বিষ্ণুর ভয়ে তারা পালিয়েছে। এখন আমি ফিরে এসেছি। তাই ভালোয় ভালোয় লঙ্কা খালি করে দাও, নইলে যুদ্ধ হবে।”
শান্তিপ্রিয় কুবের হতভম্ব হয়ে গেলেন। ছোট ভাই আজ সিংহাসন চাইছে! তিনি ছুটে গেলেন পিতা বিশ্রবার কাছে। সব শুনে ঋষি বিশ্রবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “পুত্র, রাবণ এখন বরের অহংকারে মত্ত। তার হাতে এখন অসীম শক্তি। তুমি তার সঙ্গে যুদ্ধে পারবে না। আর ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙানো তোমার মতো ধর্াত্মার সাজে না। তুমি লঙ্কা ত্যাগ করো। মহাদেব কৈলাসে তোমার জন্য আরও সুন্দর স্থান ‘অলকাপুরী’ নির্মাণ করবেন।”
পিতার আদেশে এবং রক্তক্ষয় এড়াতে কুবের লঙ্কা ত্যাগ করলেন। তিনি সঙ্গে নিলেন শুধু তাঁর অনুগত যক্ষদের। লঙ্কার সিংহাসন, স্বর্ণপ্রাসাদ, ঐশ্বর্য—সব পড়ে রইল রাবণের জন্য।
৩. স্বর্ণলঙ্কার অভিশাপ ও পতন
রাবণ বিনা যুদ্ধে লঙ্কা জয় করলেন। তিনি নিজেকে ‘লঙ্কেশ্বর’ ঘোষণা করলেন। এমনকি কুবেরের প্রিয় ‘পুষ্পক বিমান’টিও তিনি কেড়ে নিলেন। লঙ্কা রাবণের শাসনে আরও সুন্দর হয়ে উঠল ঠিকই, কিন্তু এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল অধর্ম, লোভ আর বঞ্চনার ওপর।
শাস্ত্র বলে, ‘পরের ধন হরণ করে কেউ কোনোদিন সুখী হতে পারে না।’ রাবণের ক্ষেত্রেও তাই হলো। যেই লঙ্কা তিনি ভাইয়ের থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন, সেই লঙ্কাই শেষ পর্যন্ত ছারখার হয়ে গেল। কুবের লঙ্কা ছেড়ে কৈলাসে গিয়ে শিবের সখা বা বন্ধু হলেন এবং ধনের দেবতা হিসেবে পূজিত হলেন। আর রাবণ? এত ঐশ্বর্য আর ক্ষমতার পরেও তাঁকে মরতে হলো ‘নর’ বা মানুষের (শ্রীরামচন্দ্র) হাতে, যাঁকে তিনি তুচ্ছ ভেবেছিলেন।
রাবণ ও কুবেরের এই Ravana vs Kuber Story আমাদের এক চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেটি হলো—উত্তরাধিকার সূত্রে বা গায়ের জোরে হয়তো সোনার শহর পাওয়া যায়, কিন্তু শান্তি পাওয়া যায় না। কুবের লঙ্কা হারিয়েও ‘ধনপতি’ আর ‘দেবতা’ হয়ে রইলেন, আর রাবণ লঙ্কা পেয়েও ইতিহাসে ‘খলনায়ক’ হয়ে রইলেন। স্বর্ণলঙ্কার ইতিহাস আমাদের শেখায়, অন্যের অধিকার কেড়ে গড়ে তোলা প্রাসাদে জৌলুস থাকতে পারে, কিন্তু তার আয়ু বেশিদিন হয় না। অহংকারের আগুনে তা একদিন না একদিন পুড়ে ছাই হবেই।
#mythologicalstory , #ramayana #indianepic
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

