শিবের ত্রিশূলে কাটা পড়া সেই মানুষের মাথাটি কি আজও সংরক্ষিত আছে? চলুন উত্তরাখণ্ডের গভীরে, যেখানে Patal Bhuvaneshwar Cave-এর অন্ধকারে লুকিয়ে আছে ৩৩ কোটি দেবতার পাহারা এবং এক অলৌকিক রহস্য।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : ছোটবেলায় ঠাকুমা-দিদিমার কোলে শুয়ে গণেশের গল্প শোনেননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মা দুর্গা স্নানে যাচ্ছেন, তাই নিজের গায়ের হলুদ আর মাটি দিয়ে তৈরি করলেন এক সুন্দর বালককে। নাম দিলেন গণেশ। নির্দেশ দিলেন, “কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিবি না।”
এরপরের ঘটনা আমাদের সবার মুখস্থ। মহাদেব এলেন, গণেশ তাঁকে আটকালেন। শুরু হলো প্রলয়ংকর যুদ্ধ। রাগের বশে মহাদেব ত্রিশূল দিয়ে কেটে ফেললেন নিজেরই পুত্রের মাথা। পরে মা পার্বতীর কান্না থামাতে গণেশের ধড়ে জুড়ে দেওয়া হলো হাতির মাথা। গজানন হলেন গণপতি।
আরও পড়ুন : জানেন কি? ব্রহ্মাকে কেন মন্দিরে পূজা করা হয় না
কিন্তু গল্পটা কি এখানেই শেষ? কখনও কি ভেবে দেখেছেন, গণেশের সেই আসল ‘মানুষের মাথা’টি কোথায় গেল? সেটা কি নষ্ট হয়ে গেল, নাকি মহাদেব সেটিকে কোথাও লুকিয়ে রাখলেন?
পুরাণ এবং লোককথা বলছে, সেই মাথাটি হারিয়ে যায়নি। সেটি আজও আছে। হিমালয়ের কোলে, উত্তরাখণ্ডের এক গভীর ও রহস্যময় গুহায় আজও সেই আদি মস্তকটি পূজিত হয়। চলুন, আজ আমরা পাড়ি দেব সেই অলৌকিক গুহার সন্ধানে, যার নাম—পাতাল ভুবনেশ্বর।
উত্তরাখণ্ডের মাটির নিচে এক ‘দেবলোক’ (The Hidden World of Pithoragarh)
উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলা। পাইন আর ওক গাছের জঙ্গলে ঘেরা এক নির্জন পাহাড়ি এলাকা। এখানেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত ভুবনেশ্বর গ্রাম। আর এই গ্রামের মাটির ৯০ ফুট নিচে লুকিয়ে আছে এক চুনাপাথরের গুহা। এটি কোনো সাধারণ গুহা নয়। স্কন্দ পুরাণের ‘মানসখণ্ড’-এ একে বলা হয়েছে মর্ত্যের সবথেকে পবিত্র স্থান।
গুহার প্রবেশপথটি এতটাই সরু যে, আপনাকে হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। ভেতরে ঢুকলেই এক হাড়হিম করা ঠান্ডা আর নিস্তব্ধতা আপনাকে গ্রাস করবে। আর সেই আবছা আলো-অন্ধকারেই আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।
আদি গণেশ: কাটা মুণ্ডুর রহস্য (The Legend of Adiganesh)
গুহার অনেকটা ভেতরে, পাথরের খাঁজে একটি বিশেষ শিলাখণ্ড বা প্রস্তর মূর্তি দেখা যায়। স্থানীয় পুরোহিত এবং বিশ্বাসীদের মতে, এটিই হলো গণেশের সেই কাটা মুণ্ডু। একে বলা হয় ‘আদিগণেশ’।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই শিলাখণ্ডটির ঠিক ওপরে ছাদ থেকে ঝুলে আছে ১০৮ পাপড়িযুক্ত একটি পাথরের পদ্মফুল। একে বলা হয় ‘ব্রহ্মকমল’। আর সেই পাথরের ফুল থেকে অবিরত টুপটুপ করে জল ঝরছে ঠিক গণেশের ওই কাটা মুণ্ডুর ওপর। মনে হয় যেন কেউ বা কারা অদৃশ্য হাতে প্রতিনিয়ত অভিষেক করে চলেছেন।
পুরাণ মতে, গণেশের শিরশ্ছেদ করার পর মহাদেব যখন বুঝতে পারলেন এটি তাঁরই পুত্র, তখন তিনি পুত্রের সেই সুন্দর মুখমণ্ডলটি ধ্বংস হতে দেননি। তিনি সেটিকে এই পাতাল ভুবনেশ্বর গুহায় নিয়ে এসে স্থাপন করেন এবং ৩৩ কোটি দেব-দেবীকে নির্দেশ দেন এই মস্তকটিকে রক্ষা করার জন্য। সেই ব্রহ্মকমলের জল আসলে অমৃত, যা ওই মাথাটিকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
৩৩ কোটি দেবতার বাসভূমি
বলা হয়, এই একটি গুহায় দর্শন করলে চারধাম যাত্রার পুণ্য লাভ হয়। কেন জানেন? কারণ, পুরাণ অনুযায়ী, এখানেই মহাদেব ৩৩ কোটি দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে বাস করেন। গুহার দেওয়ালে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া অগণিত আকৃতি দেখা যায়, যা দেখে মনে হবে যেন শেষনাগ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও বা ঐরাবতের পা, আবার কোথাও জটাধারী শিবের রূপ।
গুহার মেঝেতে দেখা যায় একটি লম্বা পাথরের জট। বিশ্বাস করা হয়, এটি মহাদেবের জটা, যেখান থেকে গঙ্গা মর্ত্যে নেমে আসছেন। আধুনিক ভূতাত্ত্বিকরা (Geologists) একে ‘স্ট্যালাকটাইট’ এবং ‘স্ট্যালাগমাট’ (Stalactite & Stalagmite) শিলা বললেও, হাজার বছরের বিশ্বাস আর ভক্তি এই পাথরগুলোকেই জীবন্ত করে তুলেছে।
চারটি দরজা ও কলিযুগের রহস্য (The Mystery of Four Gates)
পাতাল ভুবনেশ্বর গুহার ভেতরে চারটি বিশেষ দরজা বা প্রবেশপথ ছিল—রণদ্বার, পাপদ্বার, ধর্মদ্বার এবং মোক্ষদ্বার। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে:
- রণদ্বার: মহাভারতের যুদ্ধের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়।
- পাপদ্বার: লঙ্কাপতি রাবণের মৃত্যুর পর এই দরজাটি বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে কেবল দুটি দরজা খোলা আছে—ধর্মদ্বার এবং মোক্ষদ্বার। স্থানীয় লোককথা বা মিথ বলছে, যেদিন ধর্মদ্বার বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিনই এই পৃথিবীতে কলিযুগের সমাপ্তি ঘটবে এবং প্রলয় নেমে আসবে। এই গুহাটি যেন এক জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল, যা যুগের পরিবর্তনকে নীরবে সাক্ষী রেখে চলেছে।
পাণ্ডবদের শেষ যাত্রা ও শঙ্করাচার্যের আবিষ্কার
শুধু শিব বা গণেশ নন, এই গুহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পঞ্চপাণ্ডবের নামও। বলা হয়, জীবনের শেষ পর্যায়ে স্বর্গতুল্যে যাওয়ার আগে পাণ্ডবরা এই গুহাতেই মহাদেবের তপস্যা করেছিলেন। গুহার ভেতরে আজও দাবা খেলার মতো একটি পাথরের ছক দেখা যায়, যা নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে যে—এখানেই যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা পাশা খেলতেন।
কালের নিয়মে একসময় এই গুহার পথ মানুষ ভুলে গিয়েছিল। অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য (Adi Shankaracharya) যখন হিমালয় ভ্রমণে আসেন, তখন তিনি পুনরায় এই গুহাটি আবিষ্কার করেন। তিনি বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ গুহা নয়, বরং শিবের এক গুপ্ত রাজধানী। তিনি এখানে একটি তামার শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন, যা আজও পূজা করা হয়।
আধ্যাত্মিক বার্তা (The Spiritual Message)
গণেশের কাটা মুণ্ডু বা এই গুহার গল্প আমাদের কী শেখায়? এটি শেখায় যে, শরীরের বিনাশ হলেও চেতনার বিনাশ নেই। গণেশের হাতির মাথাটি হলো জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রতীক, যা তিনি নতুন করে পেয়েছিলেন। আর তাঁর মানুষের মাথাটি হলো তাঁর আদি স্বরূপ বা ‘ইগো’-র প্রতীক, যা মহাদেব নিজের কাছে সযত্নে রেখে দিয়েছেন।
ঈশ্বর যখন আমাদের থেকে কিছু কেড়ে নেন (যেমন গণেশের মাথা), তখন তিনি আসলে আমাদের আরও মহৎ কিছু দেওয়ার (গজানন রূপ) প্রস্তুতি নেন। আর যা হারিয়ে গেছে বলে আমরা ভাবি, তা আসলে হারায় না, ঈশ্বরের কাছেই অন্য কোনো রূপে সুরক্ষিত থাকে।
বিজ্ঞান বলবে ওগুলো চুনাপাথরের নকশা, আর বিশ্বাস বলবে ওটাই দেবতার নিঃশ্বাস। উত্তরাখণ্ডের এই পাতাল ভুবনেশ্বর গুহায় দাঁড়িয়ে যুক্তি আর তর্কের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে শুধু শোনা যায় ব্রহ্মকমল থেকে ঝরে পড়া সেই জলবিন্দুর শব্দ—টুপ… টুপ…। যা আজও মনে করিয়ে দেয়, বাবার হাতে ছেলের মাথা কাটা যাওয়ার সেই করুণ অথচ অলৌকিক উপাখ্যান।
যদি কখনও সুযোগ পান, একবার যাবেন এই গুহায়। কে জানে, সেই আবছা অন্ধকারে হয়তো আপনিও অনুভব করবেন এক দৈব উপস্থিতি, যা হাজার বছর ধরে আগলে রেখেছে গণেশের সেই আদি মস্তক।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

