Womanist Party of India: ভারতের রাজনীতিতে নারীর আলাদা পরিচয় গড়ার স্বপ্ন—২০০৩ সালে মুম্বই থেকে শুরু হয় সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত ‘ওম্যানিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’, যেখানে নারীর ৫০% প্রতিনিধিত্ব ও রাজনীতির নারীকরণের দাবি তুলে নতুন রাজনৈতিক ভাবনার সূচনা করা হয়।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রগুলোর একটি। এখানে বহু দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহু বছর ধরেই সক্রিয়। জাতীয় ও আঞ্চলিক—দু’ধরনের রাজনৈতিক দল মিলিয়ে ভারতের রাজনীতির পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। বিভিন্ন মতাদর্শ, বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের দলগুলো এই গণতন্ত্রকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। এই বহু দলীয় ব্যবস্থার মধ্যেই বারবার উঠে এসেছে শক্তিশালী নারী নেতৃত্বের উদাহরণ।
ভারতীয় রাজনীতিতে নারী নেত্রীরা বহুবার প্রমাণ করেছেন যে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে লিঙ্গ কোনো বাধা নয়। দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজেপির নেত্রী উমা ভারতী কিংবা তামিলনাড়ুর কিংবদন্তি নেত্রী জয়ললিতা, মায়াবতী, সুষমা স্বরাজ—এই সকল নেত্রীরা নিজেদের রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ভারতীয় রাজনীতিকে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছে।
তবে এত সব শক্তিশালী নারী নেতৃত্বের মধ্যেও একটি প্রশ্ন অনেক সময় সামনে আসে—ভারতে কি এমন কোনো রাজনৈতিক দল রয়েছে যা সম্পূর্ণভাবে নারীদের দ্বারা পরিচালিত? অর্থাৎ যেখানে প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে সদস্য—সবাই নারী? অনেকেরই হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। অথচ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এমন একটি দল সত্যিই রয়েছে। সেটি হলো Womanist Party of India, যা ভারতীয় স্ত্রীবাদী পক্ষ নামেও পরিচিত। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানব এই ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক দলটির ইতিহাস, লক্ষ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে।
ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত রাজনৈতিক দল (Womanist Party of India)
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে Womanist Party of India একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এই দলটি ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দলের মূল দর্শন হলো নারী ক্ষমতায়ন এবং সমাজে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। Womanist Party of India নিজেদেরকে একটি feminist বা স্ত্রীবাদী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই দলের সমস্ত সদস্যই নারী। অর্থাৎ দলের সংগঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব—সবকিছুই নারীদের দ্বারা পরিচালিত। দলের মতে, ভারতীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও পর্যাপ্ত নয়। তাই নারীদের জন্য একটি স্বাধীন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
এই দলটি মনে করে যে সমাজে নারী সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন—নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সমান অধিকার—প্রায়ই মূলধারার রাজনীতিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তাই সেই বিষয়গুলোকে সামনে আনতেই Womanist Party of India গঠিত হয়।
২০০৩ সালে যখন Womanist Party of India বা ভারতীয় স্ত্রীবাদী পক্ষ গঠিত হয়, তখন এই দলের নেতৃত্বেও ছিলেন সম্পূর্ণ নারীরাই। দলের সভাপতি ছিলেন বর্ষা কালে এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অভিশা কুলকর্ণী। তাঁদের নেতৃত্বেই এই রাজনৈতিক সংগঠন প্রথমবারের মতো নিজেদের একটি স্বতন্ত্র নারী-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের সামনে তুলে ধরে। দলের প্রতিষ্ঠাতারা শুরু থেকেই দাবি করেছিলেন, এটি শুধুমাত্র নারীদের জন্য একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে নারী পরিচালিত রাজনৈতিক দল। সংগঠনের সদস্য, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিল এই দলের মূল ভিত্তি। নেত্রীদের মতে, ভারতে নারী নেত্রী থাকলেও অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দল এখনও পুরুষ নেতৃত্বকেন্দ্রিক। সেই বাস্তবতার মধ্যেই এই দলটি নারীদের নেতৃত্বে একটি আলাদা রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করার চেষ্টা করে।
রাজনৈতিক দলটির মূল উদ্দেশ্য (Womanist Party of India)
তবে এই দলের লক্ষ্য শুধু নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নয়। তাদের মতে, feminist বা নারী-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে দেশের মূলধারার উচ্চ রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় নারী অধিকার বা নারী আন্দোলনের বিষয়গুলো সামাজিক আন্দোলনের স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কিন্তু সেই নারী-কেন্দ্রিক ভাবনাকে বড় রাজনৈতিক দলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসাই ছিল Womanist Party of India-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
শুরু থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে মুম্বাইয়ে ডান্স বার বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দলটি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সেই সময় মহারাষ্ট্র সরকার বার গার্লদের কর্মস্থল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে WPI তাদের পাশে দাঁড়ায়। দলের সাধারণ সম্পাদক ডা. অভিশা কুলকর্ণী এক সাক্ষাৎকারে জানান, দলের সভাপতি বর্ষা কালে নির্বাচনী প্রচারের জন্য বার মালিকদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে দলের অনেক সদস্য সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। ডা. কুলকর্ণীর মতে, শেষ পর্যন্ত বার মালিকরা তখনই সাহায্য করতে রাজি হন যখন তারা বুঝতে পারেন যে সরকারী সিদ্ধান্তের ফলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্য ছিল, অনেক ক্ষেত্রেই বার মালিকদের মূল আগ্রহ ছিল নিজেদের ব্যবসা বাঁচানো—বার গার্লদের কল্যাণ নয়।
বর্তমানে Womanist Party of India এখনও অস্তিত্বে রয়েছে বলে জানান ডা. কুলকর্ণী। তবে দলের সামনে কিছু আইনি ও সাংগঠনিক জটিলতা রয়েছে, যার মধ্যে আদালতের মামলাও রয়েছে। এই সমস্যাগুলি মিটে গেলে দলের নতুন কমিটি গঠনের জন্য অভ্যন্তরীণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে দলের সদস্যরা নিজেদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সামাজিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের যুগ্ম সম্পাদক পদ্মা নিকম বর্তমানে হকার ইউনিয়ন ও নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
প্রথম নারী পরিচালিত রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী প্রতিনিধি বৃন্দ
অন্যদিকে ডা. অবিশা ‘দেশভক্তি আন্দোলন’ নামে একটি অরাজনৈতিক সামাজিক উদ্যোগ শুরু করেছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন। উদাহরণস্বরূপ, গোরেগাঁও এলাকায় ম্যানগ্রোভ ধ্বংস, জমি দখল ও আবর্জনা ফেলার অভিযোগ উপেক্ষা করার জন্য তিনি এক ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (DCP)-এর বিরুদ্ধে আদালতে অবমাননার নোটিস পাঠিয়েছেন।এছাড়াও তিনি ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) সংশোধনের বিরুদ্ধেও স্বাক্ষর অভিযান চালিয়েছেন। এই সংশোধনী অনুযায়ী সাত বছরের কম শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে জেলের বাইরে থাকতে পারেন। ডা. অবিশার মতে, এই সংশোধন অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এর আওতায় পণ-নির্যাতন, প্রতারণা কিংবা অপহরণের মতো অপরাধও পড়তে পারে, যা সমাজের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মুম্বইয়ের উপকণ্ঠে ডোম্বিভিলি এলাকার এক মধ্যবিত্ত মারাঠা পরিবারে বড় হওয়া বর্ষা কলেজজীবনে একটি বামপন্থী নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি বাড়ি ছেড়ে বিহারে চলে যান এবং সেখানে ঝাড়খণ্ড মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে তিনি মুম্বইয়ে ফিরে এসে মারাঠি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং নারী অধ্যয়নের একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি গ্রামীণ এলাকায় সক্রিয় সামাজিক কাজ শুরু করেন।
ঠাণে জেলার শাহাপুর অঞ্চলের গ্রামগুলোতে নারীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন গ্রামীণ সমাজে নারীদের সমস্যার গভীরতা কতটা। ১৯৯১ সালে তিনি পশ্চিম মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারী উন্নয়নমূলক প্রকল্পে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি মদ্যপানের বিরুদ্ধে নারী আন্দোলন, জলসংরক্ষণ প্রকল্প এবং কিশোরী মেয়েদের সচেতনতা শিবির সংগঠিত করেন।
২০০৩ সালের ২৩ মার্চ বর্ষা কালে এবং তাঁর সহযোগীরা মিলে একটি ঘোষণা প্রস্তুত করেন, যার ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘ওম্যানিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’। সেই ঘোষণাপত্রে ছিল মোট ২১ দফা কর্মসূচি ও দাবি। এই দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল নির্বাচিত সংস্থাগুলিতে নারীদের জন্য সংরক্ষণ ৩৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা, সমবায় ব্যাঙ্ক, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বোর্ডে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, নারীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আলাদা মহিলা পুলিশ স্টেশন স্থাপন, এবং মহারাষ্ট্র রাজ্যের নারী নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।
এই কর্মসূচিগুলির মধ্য দিয়ে দলটি মূলত রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য সামনে আনে।তবে দলটি আত্মপ্রকাশ করার পরপরই রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। কেউ কেউ দাবি করেন, এই দলটি নাকি শরদ পাওয়ারের এনসিপি অথবা বিজেপির গোপন সমর্থনে গঠিত হয়েছে। আবার কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মনে করেছিলেন, শুধুমাত্র নারীদের কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলেই নারীদের সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের মতে, নারীর অধিকারের প্রশ্ন মূলত মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি বৃহত্তর বিষয়, যেখানে নারী ও পুরুষ—উভয়েরই যৌথ অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
শুরু থেকেই দলটির পথচলা খুব একটা মসৃণ ছিল না (Womanist Party of India)। সংগঠন গড়ে তোলা, পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান, রাজনৈতিক অবকাঠামো তৈরি—এই সমস্ত ক্ষেত্রেই দলটিকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ ভারতীয় রাজনীতিতে নির্বাচনী লড়াই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কঠিন। বর্ষা কালেও নিজে স্বীকার করেছিলেন যে এই বাস্তবতার মধ্যে নতুন একটি দল হিসেবে নির্বাচনে লড়াই করা সহজ নয়। তবুও তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, নারীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দল একদিন বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে এবং ভারতীয় রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়নের নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হবে।
#WomanistPartyOfIndia #WomenInPolitics #IndianPolitics #WomenEmpowerment #NewsOffBeat
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ঘরশত্রু বিভীষণ কি ইরানের সংকটের কারণ হল? আমেরিকা কোন বিশেষ বাহিনীকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে?
- বই পড়লে কি মন শান্ত হয়? জানুন, স্ট্রেস কমাতে কীভাবে এই বিশেষ থেরাপি কাজ করে
- গোলাপি মণীশ মলহোত্রা শাড়িতে নজর কাড়লেন সারা তেন্ডুলকর! অর্জুন-সানিয়ার রাজকীয় বিয়েতে চাঁদের হাট, জানুন অন্দরমহলের অজানা গল্প
- কে এই নতুন রাজ্যপাল আর. এন. রবি? জানুন তাঁকে নিয়ে তামিলনাড়ুর সমস্ত বিতর্ক ও যাবতীয় তথ্য
- কেন পদত্যাগ রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের? কারণ জানলে চমকে উঠবেন!

