নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে মূলত সত্তর ও আশির দশকে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রায় এক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার পর রবিবার রাতে মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে শোক নেমে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র মহলে। সর্বভারতীয় চলচ্চিত্রকর্মী সংগঠন তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও সমাজমাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থাকা মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনে ছিল ‘মর্জিনা আবদুল্লাহ’, ‘নিশিকন্যা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’, ‘ভাগ্যচক্র’, ‘সন্ধি’, ‘ফাদার’ ও ‘আশ্রিতা’-র মতো একাধিক ছবি। বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছিলেন তিনি।
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শেষ হল এক দীর্ঘ অভিনয়জীবন
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৯ জুন কলকাতায়। ১৯৭২ সালে চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর বাংলা চলচ্চিত্রে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে দীনেন গুপ্তের ‘মর্জিনা আবদুল্লাহ’ ছবিতে মর্জিনার চরিত্রে অভিনয়ের পর তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে।
এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। ‘নিশিকন্যা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’, ‘ভাগ্যচক্র’ এবং ‘সন্ধি’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি তৈরি করে। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
তাঁর অভিনয়জীবনের একটি বিশেষ স্মরণীয় ছবি ছিল ‘মৌচাক’। এই ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ গানটি সত্তরের দশকের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। প্রেমের প্রকাশ্য ঘোষণার সঙ্গে গানটির নাম জড়িয়ে যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি এই গানও মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে ওঠে।
‘কলকাতার রেখা’ নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি
অভিনয়ের পাশাপাশি মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সৌন্দর্য নিয়েও সেই সময় যথেষ্ট আলোচনা ছিল। তাঁর সৌন্দর্যের কারণে অনেকে তাঁকে ‘কলকাতার রেখা’ বলে ডাকতেন। বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছিল।
তাঁর অভিনীত ছবির তালিকায় শুধু জনপ্রিয় ছবিই নয়, বিভিন্ন ধরনের চরিত্রও ছিল। ‘মর্জিনা আবদুল্লাহ’ থেকে ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ থেকে ‘ভাগ্যচক্র’—বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
তাঁর অভিনয়ের সময়কাল মূলত সত্তর ও আশির দশককে ঘিরে। সেই সময় বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন পরিচিত ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী। পরে ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে দূরে সরে যান এবং ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষের আড়ালে রাখেন।
হিন্দি ছবিতেও করেছিলেন অভিনয়
বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহ পরিচালিত ‘খান দোস্ত’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি ছবিতে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর বাসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘সফেদ ঝুট’ ছবিতেও কাজ করেন তিনি।
এছাড়াও ‘দিললগি’ এবং ‘দো লাড়কে দোনো কাড়কে’ ছবিতে অভিনয় করেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। অর্থাৎ তাঁর অভিনয়ের পরিসর শুধু বাংলা চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হিন্দি ছবিতেও তিনি নিজের অভিনয় তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন।
তবে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মুম্বইয়ের চাকচিক্যময় চলচ্চিত্রজগৎ তাঁকে খুব একটা টানেনি। বাংলা চলচ্চিত্রেই তাঁর মূল পরিচিতি তৈরি হয় এবং সেখানেই তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলি গড়ে ওঠে।
জনপ্রিয়তার শিখরে থেকেও হঠাৎ চলে গিয়েছিলেন অন্তরালে
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি ছিল তাঁর হঠাৎ করে অভিনয় থেকে সরে যাওয়া। ‘আশ্রিতা’ ছবির পর তিনি রুপোলি পর্দা থেকে অনেকটাই দূরে চলে যান। প্রদত্ত তথ্যের এক জায়গায় ‘আশ্রিতা’কে ১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর শেষ ছবি বলা হয়েছে, অন্য একটি প্রতিবেদনে ১৯৮৯ সালের পর তাঁর পর্দা থেকে সরে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর মুম্বইয়ে অনেকটা নিভৃতে থাকতে শুরু করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। নিজের ব্যক্তিগত জীবনও তিনি আড়ালে রেখেছিলেন। জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা একজন অভিনেত্রীর এভাবে জনসমক্ষ থেকে সরে যাওয়া তাঁকে ঘিরে আলাদা কৌতূহল তৈরি করেছিল।
একটি প্রতিবেদনে এমনও উল্লেখ করা হয়েছে, সুচিত্রা সেনের পর ভারতীয় বাংলা সিনেমায় মিঠু মুখোপাধ্যায় ছিলেন এমন একজন নায়িকা, যিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সম্পূর্ণ ভাবে জনসমক্ষ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রেখেছিলেন। তাঁর এই অন্তরালে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঘিরে রহস্য ও কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়।
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ প্রসেনজিৎ ও রঞ্জিত মল্লিকের
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রের সহকর্মীদের মধ্যেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য:
“মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের খবর অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তাঁর স্মৃতি এবং তাঁর কাজ আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে। গভীর শ্রদ্ধা।”
অন্যদিকে সহ-অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকও মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন। তাঁদের দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকলেও এই প্রয়াণের খবর তাঁকে গভীর ভাবে আঘাত করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রঞ্জিত মল্লিকের বক্তব্য:
“মেনে নিতে পারছি না। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘ বছর যোগাযোগ নেই। তারপরেও এই চলে যাওয়াটা আমার কাছে সমান দুঃখের।”
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজের স্মৃতি তাঁর সহকর্মীদের মনে এখনও রয়েছে। দীর্ঘ সময় জনসমক্ষের বাইরে থাকার পরও তাঁর অভিনয় এবং তাঁর সঙ্গে কাজের স্মৃতি চলচ্চিত্রের মানুষদের কাছে অমলিন হয়ে রয়েছে।
চলচ্চিত্রজগতের শ্রদ্ধা, স্মরণে মিঠুর দীর্ঘ অবদান
সর্বভারতীয় চলচ্চিত্রকর্মী সংগঠনও মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রজগৎ গভীর ভাবে শোকাহত। তাঁকে শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে নয়, চলচ্চিত্র পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেও স্মরণ করা হয়েছে।
সংগঠনের বক্তব্য:
“তাঁর প্রয়াণে সমগ্র বাংলা চলচ্চিত্রজগৎ গভীর ভাবে শোকাহত। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না, চলচ্চিত্র পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বৃহত্তর চলচ্চিত্র পরিবারের প্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর চলে যাওয়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি যুগের অবসান চিহ্নিত করে।”
সংগঠনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, বাংলা চলচ্চিত্র, ওড়িয়া চলচ্চিত্র এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণে থাকবে। তাঁর অভিনীত ছবিগুলি এবং তাঁর প্রতিভায় সমৃদ্ধ কাজগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যেও বেঁচে থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবন দীর্ঘ না হলেও তাঁর কাজের স্মৃতি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ‘মর্জিনা আবদুল্লাহ’, ‘নিশিকন্যা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’, ‘ভাগ্যচক্র’, ‘সন্ধি’, ‘ফাদার’ এবং ‘আশ্রিতা’-র মতো ছবির সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। বাংলা ছবির পাশাপাশি ‘খান দোস্ত’, ‘সফেদ ঝুট’, ‘দিললগি’ এবং ‘দো লাড়কে দোনো কাড়কে’-র মতো হিন্দি ছবিতেও তাঁর উপস্থিতি ছিল।
দীর্ঘদিনের অভিনয়জীবন, জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠা, তারপর হঠাৎ করে পর্দা থেকে সরে গিয়ে নিভৃতে জীবন কাটানো—মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনকাহিনির এই অধ্যায়গুলি তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের এক স্বতন্ত্র নাম করে রেখেছে। ৭১ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে সেই অধ্যায়েরই সমাপ্তি ঘটল।
#MithuMukherjee #MithuMukherjeeActress #MithuMukherjeeDeath #BengaliActress #BengaliCinema #BengaliFilm #KolkataActress #VeteranActress #EntertainmentNews
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

