veteran actor Nana Patekar death: ভোরের আলো ফোটার আগেই এল শোকের খবর। পঁচাত্তর বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকর। আজ ভোর ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ তাঁর মৃত্যুর ঘোষণা করা হয়। গোয়ার দোনা পাউলার নিজের বাসভবনে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর নিঃসন্দেহে তাঁর অভিনয়জীবনের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কাছে গভীর শোকের। কিন্তু তাঁকে শুধুমাত্র একজন অভিনেতা হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অদেখাই থেকে যায়। অভিনয়ের বাইরেও নানা পাটেকরের জীবনে ছিল সংগ্রাম, পরিশ্রম, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ পথচলা। বিশেষ করে কৃষক ও কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা তাঁকে অন্য পরিচিতিও দিয়েছে।
অভাবের মধ্যেই কেটেছিল শৈশব
নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার। মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুড়-জঞ্জিরায় তাঁর জন্ম। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার মুম্বইয়ে চলে আসে। ছোটবেলার দিনগুলি মোটেই স্বচ্ছল ছিল না। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি তাঁকে খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
তাঁর বাবার ব্যবসা ডুবে যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক চাপ বেড়ে যায়। ফলে ছোট বয়স থেকেই নানা পাটেকরকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে রোজগার করতে হয়েছিল। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের সেই দিনগুলির কথা বলেছেন। পোস্টার আঁকা থেকে শুরু করে ছোটখাটো নানা কাজের মাধ্যমে তিনি জীবনের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতাগুলিই হয়তো পরবর্তীকালে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল। মানুষের অভাব, সংগ্রাম এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তাই পরবর্তী জীবনে যখন তিনি নিজে প্রতিষ্ঠিত হন, তখন সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের সমস্যা তাঁর কাছে শুধুমাত্র দূরের কোনও বিষয় হয়ে থাকেনি।
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ ছিল সৃজনশীলতার দিকে। মুম্বইয়ের সার জে জে স্কুল অব আর্টে তিনি পড়াশোনা করেন। আঁকা এবং প্রয়োগমূলক শিল্পের সঙ্গে তাঁর শিক্ষাজীবনের যোগ ছিল। অর্থাৎ অভিনয়ের জগতে প্রবেশের আগেই শিল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে, ধীরে ধীরে তৈরি হল পরিচয়
অভিনয়জগতে নানা পাটেকরের যাত্রা শুরু হয়েছিল মারাঠি মঞ্চ থেকে। মঞ্চে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই তিনি নিজের অভিনয়ের ভিত তৈরি করেন। মঞ্চের অভিজ্ঞতা তাঁকে চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে এবং সংলাপের সঙ্গে আবেগকে যুক্ত করতে সাহায্য করেছিল।
তাঁর পরিচিত মঞ্চনাটকের মধ্যে রয়েছে ‘পুরুষ’। মঞ্চের পর চলচ্চিত্রেও ধীরে ধীরে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে মুজাফফর আলির পরিচালনায় ‘গমন’ চলচ্চিত্রে তাঁর কাজের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর ‘আক্রোশ’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে আরও পরিচিত করে তোলে।
তবে তাঁর অভিনয়জীবনের বড় সাফল্যের অন্যতম হয়ে ওঠে ‘আঙ্কুশ’ এবং ‘সালাম বম্বে’। এরপর ‘পরিন্দা’ চলচ্চিত্রের আনা শেঠির চরিত্র তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ছিল চরিত্রকে শুধু সংলাপের মধ্যে আটকে না রেখে তার ভেতরের দ্বন্দ্ব, রাগ, যন্ত্রণা এবং মানবিকতাকে প্রকাশ করা।
তবে আজ তাঁর মৃত্যুর দিনে তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি আরও একটি পরিচয়ের কথাও সামনে আসে—মানুষের পাশে দাঁড়ানো নানা পাটেকর।
অভিনয়ের বাইরেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ
নানা পাটেকর প্রশিক্ষণ নিয়ে টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের পাশাপাশি সমাজের সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল।
২০১৫ সালে মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি নাম ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো। মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, ঋণ, ফসলহানি এবং কৃষক আত্মহত্যার কারণে বহু পরিবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল। সেই পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংগঠনটি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় এক হাজার কৃষক পরিবারকে প্রত্যেককে পনেরো হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নানা পাটেকরের সামাজিক কাজের ভাবনা শুধু অর্থ সাহায্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মনে করতেন, কৃষকের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য জল, কৃষি, জীবিকা, মানসিক সহায়তা এবং বাজারের সুযোগ—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
জল সংরক্ষণ থেকে গ্রাম উন্নয়ন
নাম ফাউন্ডেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে ওঠে জল সংরক্ষণ এবং খরা মোকাবিলা। বিভিন্ন গ্রামে নদী ও নালা খনন, জলাশয় পুনরুজ্জীবন, খাল গভীর করা, কৃষি জলাধার তৈরি, বাঁধ ও জলসংরক্ষণ কাঠামো সংস্কার এবং বৃষ্টির জল ধরে রাখার মতো কাজের সঙ্গে সংগঠনটি যুক্ত হয়।
এই কাজগুলির উদ্দেশ্য ছিল শুধু জল জমিয়ে রাখা নয়। বর্ষার জল যাতে দ্রুত বেরিয়ে না যায়, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর যাতে উন্নত হয় এবং কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ যাতে বাড়ে—সেই দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
সংস্থার কাজ সম্পর্কে একটি প্রকল্প প্রতিবেদনে এক হাজার ত্রিশটিরও বেশি জলসংকটগ্রস্ত গ্রামে জল সংরক্ষণ এবং জলস্তর উন্নয়নের কাজের উল্লেখ রয়েছে।
এর পাশাপাশি কৃষকদের কৃষিপদ্ধতি, জল ব্যবহারের কৌশল, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, ফসল নির্বাচন এবং বিকল্প জীবিকার মতো বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কৃষক পরিবারের পাশে, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য
কৃষক আত্মহত্যার পরে একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অনেক সময় এসে পড়ে পরিবারের মহিলাদের ওপর। সেই বাস্তবতার কথাও নাম ফাউন্ডেশনের কাজের মধ্যে উঠে এসেছে।
কৃষক পরিবারের মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলার জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি, সেলাই প্রশিক্ষণ, ছোট ব্যবসার সুযোগ এবং স্থানীয় প্রশাসনে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মতো উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।
এর উদ্দেশ্য ছিল পরিবারগুলিকে দীর্ঘদিন অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না রেখে নিজেদের আয় করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। অর্থাৎ সাহায্য করার পাশাপাশি পরিবারগুলিকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর পথও তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এই জায়গাতেই নানা পাটেকরের সামাজিক কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। তিনি শুধু সমস্যার মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চাননি; সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথও খুঁজতে চেয়েছিলেন।
জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—বিস্তৃত হয়েছিল কাজের পরিধি
নাম ফাউন্ডেশনের কাজ শুধু কৃষকদের আর্থিক সহায়তা বা জল সংরক্ষণে থেমে থাকেনি। বিভিন্ন গ্রামে শৌচাগার নির্মাণ, স্কুল সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ শিক্ষা পরিকাঠামো শক্তিশালী করার মতো কাজের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বৃক্ষরোপণ নিয়েও সংগঠনটির উদ্যোগ ছিল। ২০১৬ সালে এক কোটি গাছ লাগানো ও সংরক্ষণের পরিকল্পনার কথা প্রকাশিত হয়েছিল। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল মাটির ক্ষয় কমানো, বৃষ্টির জল ধরে রাখা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদে খরা মোকাবিলায় সহায়তা করা।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—এক কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য এবং বাস্তবে কত গাছ লাগানো হয়েছে, এই দুটি বিষয় এক নয়। তাই লক্ষ্যসংখ্যাকে অর্জিত ফলাফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
পরবর্তীতে সংগঠনের কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। কাশ্মীরের স্কুল উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগের সঙ্গেও সংগঠনটির যুক্ত থাকার কথা ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
একজন অভিনেতার বাইরে যে মানুষটিকে মনে রাখবে মানুষ
নানা পাটেকরের জীবনকে যদি শুধু চলচ্চিত্রের আলোয় দেখা হয়, তাহলে তাঁর জীবনের অনেকটা অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা, অল্প বয়সে কাজ করা, শিল্প নিয়ে পড়াশোনা, মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করা এবং পরে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়া—এই পুরো পথটাই ছিল সংগ্রামের।
কিন্তু সেই সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং কৃষক পরিবারের দুর্দশা, খরা, জলসংকট এবং গ্রামীণ মানুষের জীবনের নানা সমস্যার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পরিচয়ের আরেকটি দিক তৈরি করেছিলেন।
নাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, জল সংরক্ষণ, কৃষি প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা, মহিলাদের স্বনির্ভরতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং গ্রামীণ পরিকাঠামোর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
আজ তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর তাই নানা পাটেকরকে শুধু একজন প্রবীণ অভিনেতা হিসেবে মনে করার পাশাপাশি তাঁর জীবনের সেই সামাজিক অধ্যায়কেও মনে রাখা প্রয়োজন। পর্দায় তিনি যে চরিত্রগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন, পর্দার বাইরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও তিনি নিজের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
তাঁর জীবন যেন মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয় কখনও শুধুমাত্র তার পেশায় আটকে থাকে না। একজন অভিনেতার পরিচয়ের পাশাপাশি একজন শিল্পী, একজন সংগ্রামী মানুষ এবং সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক ব্যক্তির পরিচয়ও একই জীবনের অংশ হয়ে থাকতে পারে।
আজ ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁর জীবনের পথচলা থেমে গেল। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের স্মৃতির পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই অধ্যায়ও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থেকে যাবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

