India Economy: ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হয়েও কেন বিশ্ব তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে ভারত, কীভাবে বদলে গেল দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান এবং এর নেপথ্যে রয়েছে কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণ?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: এক বছর আগেও ছবিটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের পূর্বাভাস বলেছিল, জাপানকে পিছনে ফেলে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির আসনে উঠে আসতে পারে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সেই হিসাব বদলে গিয়েছে। ভারতের অর্থনীতি বড় হয়েছে, প্রবৃদ্ধিও শক্তিশালী রয়েছে, তবু বৈশ্বিক অর্থনীতির তালিকায় ভারত এখন ষষ্ঠ স্থানে। সামনে রয়েছে জাপান এবং ব্রিটেন।
বিষয়টি প্রথম নজরে ধাক্কা দেওয়ার মতো। কারণ ভারতের নামমাত্র মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ এখনও প্রায় ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলার। তাহলে অর্থনীতি যখন বাড়ছে, তখন বিশ্বের বড় অর্থনীতির তালিকায় ভারতের অবস্থান পিছিয়ে গেল কেন? আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে মুদ্রার বিনিময়মূল্য, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের নতুন হিসাব এবং ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফলাফলের মধ্যে। এই পরিবর্তন ভারতের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন সরল অর্থ বহন করে না। বরং এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, ডলারে মাপা অর্থনীতির আকার কতটা মুদ্রার দামের ওপর নির্ভরশীল।
এক বছরেই চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্থানে ভারত
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের শেষে ভারতের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪.১৮৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। সেই হিসাবে জাপানের প্রায় ৪.১৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে সামান্য পিছনে ফেলে ভারত চতুর্থ স্থানে উঠে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তখন ব্রিটেনের অর্থনীতির সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছিল প্রায় ৩.৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের নতুন পূর্বাভাসে হিসাব সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের শেষে ভারতের নামমাত্র অর্থনীতির আকার প্রায় ৩.৯১৬ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে। একই সময়ে ব্রিটেনের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪.০০৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং জাপানের প্রায় ৪.৪৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। ফলে ভারত চতুর্থ স্থানে ওঠার বদলে ষষ্ঠ স্থানে চলে যায়।
তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে—ভারতের অর্থনীতির বাস্তব অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ হঠাৎ ভেঙে পড়েছে, এমন তথ্য এই হিসাব থেকে পাওয়া যায় না। বরং ডলারের হিসাবে অর্থনীতির আকার নির্ধারণ করার সময় মুদ্রার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন বড় ভূমিকা পালন করেছে।
আসল ধাক্কা টাকার দামে
ভারতের ষষ্ঠ স্থানে নেমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে রুপির অবমূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এক ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ছিল প্রায় ৮৪.৫৭ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৮৮.৪৮ টাকায় পৌঁছয় এবং ২০২৬ সালের জন্য হিসাব করা হয়েছে প্রায় ৯২.৫৯ টাকা। অর্থাৎ একই পরিমাণ ভারতীয় অর্থকে ডলারে রূপান্তর করলে তার মূল্য কম দেখায়।
এখানেই রয়েছে গোটা বিষয়টির বড় রহস্য। ধরুন, ভারতে টাকার হিসাবে উৎপাদন, পরিষেবা এবং ব্যবসা বাড়ছে। কিন্তু একই সময়ে যদি রুপির মূল্য ডলারের তুলনায় কমে যায়, তাহলে সেই বিশাল অর্থনীতিকে ডলারে হিসাব করলে তার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে ছোট দেখাতে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির তালিকাটি যেহেতু ডলারে নামমাত্র মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ভিত্তিতে তৈরি হয়, তাই রুপির দামের ওঠানামা সরাসরি ভারতের অবস্থানে প্রভাব ফেলে।
নতুন হিসাব পদ্ধতিতেও বদলে গেল অর্থনীতির আকার
শুধু টাকার দাম নয়, ভারতের জাতীয় আয়ের হিসাবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিত্তিবর্ষ এবং সংশোধিত পদ্ধতিতে অর্থনীতির নামমাত্র আকারের হিসাব করা হয়েছে। এর ফলে টাকার হিসাবে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ আগের হিসাবের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে।
পুরনো ২০১১-১২ ভিত্তিবর্ষের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রায় ৩৫৭.১৪ লক্ষ কোটি টাকা হিসেবে ধরা হয়েছিল। নতুন হিসাব পদ্ধতিতে সেই একই সময়ের পরিমাণ প্রায় ৩৪৫.৪৭ লক্ষ কোটি টাকা হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানের ভিত্তি ও পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে নামমাত্র অর্থনীতির আকারেও এককালীন সংশোধন এসেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশের কারখানা, পরিষেবা, কৃষি, ব্যবসা কিংবা মানুষের বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একই অনুপাতে কমে গিয়েছে। বরং নতুন পদ্ধতি অর্থনীতির আকারকে আরও নির্ভুলভাবে মাপার চেষ্টা করছে। তাই ডলারের হিসাবে রুপির অবমূল্যায়নের প্রভাবের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানগত সংশোধন যুক্ত হয়ে ভারতের অবস্থানে বড় পরিবর্তন এনেছে।
ব্রিটেন কীভাবে ভারতকে পিছনে ফেলল?
ভারতের ষষ্ঠ স্থানে চলে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্রিটেনের প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফলাফল। আগের হিসাব অনুযায়ী ব্রিটেন ভারতের তুলনায় বেশ পিছনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নতুন পূর্বাভাসে ব্রিটেনের নামমাত্র অর্থনীতির আকার বেড়ে প্রায় ৪.০০৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্যও ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে।
ব্রিটেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনের প্রবৃদ্ধি ০.৫ শতাংশ হয়েছে, যেখানে আগে ০.১ শতাংশের পূর্বাভাস ছিল। ফলে ভারতের রুপির দুর্বলতার বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ডের তুলনামূলক শক্ত অবস্থানও দুই দেশের ডলারে হিসাব করা অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থাৎ শুধু ভারত পিছিয়ে যায়নি; একই সঙ্গে ব্রিটেনও প্রত্যাশার তুলনায় ভালো করেছে। এই দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলেই ভারতের ষষ্ঠ স্থানে নেমে যাওয়ার ছবিটি আরও পরিষ্কার হয়।
তাহলে কি ভারতের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে?
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এবং বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধুমাত্র বৈশ্বিক তালিকায় ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ হওয়া মানেই ভারতের অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে গিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রায় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এখনও শক্তিশালী।
আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের ২০২৬ সালের এপ্রিলের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, ভারতের বর্তমান মূল্যে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ২০২৪ সালে প্রায় ৩১৮ লক্ষ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৩৪৬.৫ লক্ষ কোটি এবং ২০২৬ সালে প্রায় ৩৮৪.৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ দেশীয় মুদ্রায় নামমাত্র প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট শক্তিশালী রয়েছে।
এমনকি ২০২৬ সালের জন্য ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৬.৫ শতাংশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৭.৬ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক তালিকায় অবস্থান বদলালেও ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্প পুরোপুরি থেমে যায়নি।
এই কারণেই অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ভারতের বর্তমান অবস্থান মূলত কারিগরি ও মুদ্রা-নির্ভর পরিবর্তনের ফল। বাস্তব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ডলারে মাপা অর্থনীতির আকার—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়।
তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির স্বপ্ন কি পিছিয়ে গেল?
ভারতের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ শুধু চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির আসন নয়, দীর্ঘমেয়াদে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পৌঁছনোর লক্ষ্যও রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের পূর্বাভাসে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার মনে করেছিল, এই দশকের শেষের দিকে জার্মানিকে পিছনে ফেলে ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের নতুন হিসাব সেই সময়সীমা কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। এখন ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষের দিকে তৃতীয় স্থানে ওঠার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
তবে এখানেও রুপির মূল্য বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধি যদি শক্তিশালী থাকে কিন্তু রুপির অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকে, তাহলে ডলারে পরিমাপ করা অর্থনীতির আকার প্রত্যাশার তুলনায় ধীরে বাড়তে পারে। ফলে বিশ্বের অর্থনীতির তালিকায় উপরে ওঠার গতি কমে যেতে পারে।
ব্যাংক অব বরোদার প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সবনভিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারত আগামী বছরগুলিতে অন্যান্য বড় অর্থনীতির তুলনায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক তালিকায় ভারতের অবস্থান শেষ পর্যন্ত রুপির মূল্যের ওপরও নির্ভর করবে।
সামনে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
ভারতের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, রুপির অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অস্থিরতা, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ, জ্বালানির দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি টাকার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
ভারতের অর্থনীতি মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও দেশীয় প্রবৃদ্ধির ওপর শক্ত ভিত তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক ধাক্কা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। উচ্চ শুল্ক, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে গেলে রুপির ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং তেলের দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকলে রুপিও কিছুটা সমর্থন পেতে পারে। ফলে বর্তমান ষষ্ঠ স্থানকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ভারতের অর্থনীতি ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেও কেন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হতে পারল না—তার উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। রুপির অবমূল্যায়ন, নতুন ভিত্তিবর্ষে অর্থনীতির হিসাবের সংশোধন এবং ব্রিটেনের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ভারতের অবস্থান বদলে দিয়েছে।
তাই ষষ্ঠ স্থানে নেমে যাওয়া মানেই ভারতের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে—এমন নয়। বরং দেশীয় মুদ্রায় প্রবৃদ্ধি এখনও শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ২০২৬ সালের জন্য ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে নতুন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবর্ষে ভারত আবার ব্রিটেন ও জাপানকে পেরিয়ে চতুর্থ স্থানে উঠতে পারে।
#IndiaEconomy #IndianEconomy #IndiaGDP #EconomicGrowth #GlobalEconomy #WorldEconomy #GDPRanking #IndiaNews #EconomicNews
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?
১লা আগস্ট থেকে স্কুলের খাবারের দায়িত্ব ইস্কনের, ডিম বিতরণ, ও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা

