নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রশাসন এবং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিল নিয়ে বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির বিধান, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নে কাজে লাগানো, পিএইচডি গবেষণার ধারাবাহিকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে দায়বদ্ধতার ভারসাম্য। একই সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্লোগান নিয়েও কড়া অবস্থান জানান তিনি।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বদলির বিধান রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা দপ্তর সেই শূন্যতা পূরণ করতে চাইছে। তবে এই বদলির বিধান প্রত্যেক শিক্ষককে নিয়মিতভাবে স্থানান্তরের জন্য নয়, প্রশাসনিক প্রয়োজনে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবেই রাখা হচ্ছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। গবেষণারত ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ নিয়েও আশ্বাস দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি নিয়ে সরকারের যুক্তি কী?
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির বিধান না থাকাটা একটি আইনি শূন্যতা তৈরি করেছিল। তাঁর দাবি, কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যখন বদলির ব্যবস্থা রয়েছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক প্রয়োজনে এমন সুযোগ থাকা দরকার। উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সেই শূন্যতা পূরণের জন্যই এই সংশোধনী আনতে চাইছেন বলে তিনি জানান।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই আইন প্রত্যেক শিক্ষককে বদলি করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে না। প্রশাসনিক প্রয়োজনে বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, নিয়মিত বদলির বদলে এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে আরও উঠে আসে, রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সংখ্যা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা রয়েছেন, তাঁদের দক্ষতাকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি হল, কোনও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, গ্রন্থাগার বা গবেষণাগারের পরিকাঠামো না থাকে, তাহলে পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ জনবল সেখানে কাজে লাগতে পারেন। এর ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে।
পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা নতুন প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা
বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী রয়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং মেধাকে নতুন গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নে কাজে লাগানোর কথা তিনি তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দুর্বল অবস্থায় ফেলে না রেখে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অভিজ্ঞ শিক্ষক ও কর্মীদের সাহায্যে সেগুলিকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ জনবলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এখানে তিনি কার্যত পুরনো ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের কাছে থাকা জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র তাঁদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েছে। কোনও শিক্ষককে স্থায়ীভাবে বদলি করা হবে, নাকি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যে অবশ্য অস্থায়ী পদায়নের বিকল্প ব্যবস্থার কথাও সামনে এসেছে।
পিএইচডি গবেষণা নিয়ে কী বললেন শুভেন্দু?
বদলি সংক্রান্ত সংশোধনী নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি বিষয় হল গবেষণারত ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে কোনও শিক্ষক যদি পিএইচডি গবেষণার নির্দেশক হিসেবে কাজ করেন, তাঁকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে গবেষণার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী আশ্বাস দেন, বদলির কারণে পিএইচডি গবেষণার ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনটি প্রশাসনিক কারণে বদলির সুযোগ রাখছে, প্রতিটি শিক্ষককে বদলি করার জন্য নয়।
তিনি আরও বলেন, গবেষণা নির্দেশকের পরিবর্তন শুধু বদলির কারণেই ঘটে না। কোনও শিক্ষক অবসর নিতে পারেন, পদত্যাগ করতে পারেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদে যেতে পারেন, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকতে পারেন, এমনকি আকস্মিক মৃত্যুও হতে পারে। এই পরিস্থিতিতেও গবেষণার নির্দেশক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।
তাই কোনও শিক্ষক বদলি হলেই গবেষণা সম্পূর্ণভাবে থেমে যাবে—এই আশঙ্কা ঠিক নয় বলে তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম। গবেষণারত ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের থাকবে বলেও তিনি জানান।
অস্থায়ী পদায়নের কথাও সামনে
শিক্ষকদের সরাসরি বদলির পরিবর্তে অস্থায়ী পদায়নের বিকল্প নিয়েও বক্তব্যে আলোচনা হয়। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনে কোনও শিক্ষককে সম্পূর্ণভাবে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে না দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
এমন ব্যবস্থায় একজন শিক্ষক সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কাজ করতে পারেন এবং বাকি সময় নিজের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন—এই ধরনের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে।
এর ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অভিজ্ঞ শিক্ষক পেতে পারে, আবার পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ওই শিক্ষকের সম্পর্কও পুরোপুরি ছিন্ন হবে না। বিশেষ করে গবেষণার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে বলে বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে।
তবে এই ধরনের অস্থায়ী পদায়ন কীভাবে হবে, তার সময়সীমা কতটা হবে, শিক্ষকের সম্মতি প্রয়োজন হবে কি না এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমা কোথায় থাকবে—এই প্রশ্নগুলির বিস্তারিত উত্তর সংশোধিত আইন ও পরবর্তী সরকারি বিধিতে স্পষ্ট হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কী যুক্তি দিলেন?
বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁর যুক্তি, স্বায়ত্তশাসনের অর্থ নিজের মতো করে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থাকলেও জনগণের অর্থ এবং মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানের রয়েছে।
এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের সঙ্গে মানবসম্পদের ব্যবহারের বিষয়টিকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে—স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেও বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।
অন্য রাজ্যের উদাহরণ টেনে বদলির পক্ষে সওয়াল
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির বিধান নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী দেশের অন্য কয়েকটি রাজ্যের ব্যবস্থার উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে কর্ণাটক, কেরল, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট এবং বিহারের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন রাজ্যে প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষক-কর্মীদের বদলি কিংবা স্থানান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে।
কর্ণাটকের বিশ্ববিদ্যালয় আইনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনিক প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের বদলির ক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। কেরলে শিক্ষকদের আবেদনের ভিত্তিতে এবং জ্যেষ্ঠতার মতো বিষয় বিবেচনা করে বদলির ব্যবস্থা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উত্তরপ্রদেশে সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলির শিক্ষকদের বদলির সুযোগের কথাও বক্তব্যে উঠে আসে।
তবে কোন রাজ্যের কোন আইনের কোন ধারায় কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে, তার পূর্ণ আইনি ব্যাখ্যা বিধানসভায় এই বক্তব্যের মধ্যে দেওয়া হয়নি। ফলে এই তুলনাগুলির নির্দিষ্ট আইনি দিক আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কেন কড়া বার্তা?
বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনী নিয়ে বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। শুভেন্দু অধিকারী যাদবপুরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে সেটিকে উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেন।
তাঁর বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের প্রসঙ্গও উঠে আসে। যাদবপুরের শিক্ষা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি কড়া অবস্থান জানান। কাশ্মীরকে ঘিরে স্বাধীনতার স্লোগান, ভারতবিরোধী বক্তব্য, ফিলিস্তিন সংক্রান্ত স্লোগান এবং কিষেণজিকে ঘিরে স্লোগানের উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জায়গা এবং সেখানে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে তিনি যে নির্দিষ্ট ঘটনাগুলির উল্লেখ করেছেন, সেগুলির প্রত্যেকটির পূর্ণ তদন্তের ফল বা বিচারিক সিদ্ধান্ত এই বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।
মিছিল ও জাতীয় পতাকা নিয়ে কী বললেন?
শিক্ষাঙ্গন থেকে মিছিল বের করা নিয়েও কড়া বার্তা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মিছিল করতে হলে পুলিশের অনুমতি নেওয়া উচিত। পাশাপাশি মিছিলে ভারতের জাতীয় পতাকা রাখার কথাও বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী ধরনের স্লোগান দেওয়া হলে সরকার সেই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে। এই প্রসঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভাষায় জবাব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্ন পাশাপাশি উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলেও তা যেন আইনশৃঙ্খলা বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
গেরুয়া বিতর্কেও কড়া অবস্থান
বিশ্ববিদ্যালয় আইন নিয়ে আলোচনার মাঝেই গেরুয়া রঙকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রসঙ্গও তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গেরুয়া কোনও একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়। ভারতের জাতীয় পতাকার উপরের অংশে গেরুয়া রং রয়েছে এবং স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে গেরুয়া পোশাকের ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বেছে বেছে গেরুয়া পোশাক বা সনাতন ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করা হচ্ছে। মাথায় শিখা, গলায় তুলসীর মালা বা গেরুয়া পোশাক পরার কারণে কাউকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর বক্তব্যে মুসলিম, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনের অধিকারের কথাও উঠে আসে। একইভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় পরিচয় ও আচার পালনের ক্ষেত্রেও বাধা থাকা উচিত নয় বলে তিনি দাবি করেন।
সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়েও আক্রমণ
বক্তব্যের অন্য একটি অংশে নাম না করে একটি সংবাদপত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু হত্যাকাণ্ড বা ঘটনার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম যে গুরুত্ব দেয়, অন্য কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব দেখা যায় না।
তিনি পাহাড়গাম, হরবিজ্ঞান দাস, চন্দন দাস এবং সামশেরগঞ্জের সুজিত মণ্ডলকে নিয়ে মন্তব্য করেন। এই ঘটনাগুলি সম্পর্কে তিনি যে অভিযোগগুলি করেছেন, সেগুলি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হিসেবেই সামনে এসেছে। বক্তব্যের মধ্যে ওই ঘটনাগুলির তদন্ত বা বিচারিক নিষ্পত্তির বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
একই সঙ্গে সাধু-সন্তদের বক্তব্য এবং তাঁদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মত প্রকাশের বিষয়েও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, কেউ কোনও সাধুর বক্তব্য গ্রহণ করবেন কি না, সেটি ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু কারও উপর কোনও মত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনী নিয়ে বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে সরকারের অবস্থান বেশ কয়েকটি স্তরে স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে বদলির সুযোগ তৈরি করতে চাইছে সরকার। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয়ত, পিএইচডি গবেষণার ধারাবাহিকতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বদলির ক্ষমতা কতটা সীমিত থাকবে, তার অপব্যবহার রুখতে কী ধরনের সুরক্ষা থাকবে, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে নতুন বিধানের ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে এবং গবেষণারত ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত করা হবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসতে পারে।
বিধানসভায় বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনী নিয়ে শুধু শিক্ষক বদলির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো, গবেষণার ধারাবাহিকতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক পরিবেশ। এখন নজর থাকবে সংশোধিত আইনের নির্দিষ্ট বিধান এবং তা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, তার দিকে

