মহাদেবের গলায় সাপ কেন থাকে? নাগরাজ বাসুকি কেন মহাদেবের শরণাপন্ন হয়েছিলেন? জানুন নাগরাজ বাসুকির তপস্যা, সমুদ্র মন্থনের অজানা গল্প। এক অলৌকিক উপাখ্যান। সমুদ্র মন্থন থেকে গরুড়ের ভয়—পুরাণের পাতায় লুকিয়ে থাকা Shiva Vasuki Snake-এর অজানা উপাখ্যান এবং কালজয়ী প্রতীক।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : কৈলাস পর্বতের শিখর। চারদিকে শুধুই বরফের শুভ্র চাদর। হাড়হিম করা সেই ঠান্ডার মাঝে, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহীত হয়ে ধ্যানে মগ্ন এক যোগী। তাঁর জটা থেকে গড়িয়ে পড়ছে গঙ্গা, কপালে একফালি চাঁদ। কিন্তু ভক্তের চোখ বারবার আটকে যায় তাঁর গলার দিকে। সেখানে পরম নিশ্চিন্তে পেঁচিয়ে আছে এক বিষধর সাপ। ফণা তুলে সে যেন পাহারা দিচ্ছে তাঁর প্রভুকে।
আমরা ছোটবেলা থেকেই শিবের এই রূপ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, যে সাপকে দেখলে মানুষ ভয়ে কয়েক যোজন দূরে পালায়, সেই মৃত্যুদূতকে কেন নিজের অলঙ্কার বানালেন মহেশ্বর? কেনই বা নাগরাজ বাসুকি স্বর্গের সুখ ছেড়ে শ্মশানবাসী শিবের গলায় আশ্রয় নিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ডুব দিতে হবে পুরাণের অতল গহ্বরে। আজ আপনাদের শোনাব সেই মহাকাব্যিক গল্প, যা শুধু কোনো পৌরাণিক ঘটনা নয়, বরং অহংকারের বিনাশ ও পরম আশ্রয়ের এক অনন্য দলিল।
আরও পড়ুন : মা কালীর সঙ্গে কেন পূজিত হন ডাকিনি যোগিনী?
গরুড়ের ভয় ও নাগরাজের তপস্যা (The Tale of Fear and Refuge)
গল্পের শুরুটা হয়েছিল এক ভীষণ ভয়ের আবহ দিয়ে। মহাভারত-এর ‘আস্তিক পর্ব’ এবং স্কন্দ পুরাণ-এ এই কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন নাগকুলের ওপর নেমে এসেছে চরম বিপদ। পক্ষীরাজ গরুড়, যিনি শ্রীবিষ্ণুর বাহন, তিনি নাগদের পরম শত্রু। সুযোগ পেলেই তিনি সাপ ভক্ষণ করেন। নাগরাজ বাসুকি দেখলেন, তাঁর প্রজাতি বিনাশের পথে। মৃত্যুর ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সবাইকে।
কোথায় গেলে মিলবে প্রাণভয় থেকে মুক্তি? স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল—কোথাও নিরাপদ স্থান নেই। তখন বাসুকি বুঝলেন, একমাত্র তিনিই বাঁচাতে পারেন, যিনি স্বয়ং ‘মহাকাল’। যিনি জন্ম-মৃত্যুর উর্ধ্বে। নাগরাজ বাসুকি শুরু করলেন কঠোর তপস্যা। শিবলিঙ্গ স্থাপন করে দিনের পর দিন চলল তাঁর আরাধনা।
অবশেষে মহাদেব প্রসন্ন হলেন। তিনি দেখা দিলেন বাসুকিকে। কম্পিত কণ্ঠে নাগরাজ বললেন, “হে প্রভু, আমরা ভয়ের সাগরে ডুবছি। মৃত্যুভয় আমাদের গ্রাস করেছে। আমাদের আশ্রয় দিন।” দেবাদিদেব, যিনি ‘আশুতোষ’ (খুব সহজেই সন্তুষ্ট হন), তিনি হাসলেন। তাঁর সেই ভুবনভোলানো হাসি যেন নিমেষে সব ভয় মুছিয়ে দিল। তিনি বললেন, “যে আমার শরণাপন্ন হয়, স্বয়ং কালও তাকে স্পর্শ করতে ভয় পায়। আজ থেকে তুমি আমার গলায় অলঙ্কার হয়ে থাকবে। আমার শরীরের উত্তাপ তোমাকে শীত থেকে বাঁচাবে, আর আমার সান্নিধ্য তোমাকে গরুড়ের ভয় থেকে মুক্ত রাখবে।” সেই থেকে নাগরাজ বাসুকি হলেন শিবের কণ্ঠহার। ভক্ত ও ভগবানের এই মিলন বুঝিয়ে দিল, ঈশ্বরের কাছে ক্ষুদ্র-বৃহৎ, বিষাক্ত-অমৃত—সবই সমান।
সমুদ্র মন্থন: ত্যাগের প্রতিদান (The Sacrifice during Samudra Manthan)
কূর্ম পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ-এ আরেকটি রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা আছে, যা শিব ও বাসুকির সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। দেবতা ও অসুররা মিলে যখন সমুদ্র মন্থন শুরু করলেন, তখন মন্থনদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হলো মন্দার পর্বতকে। কিন্তু দড়ি কোথায়? এগিয়ে এলেন নাগরাজ বাসুকি। নিজের শরীরকে দড়ি হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দিলেন তিনি।
একদিকে দেবতারা, অন্যদিকে অসুররা—টানাটানিতে বাসুকির শরীর ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল। তাঁর মুখ দিয়ে আগুনের হলকা ও বিষ নির্গত হতে থাকল। সেই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি নড়েননি, কারণ উদ্দেশ্য ছিল মহৎ—অমৃত লাভ।
মন্থনের শেষে যখন হলাহল (বিষ) উঠল, তখন সৃষ্টিকে বাঁচাতে শিব সেই বিষ পান করলেন। তিনি হলেন ‘নীলকণ্ঠ’। কিন্তু একা শিব নন, সেই বিষের জ্বালায় জর্জরিত ছিলেন বাসুকিও। কথিত আছে, শিব তখন বাসুকির ত্যাগে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের শরীরে ধারণ করলেন। মহাদেবের গলার বিষের জ্বালা এবং বাসুকির বিষ—একে অপরের পরিপূরক হয়ে গেল। বিষাক্ত সাপ হয়ে উঠল পবিত্রতার প্রতীক।
তিনটি কুণ্ডলী: কালের প্রতীক (The Three Coils of Time)
মহাদেবের গলায় সাপটি সাধারণত তিনটি বা পাঁচটি প্যাঁচ বা কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে। এটি কোনো সাধারণ দৃশ্য নয়। শিব পুরাণ অনুসারে, এই তিনটি কুণ্ডলী তিনটি কালের প্রতীক— ১. ভূত (Past): যা চলে গেছে। ২. বর্তমান (Present): যা এখন ঘটছে। ৩. ভবিষ্যৎ (Future): যা আসতে চলেছে।
সাপ যেমন পুরনো চামড়া বা খোলস ত্যাগ করে নতুন জীবন পায়, মহাদেবও তেমনই ইঙ্গিত দেন যে আত্মাকে বারবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরতে হয়। কিন্তু যিনি শিবের ভক্ত, তিনি এই ‘কালচক্র’-এর ঊর্ধ্বে। শিব গলায় সাপ জড়িয়ে বুঝিয়ে দেন যে, তিনি ‘কাল’-কে জয় করেছেন। তিনি মহাকাল। সময় তাঁর গলায় অলঙ্কারের মতো শোভা পায়, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
বিষ যখন শক্তি: অহংকারের বিনাশ (Ego and Poison)
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে দেখলে, সাপ হলো মানুষের ‘অহংকার’ বা ‘ইগো’-র প্রতীক। সাপের বিষ যেমন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে, তেমনই অতিরিক্ত অহংকার মানুষের পতন ডেকে আনে। মহাদেব সেই বিষধর সাপকে গলায় ধারণ করে আমাদের এক গূঢ় বার্তা দিচ্ছেন। তিনি দেখাচ্ছেন যে, অহংকারকে বিনাশ করার প্রয়োজন নেই, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ বা বশ করাই হলো আসল শক্তি। সাপ শিবের গলায় থাকে, কিন্তু তাঁকে দংশন করে না। অর্থাৎ, যখন আপনি আপনার ক্রোধ, কাম ও অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবেন, তখন সেই নেতিবাচক শক্তিই আপনার অলঙ্কারে পরিণত হবে।
কুন্ডলিনী শক্তি ও যোগশাস্ত্র (The Kundalini Connection)
যোগশাস্ত্র মতে, আমাদের মেরুদণ্ডের নিচে সুপ্ত অবস্থায় যে শক্তি থাকে, তাকে ‘কুন্ডলিনী শক্তি’ বলা হয়। একে সাপের রূপেই কল্পনা করা হয়। সাধক যখন ধ্যানের গভীরে যান, তখন এই সুপ্ত সাপ বা শক্তি জাগ্রত হয়ে মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে ওঠে এবং সহস্রার চক্রে (মাথার তালুতে) মিলিত হয়। শিব হলেন পরম যোগী। তাঁর গলার সাপটি আসলে জাগ্রত কুন্ডলিনী শক্তির প্রতীক। এটি বুঝিয়ে দেয় যে মহাদেব তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং সুপ্ত শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে জয় করেছেন। তিনি জীবাত্মা থেকে পরমাত্মায় লীন হয়েছেন।
আজকের এই আধুনিক যুগে, যখন আমরা সামান্য বিপদেই ধৈর্য হারাই, তখন শিবের এই রূপ আমাদের ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ হওয়ার শিক্ষা দেয়। ভেবে দেখুন, যার গলায় সাক্ষাৎ মৃত্যু (বিষধর সাপ) জড়িয়ে আছে, তিনি কতটা শান্ত! তিনি আমাদের শেখান, পরিস্থিতি যতই বিষাক্ত হোক, পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক—মনের প্রশান্তি হারানো চলবে না।
তাই পরেরবার যখন শিবলিঙ্গে জল ঢালবেন বা মহাদেবের ছবির দিকে তাকাবেন, তখন শুধু ভক্তি নয়, মনে রাখবেন সেই গভীর দর্শন—ভয়কে জয় করা এবং বিষকে শক্তিতে রূপান্তর করাই হলো দেবাদিদেবের আসল আরাধনা।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
Most Viewed Posts
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra
- জানেন কি নবরাত্রির চতুর্থ দিনে মা কুষ্মাণ্ডা পূজা কেন বিশেষ? ︱Why Ma Kushmanda Puja on Navratri Day 4 is Special?
- Digha Jagannath Temple Facts ︱দীঘা জগন্নাথ মন্দির সম্পর্কে জানুন এই দশটি অজানা তথ্য

