World Kidney Day awareness: মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগের বাড়তে থাকা ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, প্রাথমিক লক্ষণ চিনতে শেখানো এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরাই এই দিনের প্রধান উদ্দেশ্য।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার সারা বিশ্বে পালিত হয় World Kidney Day বা বিশ্ব কিডনি দিবস। অনেক সময় তারিখ হিসেবে ১২ মার্চও পড়তে পারে, তবে এটি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নয়। মূল নিয়ম হল—মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবারেই এই দিবসটি পালন করা হয়।
এই দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হল কিডনির স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা। বর্তমানে ক্রনিক কিডনি রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি সমস্যার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জানেন না, ফলে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কিডনি রোগ শুরুতেই শনাক্ত করা যায় এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে বড় বিপদের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব। কিন্তু রোগ দীর্ঘদিন অজানা অবস্থায় থেকে গেলে তা কিডনি ফেলিয়োর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতীও হতে পারে।
এই কারণেই বিশ্ব কিডনি দিবসের মাধ্যমে মানুষকে কিডনি রোগের প্রাথমিক উপসর্গ, ঝুঁকির কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানানো হয়। একই সঙ্গে জোর দেওয়া হয় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সবার জন্য সুলভ চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করার উপর।
অর্থাৎ, বিশ্ব কিডনি দিবস শুধু একটি প্রতীকী দিবস নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য হল—রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
কেন প্রতি বছর বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হয়?
প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হয়। এই দিনটি পালনের মূল কারণ হল সারা পৃথিবীতে দ্রুত হারে কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। বর্তমানে যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ক্যান্সারের মতো রোগ মানুষের মধ্যে বাড়ছে, ঠিক তেমনই ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (Chronic Kidney Disease)-ও একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই রোগ অনেক সময় ধীরে ধীরে শরীরে বাসা বাঁধে এবং প্রথমদিকে তেমন স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অনেক মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তাদের কিডনির সমস্যা শুরু হয়েছে। তাই এই দিবসের মাধ্যমে মানুষকে কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
মানুষকে জানানো হয়—কোন কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত, কীভাবে নিয়মিত পরীক্ষা করলে রোগ আগে ধরা পড়তে পারে এবং কীভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে কিডনি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কী ধরনের খাবার খেলে কিডনি সুস্থ থাকে এবং কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত, সে বিষয়েও মানুষকে সচেতন করা হয়।
এই উপলক্ষে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংগঠন ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবিরের আয়োজন করে। অনেক জায়গায় সচেতনতামূলক আলোচনা, প্রচারাভিযান এবং জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে কিডনি স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে জানানো হয়। অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ নিশ্চিত করা এবং কিডনি সুস্থ রাখার উপায় সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই বিশ্ব কিডনি দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য।
বিশ্ব কিডনি দিবসের উদ্যোগ ও সচেতনতার লক্ষ্য
বিশ্ব কিডনি দিবস পালনের উদ্যোগ প্রথমে নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মাধ্যমে। এই উদ্যোগের পিছনে ছিল ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ নেফ্রোলজি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ কিডনি ফাউন্ডেশন, এই দুটি সংস্থা একসঙ্গে কিডনি রোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই দিবস পালনের সূচনা করে।
বর্তমান সময়ে এই দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থিম হচ্ছে “সকলের জন্য কিডনি স্বাস্থ্য” বা Kidney Health for All। এই প্রচারাভিযানের মাধ্যমে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয় ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিং এবং দ্রুত শনাক্তকরণের উপর। এছাড়াও পরিবেশ দূষণের মতো বিভিন্ন পরিবেশগত কারণ, যেগুলো কিডনি স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, সেগুলোর মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মানুষকে জানানো হয়—কিডনি সুস্থ রাখতে কী ধরনের জীবনযাপন করা উচিত এবং কোন অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা দরকার।
কিডনি রোগের প্রধান লক্ষণ
কিডনি রোগ অনেক সময় প্রথমদিকে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে এবং শুরুতে তেমন বড় কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে এই রোগ কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে শুরু করে। অনেক সময় ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থেকেও কিডনি সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
কিডনি রোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যেগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। যেমন—সবসময় ক্লান্তি অনুভব করা, শরীরে দুর্বলতা, শরীরে টক্সিন জমে যাওয়া, হাত-পা বা গড়ালি ফুলে যাওয়া এবং চোখের চারপাশে ফোলা ভাব দেখা দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে প্রস্রাবে ফেনা তৈরি হওয়াও কিডনি সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।
এছাড়াও আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—বমি বমি ভাব, ত্বকে চুলকানি বা শুষ্কতা অনুভব হওয়া, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের অভাব এবং পেশিতে ক্র্যাম্প হওয়া। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপও কিডনি সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে আরও জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—অ্যানিমিয়া, হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা।
তাই এই ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ক্রিয়েটিনিন এবং eGFR পরীক্ষা করা উচিত, যাতে কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায়। কারণ কিডনি রোগ যত দ্রুত প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয় এবং রোগের জটিলতা অনেকটাই কমানো যায়। তাই সচেতনতা এবং সময়মতো পরীক্ষা করানোই কিডনি সুস্থ রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কিডনি সুস্থ রাখতে যেসব খাবার উপকারী
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি সুস্থ রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কম পটাশিয়ামযুক্ত ফল ও পুষ্টিকর খাবার কিডনির জন্য ভালো বলে মনে করা হয়।
কিডনি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী কিছু খাবার হল—
- আপেল ও বেরি জাতীয় ফল
- বিভিন্ন ধরনের পাতাযুক্ত শাকসবজি
- রসুন
- ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ চর্বিযুক্ত মাছ (যেমন স্যামন বা টুনা)
এই খাবারগুলিতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের ক্ষতিকর উপাদান কমাতে সাহায্য করে এবং কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে দেয় না। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এই ধরনের খাবার রাখলে কিডনি সুস্থ রাখতে সহায়তা করতে পারে।
কিডনির সমস্যায় যেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিত
কিডনির সমস্যায় সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো নিয়মিত খেলে কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তাই কিডনি সুস্থ রাখতে বা কিডনির সমস্যা থাকলে এই ধরনের খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা বা সীমিত করা দরকার।
উচ্চ সোডিয়ামযুক্ত খাবার কম খাওয়া উচিত। যেমন—ক্যানডজাত স্যুপ, প্রক্রিয়াজাত মাংস, চিপস, ফাস্ট ফুড ইত্যাদি। এসব খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া কিছু উচ্চ পটাশিয়ামযুক্ত খাবারও সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। এর মধ্যে রয়েছে আলু, টমেটো, অ্যাভোকাডো এবং দুগ্ধজাত খাবার যেমন পনির। অতিরিক্ত পটাশিয়াম শরীরে জমে গেলে কিডনির জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
পাশাপাশি কিছু শস্যজাত খাবারও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন—গোটা গমের রুটি, বাদামি চাল বা আচারজাত খাবার। বিশেষ করে কিডনির সমস্যায় এগুলো অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো।
সার্বিকভাবে বলা যায়, কিডনি সুস্থ রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও উচ্চ পটাশিয়ামযুক্তবিশ্ব কিডনি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিডনি রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ থেকেই সচেতন হোন, অন্যদেরও সচেতন করুন এবং কিডনির যত্ন নিন। সুস্থ কিডনি মানেই সুস্থ জীবন। খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সচেতন খাদ্যাভ্যাসই কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- খাঁচায় বন্দি চিতা, অথচ সরকারের খাতায় ‘সফল’ প্রজেক্ট! ভারতের চিতা পুনর্বাসন প্রকল্পের আসল সত্যিটা কী?
- সোনার বাজারে বড় পতন! মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আবহে গোল্ড ইটিএফ-এ (Gold ETF) বিনিয়োগ করা কি এখন বুদ্ধিমানের কাজ?
- হেঁশেলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ! গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে দেশজুড়ে হাহাকার, সাধারণ মানুষের বাঁচতে কী করতে হবে?
- বৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স চাইছেন পঙ্কজ-ডিম্পল! মাঝখানে ফেঁসে গেলেন অপরশক্তি খুরানা?
- ‘গুজারিশ’-এর ইথান মাসকারেনহাস আজ বাস্তব! ১৩ বছরের যন্ত্রণার অবসান, দেশে প্রথমবার ইউথেনেশিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যুর) অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের

