চোখ বন্ধ করলেই কি মনের ঝড় থামে? নাকি যাদের মনে ট্রমা বা চাপা কষ্ট আছে, তাদের জন্য ধ্যান হয়ে উঠতে পারে আরও ভয়াবহ? জানুন কী বলছেন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা। সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররা বলেন “১০ মিনিট মেডিটেশন করুন, ডিপ্রেশন গায়েব হয়ে যাবে (Meditation Side Effects)।” কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এটি সবার জন্য ‘ম্যাজিক পিল’ নয়। কাদের জন্য ধ্যান নিষিদ্ধ? পড়ুন বিস্তারিত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: অফিসের কাজের চাপ আর ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনে অয়নের (নাম পরিবর্তিত) ঘুম আসছিল না বেশ কিছুদিন। ইউটিউবে এক মোটিভেশনাল স্পিকারের ভিডিও দেখে সে ঠিক করল, এবার থেকে রোজ সকালে মেডিটেশন বা ধ্যান করবে।
প্রথম দিন ভোরে উঠে পদ্মাসনে বসল অয়ন। চোখ বন্ধ করল। আশা ছিল, এক অনাবিল শান্তি তাকে ঘিরে ধরবে। কিন্তু হলো ঠিক উল্টোটা। চোখ বন্ধ করার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল, দম বন্ধ লাগতে শুরু করল। পুরনো কিছু খারাপ স্মৃতি—যা সে ভুলতে চেয়েছিল—হঠাৎ সিনেমার মতো ভেসে উঠল। শান্তি তো দূর, উল্টে এক তীব্র আতঙ্ক বা প্যানিক অ্যাটাক নিয়ে মেডিটেশন শেষ করল সে।
অয়ন ভাবল, “নিশ্চয়ই আমারই দোষ। আমি হয়তো মনটাকে বশ করতে পারছি না।” কিন্তু অয়ন একা নয়। এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো—এটা তার দোষ নয়।
আধুনিক ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রিতে মেডিটেশনকে সব রোগের ‘রামবাণ’ (Panacea) হিসেবে বিক্রি করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এক অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনেছে। গবেষণা বলছে, মেডিটেশন সবার জন্য কাজ করে না; বরং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন এবং সাইকোলজিক্যাল ট্রমা বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণার ফল: মুদ্রার উল্টো পিঠ (What The Research Says)
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির (Brown University) সাইকিয়াট্রি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. উইলোবি ব্রিটন (Dr. Willoughby Britton) দীর্ঘ সময় ধরে মেডিটেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণা সংস্থা ‘The Varieties of Contemplative Experience’ (VCE)-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত মেডিটেশনকারীদের মধ্যে একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
২০১৭ সালে কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি (Coventry University)-র একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১২ জন মানুষের মধ্যে ১ জন মেডিটেশন করার পর মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগে ভোগেন।
কেন এমন হয়? এর পেছনে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা কী?
১. ট্রমা যখন ফিরে আসে (The Trauma Trap)
আমাদের অনেকের মনের গভীরে পুরনো আঘাত বা ট্রমা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। আমরা দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততায় সেগুলোকে চাপা দিয়ে রাখি। মেডিটেশনের সময় যখন আমরা বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভেতরের দিকে তাকাই (Introspection), তখন সেই প্রতিরক্ষা দেওয়াল ভেঙে যায়।
২. রিল্যাক্সেশন ইনডিউসড অ্যাংজাইটি (Relaxation Induced Anxiety)
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্য—কিছু মানুষের শরীর ‘শান্ত’ হতে ভয় পায়। যারা দীর্ঘদিনের ক্রনিক স্ট্রেস বা উদ্বেগে ভুগছেন, তাদের শরীর সবসময় ‘Fight or Flight’ মোডে থাকে। হঠাৎ করে মেডিটেশনের মাধ্যমে শরীরকে শিথিল করার চেষ্টা করলে, মস্তিষ্ক সেটাকে ‘বিপদ’ বলে মনে করে এবং উল্টে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়। ফলে বুক ধড়ফড়ানি বা ঘাম হতে শুরু করে।
৩. বিচ্ছিন্নতাবোধ (Dissociation)
ডা. উইলোবি ব্রিটনের গবেষণায় উঠে এসেছে আরও একটি সমস্যার কথা—ডিসোসিয়েশন। অতিরিক্ত বা ভুল পদ্ধতিতে মেডিটেশন করলে অনেকের মনে হয়, “আমি আমার শরীরে নেই” বা “পৃথিবীটা সত্যি নয়।” এই অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
কাদের জন্য মেডিটেশন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের সমস্যাগুলো থাকলে চোখ বন্ধ করে ধ্রুপদী ধ্যান (Classical Meditation) করার আগে সাবধান হওয়া উচিত:
- যাদের তীব্র ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার আছে।
- যাদের অতীতে কোনো বড় ট্রমা বা পিটিএসডি (PTSD) আছে।
- যারা হ্যালুসিনেশন বা সিজোফ্রেনিয়ার রোগী।
তাহলে সমাধান কী? মেডিটেশন কি খারাপ? (The Solution)
না, মেডিটেশন খারাপ নয়। প্যারাসিটামল যেমন জ্বরের ওষুধ কিন্তু পেটের ব্যথায় কাজ করে না, তেমনি মেডিটেশনও একটি টুল বা যন্ত্র মাত্র। এটি সবার জন্য নয়।
যাদের চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে অস্বস্তি হয়, নিউজ অফবিট তাঁদের জন্য নিয়ে এসেছে মেডিটেশনের কিছু ‘অফবিট বিকল্প’, যা সমান কার্যকরী কিন্তু নিরাপদ:
১. ওয়াকিং মেডিটেশন (Walking Meditation): চুপ করে বসে থাকার দরকার নেই। প্রকৃতির মাঝে ধীর গতিতে হাঁটুন। পায়ের সঙ্গে মাটির স্পর্শ অনুভব করুন। এটি মনকে শান্ত করে কিন্তু ট্রমা জাগিয়ে তোলে না।
২. ফ্লো স্টেট (Flow State Activities): বাগান করা, ছবি আঁকা, রান্না করা বা মাটির কাজ—যে কাজটা আপনি মন দিয়ে করেন এবং সময়ের জ্ঞান থাকে না। এটিই আপনার জন্য মেডিটেশন। এতে মস্তিষ্কের ‘Default Mode Network’ শান্ত থাকে।
৩. গ্রাউন্ডিং টেকনিক (Grounding): চোখ বন্ধ করে ভেতরের দিকে না তাকিয়ে, বাইরের দিকে তাকান। ঘরের ৫টি লাল রঙের জিনিস খুঁজুন, বা ৩টি আলাদা শব্দ শোনার চেষ্টা করুন। এটি অ্যাংজাইটি কমাতে ধ্যানের চেয়েও দ্রুত কাজ করে।
৪. NSDR (Non-Sleep Deep Rest): ডা. অ্যান্ড্রু হিউবারম্যানের এই পদ্ধতিটি (যা আমরা আগের প্রতিবেদনে আলোচনা করেছি) ধ্যানের চেয়ে অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত এবং নিরাপদ, কারণ এতে ফোকাস করার চাপ থাকে না, শুধু শোনার কাজ থাকে।
আজকের যুগে ‘টক্সিক পজিটিভিটি’র ভিড়ে আমাদের শেখানো হয়েছে—চেষ্টা করলেই সব সম্ভব। কিন্তু শরীর বা মন যখন সায় দিচ্ছে না, তখন জোর করে মেডিটেশন করা বোকামি।
ধ্যান মানে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করা নয়, বরং নিজের যত্ন নেওয়া। যদি চোখ বন্ধ করলে অন্ধকার লাগে, তবে চোখ খুলে আলোর দিকে তাকান। শান্তি পাওয়ার পথ একটাই হতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। আপনার শান্তি, আপনার নিয়মে আসুক।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারের মৃত্যু | এটা কি নিছকই দুর্ঘটনা নাকি চক্রান্ত?
- স্টেজ আছে, গান আছে—তবু Playback নয় কেন? অরিজিৎ সিং কি ক্লান্ত নাকি বদলের ইঙ্গিত?
- হঠাৎ অতিথি এলে এই ৭টি Quick Snack রেসিপি রাখুন মনে | চটজলদি আপ্যায়ন
- নতুন বছরে ট্রাভেল ফান্ড জমাবেন কীভাবে? রইল ৯টি জাদুকরী টিপস
- দিনে কতবার ফেসওয়াশ? বেশি ধুলে কি ত্বক ভালো থাকে নাকি ক্ষতি হয়? জানুন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের আসল রায়

