Gopal Mukherjee History: গোপাল মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে আজও ইতিহাসে মতভেদ রয়েছে। ১৯৪৬ সালের রক্তাক্ত কলকাতা, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও বিতর্কের আলোকে এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবসের পবিত্র উপলক্ষে কলকাতা পুরসভার গৃহীত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসের একটি দীর্ঘদিনের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জী রোড’ রাখা হবে। বহু দশক ধরে কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এমন এক ব্যক্তির নামে ছিল, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন এবং নিরীহ নাগরিকদের গণহত্যার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, শ্রী গোপাল মুখার্জীর নামে এই সড়কের নামকরণ করা হচ্ছে—যাঁকে অনেকেই সেই সংকটময় সময়ে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসা এক নির্ভীক রক্ষাকর্তা হিসেবে স্মরণ করেন। তাঁর নামে এই নামকরণ ইতিহাসের ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং একজন প্রকৃত রক্ষক ও ত্রাণকর্তাকে যথাযোগ্য সম্মান জানানোর প্রচেষ্টা বলেও অনেকে মনে করেন। এবার সময় এসেছে পশ্চিমবঙ্গ তার প্রকৃত নায়কদের স্মরণ করুক, ইতিহাসের ভুলগুলো সংশোধন করুক এবং তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানাক।
“সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি মন্তব্য নতুন করে ইতিহাসের এই অধ্যায়কে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তিনি গোপাল মুখোপাধ্যায়কে ‘প্রকৃত নায়ক’ আখ্যা দিয়ে তাঁর প্রতি সম্মান জানানোর কথা বলেন। শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যাঁকে তিনি প্রকৃত নায়ক বলে উল্লেখ করলেন, সেই গোপাল মুখোপাধ্যায় আসলে কে? ইতিহাসে তাঁর অবদান কী? কেন প্রায় আট দশক পরেও তাঁকে ঘিরে বিতর্ক, আলোচনা ও আবেগ সমানভাবে বিদ্যমান? আজ আমরা ফিরে দেখব সেই ইতিহাস।”
ভারত বিভাগের ইতিহাসে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট এক বিভীষিকাময় দিন। সেদিন মুসলিম লীগের ঘোষিত প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘিরে কলকাতায় শুরু হয় এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যা ইতিহাসে গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নামে পরিচিত। মাত্র চার দিনের মধ্যে শহর পরিণত হয় মৃত্যু, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নৃশংসতার নগরীতে। সরকারি হিসাবে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হলেও বহু গবেষক মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি ছিল।
এই দাঙ্গা শুধু কলকাতাকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি; পরবর্তী সময়ে নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পথও প্রশস্ত করেছিল।
কেন ডাকা হয়েছিল প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস?
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি শুরু করে। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়। মুসলিম লীগ পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে অনড় অবস্থান নেয়।
এরই প্রেক্ষিতে ২৯ জুলাই ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের কাউন্সিল সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ১৬ আগস্ট পালন করা হবে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের দাবির পক্ষে সর্বাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
সে সময় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর সরকার ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতি দাঙ্গা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল।
কীভাবে শুরু হয় রক্তক্ষয়?
১৬ আগস্ট সকালে কলকাতার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিশাল মিছিল শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়। সভা শেষে বহু জায়গায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ শুরু হলেও খুব দ্রুত তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেয়।
দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নিরীহ মানুষের উপর হামলা এবং হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়ে পড়ে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা কার্যত ভেঙে পড়ে।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে সেনাবাহিনী নামানোর পরও সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক দিন সময় লাগে।
মৃত্যু ও ধ্বংসের হিসাব
সরকারি হিসাবে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। বহু স্বাধীন গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাজার হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়। লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। কলকাতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন এই ঘটনার অভিঘাত বহন করে।
গোপাল পাঠার নাম কেন আলোচনায় আসে?
দাঙ্গার সময় উত্তর কলকাতায় গোপাল মুখোপাধ্যায়, যিনি “গোপাল পাঠা” নামে পরিচিত ছিলেন, হিন্দু মহল্লাগুলির প্রতিরক্ষায় সংগঠিত ভূমিকা নেন বলে বহু সমসাময়িক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
সমর্থকদের মতে, তিনি অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর নেতৃত্বাধীন দলও পাল্টা সহিংস ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল। ফলে ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা আজও বিতর্কিত এবং বিভিন্ন গবেষক ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন করেছেন।
ইতিহাসের শিক্ষা
কলকাতার ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সংঘাত যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কয়েক দিনের সহিংসতা হাজার হাজার পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছিল।
এই ঘটনাকে বুঝতে হলে কেবল একটি পক্ষের বক্তব্য নয়, সরকারি নথি, সমসাময়িক সংবাদপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং আধুনিক ইতিহাসবিদদের গবেষণা—সব দিক বিবেচনা করা জরুরি।
ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আইনের শাসন এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই।

