বই-খাতা সব শিকেয় তুলে আজ শুধুই চোখের ভাষা পড়ার দিন। হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে জানুন বসন্ত পঞ্চমীর সঙ্গে কামদেবের সম্পর্ক এবং বাঙালির এই Saraswati Puja Love Tradition-এর মিষ্টি ইতিহাস।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : কুয়াশা ঘেরা সকাল। পাড়ার প্যান্ডেল থেকে ভেসে আসছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ নয়, বরং মান্না দের “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা”। রাস্তায় বেরোলেই মনে হচ্ছে যেন সর্ষে ক্ষেত উঠে এসেছে শহরের বুকে। যেদিকেই চোখ যায়—বাসন্তী, হলুদ আর লালের ছড়াছড়ি।
আজ সরস্বতী পূজা। বিদ্যার দেবীর আরাধনার দিন। কিন্তু সত্যি করে বলুন তো, আজ কি শুধুই বিদ্যার আরাধনা হয়? নাকি অঞ্জলি দেওয়ার ফাঁকে ওই বাঁদিকের সারিতে দাঁড়ানো মেয়েটি বা ডানদিকের পাঞ্জাবি পরা ছেলেটির দিকে আড়চোখে তাকানোই আজকের আসল এজেন্ডা?
বাঙালি ক্যালেন্ডারে ১৪ই ফেব্রুয়ারি আসুক বা না আসুক, আজকের দিনটিই হলো আমাদের নিজস্ব, খাঁটি “বাঙালি ভ্যালেন্টাইনস ডে”। মা-বাবার কড়া শাসন আজ শিথিল, পড়ার টেবিলের বইগুলো আজ ছুটিতে, আর মনের জানালাগুলো আজ একদম খোলা।
কিন্তু কেন? কেন সরস্বতী পূজার দিনটিতেই বাতাসে প্রেমের গন্ধ ভাসে? এর পেছনে কি শুধুই তারুণ্যের হুজুগ, নাকি লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরনো কোনো সংস্কার? আজ পুজোর সকালে চলুন ডুব দিই বাঙালির এই মিষ্টি প্রেমের ঐতিহ্যে।
শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং প্রথম দেখার মুগ্ধতা
বাঙালির প্রেমে পড়ার জন্য সরস্বতী পূজার মতো আদর্শ দিন আর নেই। কেন জানেন? কারণ, রূপান্তর বা Transformation। সারা বছর যে মেয়েটিকে স্কুল ইউনিফর্মে বা সাধারণ সালোয়ার কামিজে দেখা যায়, আজ হঠাৎ তাকে হলুদ শাড়িতে দেখে চেনা দায়! চুলে গাঁদা ফুল, কপালে টিপ আর শাড়ির আঁচল সামলানোর সেই আড়ষ্টতা—এই দৃশ্য দেখেই তো কত কিশোরের বুকে প্রথম গিটার বেজে ওঠে।
আবার যে ছেলেটিকে সারা বছর জিন্স আর টি-শার্টে বখাটে মনে হতো, ধুতি-পাঞ্জাবিতে আজ তাকেই মনে হয় কার্তিকের মতো সুদর্শন। মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন, এই ‘ভিস্যুয়াল চেঞ্জ’ বা হঠাৎ করে নিজেকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে উপস্থাপন করাটাই বিপরীত লিঙ্গকে সবথেকে বেশি আকর্ষণ করে। আজকের দিনটি হলো সেই সুযোগ, যেদিন সবাই নিজেকে সেরা রূপে সাজিয়ে তোলে। আর এই সাজগোজের মূল উদ্দেশ্যই হলো—কারও নজরে পড়া।
অলিখিত লাইসেন্স: প্রেমের স্বাধীনতা (The Unofficial License)
বাঙালি পরিবারে প্রেম করা নিয়ে যতই কড়াকড়ি থাক, সরস্বতী পূজার দিনটি হলো এক ‘অলিখিত লাইসেন্স’-এর দিন। মা-বাবারাও জানেন, আজ ছেলেমেয়েরা একটু ‘ঘুরতে’ বেরোবে। “বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি”—এই অজুহাতটি আজকের দিনে ব্রহ্মাস্ত্রে পরিণত হয়। পার্ক স্ট্রিট থেকে প্রিন্সেপ ঘাট, ভিক্টোরিয়া থেকে ইকো পার্ক—আজকের দিনে কাপলদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। হাতে হাত রেখে হাঁটা, ফুচকা খাওয়া, আর লজ্জারাঙা মুখে প্রথম প্রেম নিবেদন—সবই আজকের দিনে সামাজিকভাবে অনেকটা স্বীকৃত। ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে যে ভয়টা থাকে, আজকের দিনে সেই ভয়টা যেন উধাও হয়ে যায় বসন্তের বাতাসে।
পুরাণ কী বলছে? মদনৎসবের ইতিহাস (The Mythological Connection)
আমরা অনেকেই ভাবি সরস্বতী পূজা মানেই শুধু পড়াশোনা। কিন্তু প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র এবং কালিদাসের কাব্য ঘাঁটলে দেখা যায়, এই দিনটির সঙ্গে প্রেমের দেবতা ‘কামদেব’ বা ‘মদন’-এর গভীর সম্পর্ক আছে।
প্রাচীন ভারতে বসন্ত পঞ্চমী তিথিতে পালিত হতো ‘সু-বসন্তক’ বা ‘মদনৎসব’। শীতের জরাজীর্ণতা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন রূপে সাজে, তখন কামদেব তাঁর স্ত্রী রতি-কে নিয়ে মর্ত্যে আসেন। কামদেবের তূণীরে থাকে পাঁচটি ফুলের বাণ—অরবিন্দ, অশোক, আম্র, নবমল্লিকা এবং নীলপদ্ম। তিনি এই বাণ ছুঁড়ে মানুষের মনে প্রেমের সঞ্চার করেন। তাই সরস্বতী পূজা বা বসন্ত পঞ্চমী মানে শুধু জ্ঞানের উন্মেষ নয়, এটি অনুরাগেরও উন্মেষ। আমাদের Saraswati Puja Love Tradition আসলে সেই প্রাচীন মদনৎসবেরই আধুনিক সংস্করণ। তাই আজ যদি আপনার মনে প্রেম জাগে, তবে জানবেন তাতে কামদেবের হাত আছে!
কুল খাওয়ার প্রথা ও শেয়ারিং-এর আনন্দ
সরস্বতী পূজার আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘কুল’ (Berries)। পুজোর আগে কুল খাওয়া বারণ, আর পুজোর পর সেই টক-মিষ্টি কুল ভাগ করে খাওয়া। স্কুল বা কলেজের ছাদে বসে, অথবা প্যান্ডেলের পেছনে দাঁড়িয়ে টিফিন বক্স থেকে কুল, নাড়ু বা খিচুড়ি ভাগ করে খাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অজস্র না-বলা কথা। কত প্রেমের শুরু হয়েছে এই “একটা কুল খাবি?” প্রশ্ন দিয়ে। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তো বাঙালির নস্টালজিয়া।
আরও পড়ুন : কোন ফুলে দেবী সরস্বতী সবথেকে সন্তুষ্ট হন? জেনে নিন সঠিক নিয়ম
জোড় সংখ্যার কুসংস্কার ও ব্রেকআপ মিথ
প্রেমের যেমন শুরু আছে, তেমনই আছে কিছু অদ্ভুত মিথ। অনেক কাপল বিশ্বাস করেন, সরস্বতী পূজার দিনে নাকি জোড় সংখ্যায় (দুজন) ঠাকুর দেখতে নেই, তাহলে ব্রেকআপ হয়ে যায়! তাই তারা সঙ্গে নেয় তৃতীয় কোনো বন্ধুকে, যাকে পোশাকি ভাষায় বলা হয় ‘কাবাব মে হাড্ডি’। যদিও এর কোনো ভিত্তি নেই, তবুও এই মিথগুলো আজকের দিনটিকে আরও মজার করে তোলে। আসলে ভিড়ের মধ্যে সঙ্গীর হাতটা শক্ত করে ধরার জন্য একটা অজুহাত তো চাই!
ডিজিটাল যুগের প্রেম: রিলস আর স্ন্যাপচ্যাট
আজকের জেনারেশন হয়তো হাতে লেখা চিঠি দেয় না। তাদের প্রেম এখন ইনস্টাগ্রাম রিলস আর স্ন্যাপচ্যাটে বন্দি। কিন্তু আবেগটা একই আছে। আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই দেখা যাবে ‘কাপল গোলস’-এর ছবি। ক্যাপশনে লেখা—”My Saraswati” বা “পুজোর সাজে”। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটির জন্য মণ্ডপের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার সেই ধৈর্য আজও বদলায়নি।
উপসংহার: বসন্ত এসে গেছে
সরস্বতী পূজা আমাদের শেখায়, জীবন মানে শুধু মোটা মোটা বই আর ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড় নয়। জীবনের সিলেবাসে প্রেমের অধ্যায়টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যা যেমন মাথাকে শান দেয়, প্রেম তেমন হৃদয়কে বড় করে। তাই আজ বই-খাতা সব আলমারিতে তুলে রাখুন। আজ শুধু চোখের ভাষা পড়ার দিন। যদি মনের মানুষটি পাশে থাকে, তবে তাকে নিয়ে হারিয়ে যান বসন্তের রঙে। আর যদি এখনো ‘সিঙ্গেল’ থাকেন, তবে কে জানে—হয়তো এই ভিড়ের মধ্যেই কেউ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, হাতে একগুচ্ছ পলাশ নিয়ে।
নিউজ অফবিটের পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই বসন্তের রঙিন শুভেচ্ছা। আপনার প্রেম অমর হোক!
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটে বিশ্বকাপ জয়, তাকিয়ে ক্রিকেট বিশ্ব │ জানুন, তার ক্রিকেটে উত্থানের কাহিনী
- রেলে মিলবে এমার্জেন্সি কোটায় সিট | জানুন, কারা পাবেন এই বিশেষ সুবিধা, কীভাবে হয় অনুমোদন
- টাইম স্ট্রেটে প্রেমের পরীক্ষা │ জেনে নিন, ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে এই ৫টি কাজ করলেই জমে উঠবে রোমান্স
- জানেন কি, হাঁচি থেকে হতে পারে মৃত্যু? | নীরবে বাড়ছে অ্যালার্জির অজানা বিপদ | কী সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
- আলপনা শিল্প: লক্ষ্মীপুজোর উঠোনে আঁকা বাংলার নীরব ইতিহাস

