নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু বিপদের দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া নয়। কখনও সেই সাহায্য কোনও পড়ুয়ার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে এগিয়ে দেয়। কখনও কঠিন সময়ে ভরসা হয়ে ওঠে কোনও পরিবারের। আবার কখনও সামান্য আর্থিক সহায়তাই চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে বড় ভূমিকা নেয়। সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমনই কয়েকটি উদ্যোগের কথা সামনে আনল অখিল ভারতবর্ষীয় খণ্ডেলওয়াল বৈশ্য মহাসভা। সংগঠনের দাবি, গত তিন বছরে শিক্ষা, নারীকল্যাণ ও চিকিৎসা সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। রাজস্থানের ভরতপুরে সংগঠনের জাতীয় বৈঠকে এই হিসাব তুলে ধরেন সভাপতি রমেশচন্দ্র খণ্ডেলওয়াল।
এই ঘোষণার পাশাপাশি বৈঠকে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। সমাজের উন্নয়নে শুধু আর্থিক সাহায্যই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানুষের মধ্যে ঐক্য, পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান এবং নেতৃত্বে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ। সেই ভাবনা থেকেই আগামী দিনে নারীসম্মেলনের আয়োজন এবং সংগঠনের শীর্ষ পদে মহিলাদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর ভরতপুরে আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক ডঃ সুভাষ গর্গ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের আলোচনায় শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তার পাশাপাশি উঠে এসেছে সমাজের ভবিষ্যৎ পথচলার প্রশ্নও।
উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সাহায্য দেওয়ার বিষয়টি এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান দিক। সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় সহায়তার জন্য প্রায় ২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বৃত্তির মাধ্যমে আরও প্রায় ১০ লক্ষ টাকার সাহায্য করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যাঁরা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের কাছে এই ধরনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে কতজন পড়ুয়া এই সুবিধা পেয়েছেন, কিংবা কোন কোন শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব বিজ্ঞপ্তিতে নেই।
শিক্ষার পাশাপাশি নারীকল্যাণেও বড় অঙ্কের সহায়তার কথা জানিয়েছে মহাসভা। গত তিন বছরে প্রয়োজনমতো মহিলাদের জন্য প্রায় ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনের দাবি। চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। এই অর্থ কীভাবে বণ্টন করা হয়েছে, কতজন উপকৃত হয়েছেন এবং সহায়তা পাওয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতি কী, সে বিষয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করা হলে উদ্যোগটির পরিসর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
মোট সহায়তার অঙ্ক হিসেবে ৩ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকার কথা জানানো হলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা তিনটি খাতের অঙ্ক যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৩ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ঘোষিত মোট অঙ্কের সঙ্গে হিসাবের সামান্য পার্থক্য রয়েছে। এই কারণেই আর্থিক সহায়তার পরিসংখ্যানকে সংগঠনের দেওয়া তথ্য হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
বৈঠকে ভরতপুরের বিধায়ক ডঃ সুভাষ গর্গ সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য বাড়ানোর কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আগরওয়াল, খণ্ডেলওয়াল, বিজয়বর্গীয়, জৈন ও মাহেশ্বরী-সহ বৈশ্য সমাজের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ। তাঁর মতে, কোনও সামাজিক সমস্যা বা বিপদ দেখা দিলে সকলে একসঙ্গে এগিয়ে এলে তার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈশ্য সমাজের শক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আরও সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সমাজের মানুষের সমস্যা প্রশাসন ও সরকারের কাছে সম্মিলিতভাবে তুলে ধরলে তার সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতে পারে বলে তাঁর মত। একই সঙ্গে মহাসভার সভাপতি রমেশচন্দ্র খণ্ডেলওয়ালকে শিক্ষা, নারীকল্যাণ ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় সংগঠনের কাজের জন্য অভিনন্দন জানান তিনি।
তবে বৈঠকের আলোচনা শুধু অর্থের হিসাব কিংবা সামাজিক ঐক্যের আহ্বানে থেমে থাকেনি। পরিবারের ভিত শক্ত করার কথাও উঠে এসেছে। সভাপতি রমেশচন্দ্র খণ্ডেলওয়াল অভিভাবকদের সন্তানদের মধ্যে ভালো মূল্যবোধ গড়ে তোলার উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান এবং দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং খাম দেওয়ার প্রচলিত রীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথাও বলেছেন তিনি। পুত্রবধূকে পরিবারের মেয়ের মতো মর্যাদা দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন। বিবাহে দেরি ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলেও সংগঠনের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে। আন্তঃজাতি বিবাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এই বিষয়গুলির ক্ষেত্রে কোনও পরিসংখ্যান বা বিস্তারিত সমীক্ষার তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে এগুলিকে বৈঠকে প্রকাশিত মতামত হিসেবেই দেখা উচিত।
সমাজের নেতৃত্বে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ভাবনাটিও এই বৈঠকের উল্লেখযোগ্য দিক। ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে একটি নারীসম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে মহাসভা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংগঠনের সভাপতির পদে কোনও মহিলাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও উঠে এসেছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হতে পারে।
এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মহাসভার প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রপ্রকাশ খণ্ডেলওয়াল এবং বিভিন্ন স্তরের সংগঠক ও সদস্যরা। রাজস্থান ছাড়াও হরিয়ানা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ছত্তীসগঢ়, ঝাড়খণ্ড, অসম, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। কলকাতা, দিল্লি, আমদাবাদ, হায়দরাবাদ, রতলাম, মুম্বই এবং রাজনন্দগাঁওয়ের মতো শহর থেকেও সদস্যরা যোগ দেন।
অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সিকিমের রুদ্রাক্ষ দেওয়া হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। ভরতপুর খণ্ডেলওয়াল যুব সমাজের মহিলা কার্যকরী সমিতি মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অর্থাৎ, আর্থিক সহায়তার আলোচনা ছাড়াও সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকে জায়গা দেওয়া হয়েছিল এই আয়োজনে।
একটি সংগঠনের কাজের মূল্য শুধু ঘোষিত অনুদানের অঙ্কে মাপা যায় না। সেই সাহায্য কতজনের কাছে পৌঁছল, কতটা প্রয়োজন মেটাতে পারল এবং আগামী দিনে তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খণ্ডেলওয়াল বৈশ্য মহাসভার ঘোষিত উদ্যোগগুলির ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্নগুলি প্রাসঙ্গিক। শিক্ষা, নারীকল্যাণ ও চিকিৎসা সহায়তার যে হিসাব সংগঠন সামনে এনেছে, তার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা নজরে থাকবে।

