New Market Hotel Fire: কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় হোটেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পর জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং রাতে অতিথিদের নিরাপদে উদ্ধারের প্রস্তুতি নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হোটেল-আগুন হিসেবে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ গত কয়েক মাসে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে আগুন, ভবনধস এবং শিল্পদুর্ঘটনার একাধিক ঘটনায় বারবার সামনে এসেছে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন, ভবনের নকশা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা বিধি মানার প্রশ্ন।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি—আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘গত ছ’মাসে ঠিক চারটি বড় অগ্নিকাণ্ড’ বলা যায় না। অনুসন্ধানে ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু সবগুলিকে অগ্নিকাণ্ড হিসেবে একই তালিকায় রাখা ঠিক হবে না।
নিউ মার্কেটের আসল ঘটনা কী?
২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট ভোররাত প্রায় ২টা নাগাদ কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫এইচ নম্বর একটি পাঁচতলা ভবনে আগুন লাগে। ভবনটিতে একাধিক হোটেল ছিল। হোটেলের নাম শিখা ইন।
তখন অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভবনের ভিতরে ঘন ধোঁয়া জমে যায়। উদ্ধারকারীদেরও কাজ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ জন আহত হয়েছেন—প্রাথমিক রিপোর্টে এমনটাই জানানো হয়েছে। নিহতদের মধ্যে চার বছরের একটি শিশুও রয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে আগুনের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে শর্ট সার্কিট বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ত্রুটি উঠে এসেছে। তবে এটিকে এখনও চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না; প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে উঠেছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। সরু সিঁড়ি, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের অভাব এবং জরুরি বেরোনোর পথ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভবনটিতে কার্যকর জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না এবং সরু সিঁড়িই কার্যত প্রধান যাতায়াতের পথ ছিল।
অর্থাৎ ঘটনাটাকে মোটামুটি এভাবে বোঝা যায়—সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুন → দ্রুত ধোঁয়া ছড়ানো → ঘুমন্ত আবাসিকদের বেরোতে সমস্যা → সরু পথ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা → ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু।
কেন এত দ্রুত পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠল?
একটি হোটেলে আগুন লাগলেই মৃত্যু হবে, এমন নয়। আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হল আগুন লাগার পর মানুষকে নিরাপদে বের করে আনা।
নিউ মার্কেটের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে ঠিক এই জায়গাতেই। পাঁচতলা ভবনের মধ্যে একাধিক হোটেল চলছিল এবং ভবনটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে অবস্থিত। সরু সিঁড়ি ও সীমিত বহির্গমন পথ থাকলে আগুনের সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
আর রাতের ঘটনা হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছিল। মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে আগুন বা ধোঁয়া বুঝতে সময় লাগে। ফলে অ্যালার্ম, জরুরি আলো, বিকল্প সিঁড়ি, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং পরিষ্কার বহির্গমন পথ না থাকলে কয়েক মিনিটের বিলম্বই প্রাণঘাতী হতে পারে।
এই কারণেই শুধু ‘আগুন কোথা থেকে লাগল’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। আরও বড় প্রশ্ন হল—আগুন লাগার পর মানুষ বেরিয়ে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা কি আদৌ ছিল?
ছ’মাসে চারটি বড় অগ্নিকাণ্ড বা বিপর্যয় — আনন্দপুর, তারাতলা, তারাপীঠ, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। আর প্রতিটির পরেই তদন্তকারী সংস্থার মুখে প্রায় একই বাক্য: “অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স ছিল না,” “ফায়ার অডিট হয়নি,” “নিয়ম মানা হয়নি।” প্রশ্নটা তাই আর শুধু “কেন গাফিলতি হল” নয় — প্রশ্নটা হল, যে ব্যবস্থাটার কথা, যার কাজ ছিল এই গাফিলতি আগেভাগে ধরা, সেই এনওসি (No Objection Certificate) আর বার্ষিক ফায়ার অডিট প্রক্রিয়াটাই বা আসলে কী অবস্থায় আছে।
আনন্দপুর (জানুয়ারি ২০২৬): নাজিরাবাদের যে গোডাউনে আগুন লেগে ২৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, দমকল দপ্তর নিজেই জানিয়ে দেয় সেখানে কোনও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, এবং এত দিন ধরে সেই গোডাউন কীভাবে অনুমোদন ছাড়া চলছিল, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। CAG-র (কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল) তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ সংক্রান্ত অভিযোগে গত ১৪ বছরে থানায় দায়ের হয়েছে ৩৫৯টি এফআইআর — কিন্তু অভিযোগ দায়ের করাতেই থেমে গেছে প্রশাসন ও কলকাতা পুরসভার ভূমিকা, বাস্তবে কোনও নির্মাণ ভাঙা বা লাইসেন্স বাতিলের নজির খুব কম।
তারাপীঠ (আগস্ট ২০২৬): স্থানীয় সাব-ডিভিশনাল অফিসার নিজেই জানান, অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও বহু হোটেলকে আগে একাধিকবার নোটিস পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু কোনও জবাব আসেনি — এবং সেই নোটিসের পরও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যতক্ষণ না ন’জনের মৃত্যু হয়। এলাকার প্রায় ৪০০ হোটেল-লজ-রিসর্টের মধ্যে মন্দির-লাগোয়া ৫০-৬০টি হোটেল এমন সরু গলিতে দাঁড়িয়ে আছে যে দমকলের ইঞ্জিন ঢোকারই জায়গা নেই। রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা সরাসরি অভিযোগ করেন, “আর্থিক দুর্নীতির বিনিময়ে উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই এত বড় ভবন তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল,” এবং আঙুল তোলেন তারাপীঠ রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (TRDA)-র দিকে — যে সংস্থার কাজ ছিল এলাকার পরিকল্পনা ও নির্মাণ অনুমোদন দেখভাল করা।
অডিট প্রক্রিয়াটা আসলে কেমন হওয়ার কথা
নিয়ম অনুযায়ী, কোনও হোটেল, রেস্তোরাঁ বা গোডাউন চালু করতে গেলে দমকল দপ্তরের কাছ থেকে এনওসি নিতে হয় — যেখানে যাচাই করা হয় অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র, জরুরি বহির্গমন পথ, বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা, ভবনের নকশা অনুমোদন ইত্যাদি। এরপর প্রতি বছর নবীকরণের সময় পুনরায় পরিদর্শন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটে তা ভিন্ন —
- একবার এনওসি পেলে আর ফিরে তাকানো হয় না। তারাপীঠের মতো এলাকায় প্রশাসন নিজেই স্বীকার করেছে, নোটিস পাঠানো হলেও তার ফলো-আপ পরিদর্শন হয়নি।
- নির্মাণ অনুমোদন আর ফায়ার অডিট আলাদা আলাদা সংস্থার হাতে থাকায় কেউই পূর্ণ দায় নেয় না। তারাতলার গোডাউন-ধসের ঘটনায় বিশ্লেষকরা এই “ফ্র্যাগমেন্টেড অ্যাকাউন্টেবিলিটি”-কেই মূল সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছেন — পুরসভা প্ল্যান অনুমোদন করে, রাজ্যের অন্য দপ্তর সুরক্ষা দেখে, আর ব্যর্থতা হলে কারও নির্দিষ্ট দায় থাকে না।
- অভিযোগ দায়ের হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। ৩৫৯টি এফআইআর জলাশয় ভরাটের অভিযোগে দায়ের হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নগণ্য — এই একটি পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়, কাগজে-কলমে ব্যবস্থা “চলছে” দেখানো আর বাস্তবে সেটা কার্যকর করা— এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
রাজনৈতিক তরজা, প্রশাসনিক নীরবতা
প্রতিটি ঘটনার পরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হল — বিরোধীরা দুর্নীতির অভিযোগ তোলে, প্রশাসন ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে ও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে, কয়েকজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়, আর তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি সংবাদের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যায় — যতক্ষণ না পরের ঘটনা ঘটে। তারাপীঠের ক্ষেত্রে প্রশাসন অবশ্য দ্রুত ১৫টি হোটেল বন্ধ ও বিশেষ অডিট কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছে, যা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পদক্ষেপ বলা যায়। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায় — এই অডিট কমিটি কি তারাপীঠের বাইরে, গোটা রাজ্যের হাজার হাজার ছোট হোটেল, গোডাউন আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পৌঁছবে, নাকি এটাও একবারের জন্য দৃশ্যমান একটা পদক্ষেপ হয়েই থেকে যাবে?
#NewMarketHotelFire #KolkataHotelFire #KolkataFire #FreeSchoolStreet #MirzaGhalibStreet #KolkataNews #WestBengalNews #HotelFire #FireSafety #KolkataBreakingNews #BangladeshTourists #MedicalTourism #NewMarketKolkata #FireAccident #IndiaNews
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?

