Why Iran survived against Israel and US : শক্তিধরদের বিরুদ্ধে ইরানের গোপন যুদ্ধনীতি: ছায়াযুদ্ধ, ড্রোন আক্রমণ ও কূটকৌশলের চমকপ্রদ রহস্য! শুধু সামরিক শক্তি নয়, এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত কৌশল, গোয়েন্দা দক্ষতা, এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঠিক ব্যবহার। এক রহস্যময় সামরিক মস্তিষ্কের উত্থান। জানুন, ইরানের প্রতিরোধের গল্প।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সতেরো দিনের সংঘাত, কিন্তু তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব রাজনীতির ওপর। ইজরায়েলকে ঘিরে এই যুদ্ধ যেন আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখনো ভাসছে গোলাবারুদের গন্ধ, আর সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সবচেয়ে আলোচিত নাম—ইরান।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে ইরান যেন এক রহস্যময় খেলোয়াড়। এখানে যুদ্ধ মানেই সরাসরি সংঘর্ষ নয়—বরং ছায়াযুদ্ধ, কূটনৈতিক চাপ, এবং প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল ও বহুস্তরীয় কৌশল। একদিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের মতো শক্তিধর রাষ্ট্র, অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্রশক্তি—এই দ্বন্দ্বে টিকে থাকা তো দূরের কথা, ইরান বারবার পাল্টা আঘাত হেনে দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই মাথা নত করতে রাজি নয়।
আরও পড়ুন : কেন মোজতবা খামেনির হাতেই ক্ষমতা? ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাকেই কেন বেছে নেওয়া হল
প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এই প্রতিরোধ? কার নেতৃত্বে ইরান এমন বলিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছে? কী সেই কৌশল, যা ইরানকে একইসঙ্গে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক শক্তিতে পরিণত করেছে? এই প্রতিবেদনে আমরা জানাবো—ইরানের বর্তমান সামরিক নীতি কী, কোন কৌশলে তারা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, এবং কারা রয়েছেন এই যুদ্ধের নেপথ্যের মূল নেতৃত্বে।
ইরান আমেরিকা যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়, যখন দুই দেশ সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিনিময়ে জড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়, কারণ এতদিন ছায়াযুদ্ধের আড়ালে থাকা সংঘাত প্রথমবার প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
এরপর ২০২৫ সালে শুরু হয় বহুল আলোচিত বারো দিনের যুদ্ধ। এই সংঘাতে ইজরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক সামরিক আক্রমণ চালায়, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো। পাল্টা হিসেবে ইরানও প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং একাধিক আক্রমণ চালায়। যুদ্ধের তীব্রতা দ্রুত বাড়লেও, আন্তর্জাতিক চাপ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে শেষ পর্যন্ত একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাতের আবহ অব্যাহত থাকে, এবং পরিস্থিতি ক্রমশ আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
অবশেষে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল আবারও যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে। আক্রমণের প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ৯০০টি স্ট্রাইক চালানো হয়, যা ছিল নজিরবিহীন এবং অত্যন্ত পরিকল্পিত এক হামলা। এই ভয়াবহ আক্রমণের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন বলে জানা যায়, যা শুধু ইরানের রাজনীতিতেই নয়, গোটা বিশ্ব রাজনীতিতেও এক গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান সংঘাত কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়—এর শিকড় প্রায় সাত দশক পুরোনো। ১৯৫৩ সালে এই দ্বন্দ্বের সূচনা হয়, যখন ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক দেশের তেলশিল্প জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সরাসরি আঘাত হানে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থে।
তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন থেকেই মূলত ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের শুরু। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, যা ধীরে ধীরে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
এই উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে। এই বিপ্লব শুধু ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকেই বদলে দেয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার এক স্পষ্ট বার্তা দেয়। সেই সময় থেকেই ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক চরম বৈরিতার দিকে এগিয়ে যায়, যা আজও অব্যাহত।
পরবর্তীকালে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়।
তবে ২০১৮ সালে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়, যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়।
এই সময়েই ট্রাম্প প্রশাসন “ম্যাক্সিমাম প্রেসার” বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল ইরানকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা। এই নীতির ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় এবং সংঘাতের সম্ভাবনা তীব্র হয়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসার পরও একই নীতি অব্যাহত রাখেন, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও জটিল ও সংঘাতপূর্ণ করে তোলে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই হঠাৎ তৈরি হয়নি—বরং ১৯৫৩ সালের তেল রাজনীতি থেকে শুরু করে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব, পারমাণবিক চুক্তি এবং “ম্যাক্সিমাম প্রেসার” নীতির ধারাবাহিকতা মিলিয়েই আজকের এই সংঘাতের রূপ তৈরি হয়েছে।
ইরানের যুদ্ধনীতির কৌশল (Why Iran survived against Israel and US)
ইরানের বর্তমান যুদ্ধনীতির কেন্দ্রে রয়েছে এক অনন্য কৌশল—সময়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি দ্রুত জয় নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
এই কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিপুল সংখ্যক ড্রোন। বিশেষ করে ‘ঝাঁক ড্রোন’ বা একসঙ্গে বহু ড্রোন পাঠানোর কৌশল তাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এর লক্ষ্য শুধু আঘাত হানা নয়, বরং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে দেওয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কৌশলকে বলা যায় “ক্ষয়যুদ্ধ” বা দীর্ঘমেয়াদি চাপের যুদ্ধ। কারণ তারা বছরের পর বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সাইবার অভিযান চালিয়ে যেতে সক্ষম। এর বড় কারণ, এই অস্ত্রগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশীয় সুরক্ষিত কারখানায় এগুলো তৈরি করা সম্ভব।
২০২৫ সালের পাল্টা হামলায় ইরান মূলত ইসরায়েল এবং আশপাশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তবে ২০২৬ সালে তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। তেহরান তাদের আক্রমণের পরিধি বাড়িয়ে একাধিক দেশে ছড়িয়ে দেয়—বাহারিন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো উপসাগরীয় দেশগুলিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
এই আক্রমণগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত কৌশলের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই বেসামরিক অবকাঠামোকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে, যা প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তোলে।
তবে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক অস্ত্র। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি বা সম্ভাবনাই বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়।
ফলে, এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বা হুমকি তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ইতিমধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, সময়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, কম খরচে উচ্চ প্রভাবের প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণ, বহুমুখী সামরিক চাপ এবং অর্থনৈতিক কৌশল—এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ইরানের বর্তমান যুদ্ধনীতি।
এই কৌশলগুলির মাধ্যমেই ইরান টানা সতেরো দিন ধরে শক্তিধর দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং এখনো নিজেদের অবস্থান অটুট রেখেছে। শক্তিধর দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের চাপ তৈরির মূল ভিত্তি হলো তাদের “ফরওয়ার্ড ডিটারেন্স” নীতি—যা মূলত এক ধরনের অসম যুদ্ধকৌশল বা অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধনীতি। এই কৌশলের লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়, বরং শত্রুর সীমান্তের বাইরে থেকেই তাকে চাপে রাখা।
এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় আইআরজিসি-র কুদস ফোর্সের মাধ্যমে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীকে সংগঠিত ও পরিচালনা করে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া—এই গোষ্ঠীগুলোকেই ইরান তার ‘ফ্রন্টলাইন বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করে।
এই প্রক্সি বাহিনীগুলোর মাধ্যমে ইরান একাধিক ফ্রন্ট খুলে দেয়। তারা একসঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করে ইসরায়েল এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালায়। বিশেষ করে বাহারিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, জর্ডান এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো বারবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
এই হামলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা। একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমকে অতিরিক্ত চাপের মুখে ফেলা হয়, ফলে প্রতিরক্ষা ভেদ করা সহজ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, ইরান শুধু সামরিক আক্রমণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে তারা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। এর ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে, প্রক্সি বাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর আঘাত—এই তিন স্তরের সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমেই ইরান শক্তিধর দেশগুলোর বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক ও কার্যকর চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের টিকে থাকার অন্যতম বড় কারণ ছিল তাদের কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ। সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে না গিয়ে তারা আঘাত করেছে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল জায়গায়—ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমে।
ইন্টারসেপ্টর হল সেই ক্ষেপণাস্ত্র, যা শত্রুর ব্যালিস্টিক মিসাইলকে মাঝপথেই ধ্বংস করে দেয়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তিই ছিল এই ইন্টারসেপ্টর। কিন্তু ইরান দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে এই ইন্টারসেপ্টরগুলিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান প্রথমে ডিকয় (decoy) মিসাইল ব্যবহার করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলে। এরপর ধারাবাহিক আক্রমণে ইন্টারসেপ্টর স্টক দ্রুত কমিয়ে দেয়। ফলে পরবর্তী সময়ে যখন মূল আক্রমণ আসে, তখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের যুদ্ধের পর দেখা যায়, ইসরায়েলের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। এই দুর্বলতাই ইরানকে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়। যুদ্ধ শুধু ময়দানে হয় না—রাজনৈতিক মঞ্চেও তার প্রভাব সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে সেটাই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।
ইরান কীভাবে শক্তিধর দেশগুলোকে চাপে রেখেছে
যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। শুধু আন্তর্জাতিক মহল নয়, আমেরিকার অভ্যন্তরেও বিরোধিতা শুরু হয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এই বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিচালনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এমনকি ন্যাটো জোটের মধ্যেও মতবিরোধ তৈরি হয়। কিছু সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পাশাপাশি জি৭ দেশগুলো যৌথভাবে তেলের রিজার্ভ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্ব জুড়ে তেলের দাম প্রায় ১০% বৃদ্ধি পায়, এবং আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই অর্থনৈতিক চাপ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধের অদৃশ্য নায়ক (Why Iran survived against Israel and US)
অন্যদিকে, ইরান এই পরিস্থিতিকে কৌশলে কাজে লাগায়। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ও রাজনৈতিক বিভাজন তাদের জন্য একপ্রকার “স্ট্র্যাটেজিক বাফার” হিসেবে কাজ করে। যুদ্ধের মাঝেই ইরানের সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিনের সামরিক প্রধান মেজর জেনারেল আব্দুল রহিম মুসাভির মৃত্যু ইরানের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
কিন্তু এই শূন্যস্থান পূরণ করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ বাহিদি—যিনি শুধু একজন সেনা অফিসার নন, বরং একজন কৌশলবিদ এবং সংগঠক। বাহিদির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ইলেকট্রনিকসে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স, এবং কৌশলগত বিজ্ঞানে ডক্টরেট—এই তিনের সংমিশ্রণ তাকে আধুনিক যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
তিনি ১৯৭৯ সালে আইআরজিসিতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় গঠনে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আহমাদ বাহিদিকে অনেক বিশ্লেষক “Shadow Operator” বলে উল্লেখ করেন। কারণ, তার কাজ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়—তিনি যুদ্ধের পেছনের কৌশল তৈরি করেন।
তিনি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, প্রক্সি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন, এবং কূটনৈতিকভাবে সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করেন। কুদস ফোর্সে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এই নেটওয়ার্ক ইরানকে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।
এছাড়াও, ১৯৯০-এর দশকে সুদানে আল-কায়েদা নেতাদের সঙ্গে তার কৌশলগত যোগাযোগ ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় (Why Iran survived against Israel and US)। যদিও এই বিষয়টি বিতর্কিত, তবুও এটি তার আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করার ক্ষমতাকে তুলে ধরে। এই সমস্ত দক্ষতা মিলিয়ে বাহিদি এমন একটি বহুমাত্রিক যুদ্ধ কৌশল তৈরি করেন, যা শুধু সামরিক নয়—গোয়েন্দা, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সব দিক থেকেই শক্তিশালী। প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, অর্থনীতি এবং রাজনীতি- ইরান এই চারটি ক্ষেত্রেই একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছে। আর সেই কারণেই তারা একটি শক্তিশালী জোটের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স চাইছেন পঙ্কজ-ডিম্পল! মাঝখানে ফেঁসে গেলেন অপরশক্তি খুরানা?
- ‘গুজারিশ’-এর ইথান মাসকারেনহাস আজ বাস্তব! ১৩ বছরের যন্ত্রণার অবসান, দেশে প্রথমবার ইউথেনেশিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যুর) অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের
- স্বেচ্ছামৃত্যু কি ভারতে বৈধ? স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন কে করতে পারেন? ভারতে ইউথানেসিয়া নিয়ে কী বলছে আইন
- মাছ-মাংস না খেলেও শরীর থাকবে ফিট! জেনে নিন, ৩টি হেলদি সুস্বাদু নিরামিষ রেসিপি
- যোটক বিচার কি সত্যিই কাজ করে? বিয়ের আগে আসলে কোনটা জরুরি, কী বলছে আধুনিক বিজ্ঞান?

