সামনেই বিধানসভা ভোট, আশা ছিল ‘রেবড়ি’র বৃষ্টির। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর ঝুলি থেকে বেরোল শুধুই দীর্ঘমেয়াদী রেল প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি। বিরোধীদের কটাক্ষ—”যাঁরা সোনার বাংলা গড়বেন বলছিলেন, তাঁদের কাছে বাংলার জন্য কোনো পরিকল্পনাই নেই।”
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: পঞ্জিকার পাতায় আজ ১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে দিনটির গুরুত্ব ছিল অন্যরকম। সামনেই হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যের শাসক বনাম কেন্দ্রের শাসকের লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন আমজনতা থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সবারই ধারণা ছিল, এবারের কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলার জন্য থাকবে বিশেষ ‘উপহার’।
সকাল থেকেই চায়ের দোকানে, ট্রামে-বাসে একটাই আলোচনা—”দিল্লির মন কি এবার গলবে?” কেউ আশা করেছিলেন ১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকার সুরাহা হবে, কেউ ভেবেছিলেন সুন্দরবনের জন্য আসবে বিশেষ প্যাকেজ, আবার কেউ আশায় ছিলেন ঘাটালে মাস্টার প্ল্যানের। অর্থমন্ত্রী যখন সংসদে লাল ফোল্ডার খুলে ভাষণ শুরু করলেন, তখন বাংলার ড্রয়িংরুমগুলোতে উত্তেজনার পারদ চড়ছিল।
কিন্তু দেড় ঘণ্টার ভাষণ শেষে সেই পারদ নামল হিমাঙ্কের নিচে। প্রত্যাশার বেলুন ফুটল সশব্দে। ‘ভোটের বাজেট’ তো হলোই না, উল্টে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধল বঞ্চনার অভিযোগ। প্রাপ্তির ভান্ডারে জুটল কেবল দুটি রেল করিডর, যা ভবিষ্যতের গর্ভে। আর বর্তমান? সেখানে শুধুই শূন্যতা।
প্রত্যাশার পাহাড় বনাম প্রাপ্তির ধূলিকণা
অন্যান্যবার ভোটের আগে যে কোনো রাজ্যের জন্য বাজেটে কল্পতরু হয়ে ওঠে কেন্দ্র। অতীতে বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষেত্রে আমরা এমনটা দেখেছি। ২০২৬-এ বাংলার বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি। তাই মনে করা হয়েছিল, মনরেগা (MNREGA) বা আবাস যোজনার জট কাটাতে বড় কোনো ঘোষণা আসবে। কিংবা কৃষকদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা।
কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (বা তৎকালীন অর্থমন্ত্রী) বাংলার নাম নিলেন হাতেগোনা কয়েকবার। আর সেই কয়েকবার উচ্চারণে যা বেরিয়ে এল, তা হলো:
১. শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী হয়ে দিল্লি হাইস্পিড রেল (High-Speed Rail Corridor): উত্তরবঙ্গকে পাখির চোখ করে এই ঘোষণা। বন্দে ভারত বা বুলেট ট্রেনের ধাঁচে শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী হয়ে দিল্লি পর্যন্ত উচ্চ গতির ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- বিশ্লেষণ: নিঃসন্দেহে এটি উত্তরবঙ্গের পর্যটন এবং যোগাযোগের জন্য বড় খবর। কিন্তু এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্ট। এর সুফল সাধারণ মানুষ কবে পাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাছাড়া, নিত্যযাত্রী বা সাধারণ মানুষের টিকিটের নাগালের মধ্যে এই ট্রেন থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন।
২. ডানকুনি থেকে সুরাত ফ্রেট করিডর (Freight Corridor): শিল্পের পুনরুজ্জীবনে ডানকুনিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডানকুনি থেকে গুজরাটের সুরাত পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য বিশেষ করিডর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- বিশ্লেষণ: এটি বাস্তবায়িত হলে লজিস্টিকস এবং বাণিজ্যের উন্নতি হবে। কিন্তু কর্মসংস্থান বা পকেটে সরাসরি টাকার যোগান—যা এই মুহূর্তে বাংলার মানুষের প্রধান দাবি, তার কোনো দিশা এতে নেই।
এই দুটি ঘোষণা ছাড়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বা গ্রামোন্নয়নে বাংলার জন্য আলাদা করে কোনো ‘স্পেশাল প্যাকেজ’ বরাদ্দ করা হয়নি।
আরও পড়ুন: ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
বাজেট শেষ হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে রাজ্যের শাসক দল এবং বিরোধীরা। তাদের মতে, এটি বাংলার প্রতি কেন্দ্রের প্রতিহিংসামূলক আচরণ।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাহুল চক্রবর্তী (Rahul Chakraborty) ঝাঁঝালো প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “যারা রোজ টিভিতে এসে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন ফেরি করেন, বাজেটের দিন বোঝা গেল তাঁদের কাছে বাংলার জন্য কোনো রোডম্যাপই নেই। ভোটের আগে ভেক ধরা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলা ওদের কাছে সেই সৎ সন্তান (Step Child), যার দিকে ফিরেও তাকানো হয় না।”
বাম-কংগ্রেস নেতৃত্বও সুর চড়িয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, “উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করার জিগির তোলে যারা, তারা আজ শিলিগুড়ির মানুষকে হাইস্পিড রেলের ললিপপ দেখাচ্ছে। চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য কোনো প্যাকেজ নেই, পাট শিল্পের জন্য কোনো ঘোষণা নেই। এই বাজেট জনবিরোধী।”
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া: হতাশা ও দীর্ঘশ্বাস
হাওড়া স্টেশনের নিত্যযাত্রী থেকে শুরু করে কাকদ্বীপের মৎস্যজীবী—বাজেট নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই কোথাও।
রমেন দাস (মধ্য়বিত্ত চাকুরিজীবী): “ভেবেছিলাম ট্যাক্স স্ল্যাবে বড় ছাড় পাব। কিন্তু আমাদের জন্য কিছুই নেই। হাইস্পিড ট্রেনে চড়ার পয়সা আমাদের নেই, আমাদের দরকার লোকাল ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা।”
সুকুমার মাহাতো (পুরুলিয়ার কৃষক): “সার দেওয়া হলো না, সেচের জলের ব্যবস্থা হলো না। দিল্লি অনেক দূর, আমাদের কান্না ও অবধি পৌঁছায় না।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: রাজনীতি নাকি অর্থনীতি?
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, এই বাজেটে কেন্দ্র হয়তো ‘পপুলিস্ট’ বা জনমোহিনী পথে না হেঁটে পরিকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারে জোর দিতে চেয়েছে। হাইস্পিড রেল এবং ফ্রেট করিডর—দুটিই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতির জন্য ভালো। ডানকুনি থেকে সুরাত করিডর তৈরি হলে পূর্ব ভারতের সঙ্গে পশ্চিম ভারতের বাণিজ্যের পথ সুগম হবে।
কিন্তু অন্য অংশের মত, ভারতের মতো ফেডারেল কাঠামোয় ভোটের আগে রাজ্যের দাবিদাওয়াকে উপেক্ষা করা রাজনৈতিকভাবে ‘রিস্কি’ হতে পারে। বিশেষ করে যখন ১০০ দিনের কাজের টাকা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত চরমে, তখন বাজেটে সেই ক্ষতে মলম না দিয়ে উল্টে এড়িয়ে যাওয়াটা ভোটারদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৬-এর ইভিএমে কি প্রভাব পড়বে?
বাজেট শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক দলিলও বটে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটিই ছিল কেন্দ্রের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। বিজেপি চেয়েছিল উন্নয়নের বার্তা দিতে, আর তৃণমূল চেয়েছিল বঞ্চনার অভিযোগকে আরও জোরালো করতে।
আজকের বাজেটের পর রাজ্যের শাসক দল তাদের হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র পেল—”দিল্লি আমাদের দেখে না।” হাইস্পিড রেলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তরবঙ্গের মন কতটা রাখা যাবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গ এবং গ্রামীণ বাংলা, যারা মূলত ভতূর্কি এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা যে খালি হাতে ফিরল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
বাজেট পেশ শেষ। এবার শুরু হবে রাজনৈতিক তরজা। কিন্তু দিনের শেষে প্রশ্ন একটাই—দিল্লির হাইস্পিড ট্রেনের গতি কি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের চাকা ঘোরাতে পারবে? নাকি তা শুধুই নির্বাচনী জুমলা হয়েই থেকে যাবে? উত্তর মিলবে ২০২৬-এর ব্যালট বক্সে।
- বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটে বিশ্বকাপ জয়, তাকিয়ে ক্রিকেট বিশ্ব │ জানুন, তার ক্রিকেটে উত্থানের কাহিনী
- রেলে মিলবে এমার্জেন্সি কোটায় সিট | জানুন, কারা পাবেন এই বিশেষ সুবিধা, কীভাবে হয় অনুমোদন
- টাইম স্ট্রেটে প্রেমের পরীক্ষা │ জেনে নিন, ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে এই ৫টি কাজ করলেই জমে উঠবে রোমান্স
- জানেন কি, হাঁচি থেকে হতে পারে মৃত্যু? | নীরবে বাড়ছে অ্যালার্জির অজানা বিপদ | কী সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
- আলপনা শিল্প: লক্ষ্মীপুজোর উঠোনে আঁকা বাংলার নীরব ইতিহাস

