Womens Day Brahmananda Keshab Chandra College: ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র কলেজে নারী দিবস উদযাপনে ছকভাঙা তিন নারীর জীবনের সংগ্রাম, সাফল্য ও সাহসিকতার গল্প উঠে এল। প্রশ্নহীন আনুগত্যের বিরুদ্ধে জোরালো বার্তায় অনুপ্রাণিত হলেন ছাত্রছাত্রী ও অধ্যাপকরা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সমাজের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা কি? অনেকেই বলবেন—অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা বা সুযোগের অভাব। কিন্তু বাস্তবে আরও একটি গভীর সমস্যা আছে—প্রশ্নহীন আনুগত্য। “আমরা বিনা প্রশ্নে নিয়ম মানতে থাকি, তার পিছনে যুক্তি থাক বা না থাক—প্রশ্নবিহীন আনুগত্যই দাসত্ব”—এই শক্তিশালী বক্তব্যই তুলে ধরলেন ডক্টর রোহিণী ধর্মপাল। সম্প্রতি ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র কলেজ-এ উদযাপিত নারী দিবসের অনুষ্ঠানে এই বক্তব্য যেন পুরো আলোচনার মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে।
এই অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব শুধু উদযাপন নয়—বরং সমাজের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেওয়া। ছকভাঙা পেশার তিনজন নারীর জীবনের অভিজ্ঞতা শুনে ছাত্রছাত্রী ও অধ্যাপকরা যেমন মুগ্ধ হয়েছেন, তেমনই অনুপ্রাণিতও হয়েছেন। এই প্রতিবেদনটি আপনাকে জানাবে—কীভাবে বাস্তব জীবনের সংগ্রাম, সাহস এবং সচেতনতা মিলে তৈরি করছে এক নতুন সমাজের পথ।
নারী দিবসের মূল ভাবনা (Womens Day Brahmananda Keshab Chandra College)
এই বছরের নারী দিবসের আলোচনার বিষয় ছিল—“উদ্ভাবন, অনুপ্রেরণা এবং ক্ষমতায়ন”—যা আধুনিক সমাজে নারীর ভূমিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি প্রাণবন্ত আলোচনামঞ্চ। ছাত্রছাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং অভিজ্ঞতার বিনিময়ে পুরো পরিবেশটি হয়ে ওঠে শিক্ষণীয় ও উদ্দীপনামূলক।
আজকের দিনে নারী শুধু গৃহকোণে সীমাবদ্ধ নয়—তিনি পুরোহিত, বাস কন্ডাক্টর, পুলিশ অফিসার—সব ক্ষেত্রেই নিজের পরিচয় তৈরি করছেন। এই অনুষ্ঠান সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে আলোচনার মূল বার্তা ছিল—নারী ও পুরুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজের অগ্রগতি অসম্ভব। শুধু নারী ক্ষমতায়ন নয়, বরং সমান অংশগ্রহণই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

ডক্টর রোহিণী ধর্মপালের সাহসী যাত্রা
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন ডক্টর রোহিণী ধর্মপাল, যিনি একাধারে শিক্ষাবিদ এবং পুরোহিত। তিনি রামকৃষ্ণ সারদা মিশন কলেজ-এর এডুকেশন বিভাগে কর্মরত। একজন নারী পুরোহিত, আবার অব্রাহ্মণ—এই পরিচয় নিয়েই তিনি সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। শুরুটা সহজ ছিল না। সামাজিক বাধা, কুসংস্কার এবং প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।
কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। বরং নিজের দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে কুমারী, বিধবা, ডিভোর্সি—সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করছেন। তার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হল—বৈদিক মন্ত্রের অনুবাদ। শুধু সংস্কৃত নয়, বাংলা ও ইংরেজিতেও মন্ত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়, যাতে উপস্থিত সকলেই বুঝতে পারেন।
তিনি বলেন, বৈদিক বিবাহ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি প্রকৃতি, পরিবেশ এবং জীবনের ভারসাম্যের কথাও বলে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সমাজে নতুন চিন্তার দরজা খুলে দেয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান বক্তা ডক্টর রোহিণী ধর্মপাল তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন এক অনন্য উত্তরাধিকারের গল্প। তিনি জানান, বৈদিক বিবাহ মন্ত্রগুলোর বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদের কাজ প্রথম শুরু করেছিলেন তাঁর মা। সেই উদ্যোগই আজ তাঁর জীবনের মূল শক্তি হয়ে উঠেছে। তিনি সেই লিগেসি বা উত্তরাধিকারকে বহন করে চলেছেন, এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দিচ্ছেন।
এই অনুবাদের মাধ্যমে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে—যাতে প্রত্যেকে বুঝতে পারেন মন্ত্রের অর্থ, তার দর্শন এবং তার সামাজিক গুরুত্ব। রোহিণী ধর্মপালের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে—প্রগতিশীল চিন্তাধারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত হতে পারে, যদি তা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
ছকভাঙা পেশার নারী (Womens Day Brahmananda Keshab Chandra College)
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আরও দুই অনন্য নারী— ডলি রানা এবং অনুসুয়া চক্রবর্তী। ডলি রানা, যিনি ৫৭ নম্বর বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করেন, সমাজের একেবারে ভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি। একটি পুরুষপ্রধান পেশায় কাজ করতে গিয়ে তাঁকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে।
তিনি জানান, প্রথমদিকে যাত্রীদের অবাক দৃষ্টি, সহকর্মীদের সন্দেহ—সবকিছুই ছিল তাঁর পথের বাধা। কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রম দিয়ে তিনি সেই বাধা অতিক্রম করেছেন। অন্যদিকে, অনুসুয়া চক্রবর্তী একজন পুলিশ অফিসার ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছেন—যেখানে প্রতিদিনই চ্যালেঞ্জ, দায়িত্ব এবং ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, একজন নারী হিসেবে পুলিশ বিভাগে কাজ করা মানে শুধু দায়িত্ব পালন নয়, বরং নিজেকে বারবার প্রমাণ করা। এই দুই নারীর গল্প প্রমাণ করে—সাফল্যের পথ কখনো সহজ নয়, কিন্তু দৃঢ় সংকল্প থাকলে সবকিছুই সম্ভব।
ডক্টর রোহিণী ধর্মপালের বক্তব্য এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হয়ে ওঠে। “প্রশ্ন না করে কোনো কিছু মেনে নেওয়া মানেই নিজের স্বাধীনতাকে হারানো”—এই কথাটি আজকের সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা অনেক সময় প্রথা, নিয়ম বা সামাজিক চাপের কারণে প্রশ্ন করি না। কিন্তু সেই নীরবতাই ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তার স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়।
এই আলোচনায় উঠে আসে—প্রতিটি বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি। নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। কারণ, একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে শুধুমাত্র নিয়ম মানা নয়—নিয়মের পেছনের যুক্তি বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংগ্রাম থেকে সাফল্য
ডলি রানা-র জীবনকাহিনি যেন এক বাস্তব লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। ২০১৬ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর জীবন হঠাৎই বদলে যায় তাঁর। সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি বাস কন্ডাক্টরের কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই পথ মোটেও সহজ ছিল না। শুধুমাত্র ‘মেয়ে’ হওয়ার কারণে প্রথমদিকে কেউই তাঁকে কাজ দিতে রাজি হননি। সমাজের সেই মানসিক বাধা ভেঙে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গত দশ বছর ধরে তিনি এই পেশায় সফলভাবে কাজ করে চলেছেন।
তিনি জানান, এই কাজের মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেই একটি বাস কিনেছেন—যা তাঁর আত্মনির্ভরতার প্রতীক। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরেন—মহিলা কন্ডাক্টর নিয়োগ নিয়ে তাঁর দ্বিধা। কারণ, তাঁর মতে এই পেশায় মহিলাদের নিরাপত্তা অনেক সময় বিঘ্নিত হতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই বাস্তব সমস্যার কথা স্বীকার করেন। ডলি রানার গল্প আমাদের শেখায়—সাহস থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়, তবে বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার না করে তা নিয়ে ভাবা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অনুসুয়া চক্রবর্তী—যিনি একজন পুলিশ অফিসার হওয়ার পাশাপাশি একজন মানবিক সমাজকর্মীর ভূমিকাও পালন করছেন। তিনি জানান, তাঁর বাবা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। কার্গিল যুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, কারণ সেই সময় তাঁর বাবা ফ্রন্টিয়ারে কর্মরত ছিলেন।
প্রথমে তাঁর ইচ্ছা ছিল আর্মিতে যোগ দেওয়ার, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে থাকার জন্য তিনি পুলিশে যোগ দেন। শিক্ষাগত দিক থেকেও তিনি অত্যন্ত মেধাবী—মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে এমএসসি করার পর তাঁর ইচ্ছা ছিল গবেষণার দিকে এগোনোর। কিন্তু বর্তমানে তিনি ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট-এর মিডিয়া সেলের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
তিনি বিশেষভাবে কাজ করেন হিউম্যান ট্রাফিকিং এবং নারী-শিশু পাচার রোধে। পাশাপাশি তিনি একজন কাউন্সেলর হিসেবেও কাজ করেন। একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনায়, আত্মহত্যার চেষ্টা করা এক তরুণীকে বাঁচিয়ে তিনি মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই কাজের জন্য তিনি আমেরিকান কনস্যুলেট থেকে “Women of Courage” সম্মান লাভ করেন। তিনি প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশি ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রগতিশীল ও মানবিক পুলিশিং-এর পক্ষে জোর দেন—যেখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সহানুভূতি ও বোঝাপড়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে কলেজের অধ্যক্ষা ডক্টর পাপিয়া চক্রবর্তী বলেন, বাংলার মেয়েরা আজ সবক্ষেত্রেই এগিয়ে চলেছে। যদিও বাধা এখনও রয়েছে, কিন্তু সেই বাধাকে জয় করেই তারা নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ গুণমান নিশ্চিতকরণ বিভাগের কো-অর্ডিনেটর ডক্টর কল্পতরু হালদার উল্লেখ করেন—নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করাই নারী দিবস উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন ইংরেজি বিভাগের প্রধান ডক্টর নিশি পুলু ভার্মা। তিনি নারী দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Womens Day Brahmananda Keshab Chandra College) তুলে ধরে বলেন, আমাদের পূর্বজ নারীরা প্রতিটি অধিকার অর্জনের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। তিনি সকলকে মনে করিয়ে দেন—এই সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি; বরং আরও অনেক পথ চলা বাকি। এই অনুষ্ঠান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, পরিবর্তন শুরু হয়েছে, আর সেই পরিবর্তনের আলোই ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার চলবে বেশি দিন

