ভোটের ময়দানে UP-র ‘সিংহম’-এর ভিডিও ভাইরাল! UP Singham Ajaypal Sharma Bengal গর্জন মমতার গড়ে। তৃণমূলের পাল্টা চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভোটের উত্তাপে ফুটছে পশ্চিমবঙ্গ। প্রতিটি দফার ভোট শেষ হতেই পরের দফার প্রচারের পারদ চড়ছে। এই চরম উত্তেজনার আবহেই সোমবার বিকেলে রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন ঝড় তুলে দিল একটি বিতর্কিত ভিডিও। উত্তরপ্রদেশ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে আসা অজয়পাল শর্মা এখন খবরের শিরোনামে। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলায় দায়িত্ব পেয়েই তিনি যেভাবে গর্জন শুরু করেছেন, তা নিয়ে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে প্রবল বাদানুবাদ তৈরি হয়েছে। সোমবার অজয়পালের যে ভিডিওটি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে তিনি ফলতার তৃণমূল প্রার্থীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এই ভিডিও সামনে আসতেই বাংলার রাজনৈতিক বাতাবরণে (Political Environment) কৌতূহল এবং উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই একে উত্তরপ্রদেশের ‘সিংহম’-এর স্টাইল ভাবলেও, বিতর্ক কিন্তু পিছু ছাড়ছে না।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা সেই বিতর্কিত ভিডিওর নেপথ্যের আসল কাহিনী এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে শাসক দল তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব, যা জানলে হয়তো আপনিও অবাক হবেন। উত্তরপ্রদেশের এক ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’কে বাংলায় নিয়ে আসা ঘিরে কেন এত বাদানুবাদ? কমিশনের এই পদক্ষেপের ওপর বাংলার মানুষ কতটা ভরসা রাখছে, তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। ভিডিওটির সত্যতা যদিও নিরপেক্ষ কোনো সূত্র দ্বারা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু তার প্রভাব বাংলার রাজনীতিতে যে পড়েছে, তা নিশ্চিত।
মমতার গড়ে ‘সিংহম’-এর প্রবেশ: ফলতার ভিডিও ঘিরে তোলপাড়
সোশ্যাল মিডিয়ায় হঠাৎ একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই বাংলার ভোট রাজনীতিতে উত্তেজনা চরমে। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের আইপিএস অফিসার অজয়পাল শর্মা। তিনি বর্তমানে কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলায় আছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা। ভিডিওর লোকেশন—ফলতা। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের বাড়ির সামনে। জুম করা ছবিতে দেখা যায়, অজয়পাল অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এই হুঁশিয়ারি কার জন্য? প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, তা সাধারণ ভোটারদের জন্য, আবার অনেকের মতে এর লক্ষ্য ছিলেন সরাসরি তৃণমূলের প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান।
এই ভিডিও সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। উত্তরপ্রদেশের হাই-প্রোফাইল ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ বাংলার মিশ্র সংস্কৃতির (Cosmopolitan Culture) মানুষদের ওপর এভাবে গর্জন শুরু করায় কী প্রভাব পড়বে? বিশেষ করে, যে কেন্দ্রে লড়াই তীব্র, সেখানে এমন ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা (Political Tension) আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অজয়পালের পরিশীলিত বাচনভঙ্গি এবং আধুনিক স্টাইল উত্তরপ্রদেশে জনপ্রিয় হলেও, বাংলায় তাঁর এই আচরণ নিয়ে এখন কৌতূহল ও বিতর্ক সমান তালে চলছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, এটি ভোটারদের ভয় দেখানোর সুপরিকল্পিত কৌশল। তারা মনে করছে, বিজেপি বাংলার আইনশৃঙ্খলা ভাঙার চেষ্টা করছে।
‘দাওয়াই’ দেওয়ার হুঙ্কার: ভিডিও কী বলছে?
ভিডিওতে কী এমন বলেছিলেন অজয়পাল শর্মা, যা নিয়ে এত বিতর্ক? কমিশনের পর্যবেক্ষককে বলতে শোনা যায়, “আশপাশে যারা আছেন, ভাল করে বুঝে নিন— কেউ কোনও বদমায়েশি করলে, তাদের ঠিকঠাক দাওয়াই দেওয়া হবে। যদি কোনও জায়গা থেকে খবর আসে যে কেউ গোলমাল পাকানোর বা কাউকে বিরক্ত করার চেষ্টা করছেন, তাঁর ভাল ভাবে খবর নেব আমরা।” এই ‘দাওয়াই’ শব্দবন্ধটি উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের শাসনের সমার্থক হিসেবে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। বাংলায় কমিশনের পর্যবেক্ষক যখন এই শব্দ ব্যবহার করেন, তখন তার একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব (Psychological Impact) তৈরি হয় সাধারণ ভোটারদের মনে।
এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। অজয়পাল বলেন, “জাহাঙ্গিরের বাড়ির লোকেরাও দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে ভাল ভাবে বুঝিয়ে দেবেন। বার বার খবর আসছে, তাঁর লোকেরা হুমকি দিচ্ছেন। এমন হলে ভাল করে খবর নেব। তার পরে কান্নাকাটি করা বা পস্তানো যাবে না।” এই মন্তব্য সরাসরি তৃণমূল প্রার্থীকে ইঙ্গিত করে করা বলে তারা অভিযোগ করছে। তারা মনে করছে, কমিশনের এই পর্যবেক্ষক বিজেপির হয়ে কাজ করছেন এবং ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।
পাল্টা চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তৃণমূলের: পুরনো দুর্নীতি ও যৌন কেলেঙ্কারি সামনে?
এই হুঁশিয়ারির ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই অজয়পালের বিরুদ্ধে পাল্টা সুর চ়ড়িয়েছে তৃণমূল। তারা কমিশনের কাছে যেমন অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনই সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তাঁর পুরনো কুণ্ডলী সামনে এনেছে। তৃণমূলের তরফে অভিযোগ, অজয়পাল উত্তরপ্রদেশে একজন ‘সিংহম’ হিসেবে পরিচিত হলেও, তিনি একজন ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ এবং ‘প্রতারক’ পুলিশকর্তা। তারা দাবি করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ, তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার গভীর অভিযোগ আছে।
সাংবাদিক বৈঠক ডেকে বলা হয়, “অজয়পাল শর্মা ডায়মন্ড হারবারের নিরীহ মানুষদের ধমকাচ্ছে, চমকাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে মানুষের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। রাতের অন্ধকারে তল্লাশির নাম করে বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের সঙ্গে অশ্লীল ব্যবহার করছে। মহিলাদের গায়ে হাত দিচ্ছে। এই অজয়পাল শর্মা একটা রঙিন চরিত্র। ২০২০ সালের মার্চে দু’টি তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। যেখানে প্রথম তদন্তটি ছিল দুর্নীতির। দ্বিতীয় তদন্তটি ছিল বিশ্বাসভঙ্গের। একজন মহিলার বিশ্বাস অর্জন করে তাঁর সঙ্গে চিটিংবাজি, ফেরেববাজি করা।” তৃণমূলের এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ কমিশনের পর্যবেক্ষকের নিরপেক্ষতা (Neutrality) নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। শাসক দলের এই দাবি ভোটের ময়দানে এক নতুন উত্তেজনা (New Excitement) সৃষ্টি করেছে।
বাংলার রাজনীতিতে জোড়া বাদানুবাদ: ‘সিংহম’ বনাম অভিযোগপত্র
তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের এই জোড়া অভিযোগ বাংলার রাজনীতিতে এখন তুঙ্গে। বিজেপি অবশ্য কমিশনের পর্যবেক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা তৃণমূলের আমলে ভেঙে পড়েছে, তাই কমিশনের এই কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিজেপি নেতৃত্ব বলছেন, যারা নিজেদের এলাকায় দুর্নীতি এবং ত্রাস সৃষ্টি করেছে, তারা এখন উত্তরপ্রদেশের ‘সিংহম’-এর নাম শুনে ভয় পেয়েছে এবং অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করছে।
তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুতে এক চুলও ছাড়তে রাজি নয়। তারা অজয়পাল শর্মার উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, “আপনি যদি মনে করেন ৪ মে-র পর আপনি আপনার রাজ্যে ফেরত চলে যাবেন এবং সেখানে বিজেপির মালিকেরা আপনাকে বাঁচিয়ে নেবে— তা হলে আপনি ভুল করছেন। আমাদের নজর আছে আপনার উপরে। আপনি পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না। আপনি যে রাজ্যে চলে যান, যে বিজেপি নেতার হাত আপনার মাথার উপরে থাকুক না কেন, আপনার নামে এফআইআর হবে। আপনার নামে চার্জশিট হবে। আপনাকে ঘেঁটি ধরে এ রাজ্যের আদালতে নিয়ে আসা হবে। আইনের সামনে আপনাকে ফেলা হবে। আইনের কঠোর থেকে কঠোর ব্যবস্থা আপনার বিরুদ্ধে নেওয়া হবে।” এই বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ (Psychological Pressure) তৈরির কৌশল রাজ্যের শাসনব্যবস্থা এবং কমিশনের পর্যবেক্ষকের লড়াইকে এক চরম অবস্থানে নিয়ে গেছে।
উপসংহার: ভোটের ময়দানে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
সব মিলিয়ে বলা যায়, উত্তরপ্রদেশের পুলিশকর্তা অজয়পাল শর্মার বাংলায় প্রবেশ এবং ফলতার ভিডিও ঘিরে বাদানুবাদ রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কমিশনের এই পদক্ষেপ ভোটারদের মনে কতটা নিরাপত্তা এবং কতটা ভীতি তৈরি করেছে, তা নিয়ে রয়েছে গভীর সন্দেহ। শাসক দল তৃণমূল যেখানে এই পদক্ষেপকে ‘বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে দেখছে, সেখানে বিজেপি একে ‘সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন’-এর জন্য অপরিহার্য মনে করছে।
ভোটের ফল প্রকাশের দিন সব বাদানুবাদের অবসান হবে নিশ্চিত। কিন্তু তার আগে কমিশনের এই বিশেষ পর্যবেক্ষকের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর বাংলার মানুষ এবং রাজনৈতিক মহলের নজর থাকবে। এই জোড়া গ্যাজেট বা জোড়া বাদানুবাদ—কোনটি সাধারণ ভোটারের মনে বেশি প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে সাথে স্পষ্ট হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, খবরের শিরোনামে ডায়মন্ড হারবার এবং কমিশনের এই পর্যবেক্ষক এবার আরও বেশি করে জ্বলজ্বল করবে।
আপনার মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। এই বিষয়ে আরও নতুন এবং কৌতূহলোদ্দীপক খবর পেতে চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ।

