Mamata Banerjee Sleepless | সারারাত ঘুমোননি মুখ্যমন্ত্রী। সাতসকালে রেওয়াজ ভেঙে ভবানীপুরের রাস্তায় নেমে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। অভিযোগ করলেন, সিআরপিএফ গুন্ডা হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, মমতার রাস্তায় নামা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী ও শঙ্কুদেব পান্ডা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দ্বিতীয় দফার মেগা ফাইট। গোটা রাজ্যের নজর এখন কার্যত একটি কেন্দ্রের দিকেই আটকে রয়েছে— ভবানীপুর। এই কেন্দ্রে হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে মুখোমুখি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন রুদ্ধশ্বাস স্নায়ুযুদ্ধ খুব কমই দেখা গিয়েছে। কিন্তু বুধবার সকাল থেকে ভবানীপুরের রাস্তায় যে ছবি দেখা গেল, তা বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে আক্ষরিক অর্থেই নজিরবিহীন।
ভবানীপুরের হাই-ভোল্টেজ ভোটের দিন সবচেয়ে টানটান উত্তেজনার মুহূর্তটি তৈরি হয় চক্রবেড়িয়া এলাকায়। এদিন সকালে বুথ পরিদর্শনের মাঝেই চক্রবেড়িয়ার একটি তৃণমূল পার্টি অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ঠিক সেই সময়েই ওই একই এলাকায় এসে উপস্থিত হন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের দুই প্রধান যুযুধান নেতার এহেন মুখোমুখি অবস্থানে মুহূর্তের মধ্যে এলাকার রাজনৈতিক পারদ চরমে ওঠে। দুই শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে যাতে কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা অশান্তি তৈরি না হয়, তা এড়াতে আগেভাগেই তৎপর হয় প্রশাসন। তড়িঘড়ি গোটা এলাকা নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয় এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে বিপুল সংখ্যক সিআরপিএফ (CRPF) জওয়ান মোতায়েন করা হয়।
সাধারণত ভোটের দিন সকালের দিকে কালীঘাটের বাড়িতেই থাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের বাসভবন থেকেই রাজ্যজুড়ে ভোট সংক্রান্ত যাবতীয় খবরাখবর রাখেন তিনি। বেলা গড়ালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে গিয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এটাই এতদিনের চেনা রেওয়াজ। কিন্তু এবারের চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। সব রেওয়াজ ভেঙে ভোটের দিন সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। জানিয়ে দিলেন, আজ তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নন, বরং ভবানীপুরের তৃণমূল প্রার্থী হিসেবেই সারাদিন রাস্তায় থাকবেন। আর তাঁর এই অভাবনীয় পদক্ষেপ ঘিরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তুমুল আলোড়ন, পালটা কটাক্ষ এবং রাজনৈতিক তরজা।
এদিন সকাল সকাল চেতলা এলাকা দিয়ে নিজের ময়দান দর্শন শুরু করেন মমতা। সরাসরি গিয়ে দেখা করেন রাজ্যের বিদায়ী মন্ত্রী তথা কলকাতা বন্দরের তৃণমূল প্রার্থী ফিরহাদ হাকিম ওরফে ববির সঙ্গে। আর চেতলায় দাঁড়িয়েই বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন তিনি। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানান যে, গত রাতে তাঁর দু’চোখের পাতা এক হয়নি। সারারাত তিনি এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জেগে কাটিয়েছেন। কিন্তু কেন এই বিনিদ্র রজনী? মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, সোমবার মাঝরাতে ফিরহাদ হাকিমের বাড়িতে আচমকা কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে হানা দেয় পুলিশ পর্যবেক্ষকরা। রাতের অন্ধকারে এই অতর্কিত হানায় ফিরহাদ হাকিমের স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য মহিলারা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মমতা বলেন, “ববির স্ত্রী বাড়িতে ছিল। মাঝরাতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। মহিলারা রীতিমতো আতঙ্কিত!”
আরও পড়ুন: ভবানীপুর কি রাণীনগরকে ছাপিয়ে যাবে? পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন— কোন পথে এগোচ্ছে লড়াই?
কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ এখানেই থামেনি তাঁর। সাংবাদিকদের সামনে ভাঙড়ে এক যুবককে বেধড়ক মারধরের একটি ছবি ও ভিডিও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে তৃণমূল কর্মীদের উপর বেছে বেছে অত্যাচার চালাচ্ছে। আসিম বসুর স্ত্রীকেও গত রাতে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সিআরপিএফ গুন্ডা হয়ে গিয়েছে! এটা কি গণতন্ত্র চলছে? এরপরও মানুষ ওদের ভোট দেবে?” তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্যে তাঁদের হয়রানি করছে এবং আদালতের নির্দেশকেও মান্যতা দিচ্ছে না। আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো সত্ত্বেও অসংখ্য বহিরাগত পর্যবেক্ষককে রাজ্যে আনা হয়েছে, যারা বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই করছে না।
এদিন চেতলা থেকে বেরিয়ে পদ্মপুকুর রোড ধরে এগিয়ে যান মমতা। মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে একটি বুথের সামনে নেমে পড়েন। এরপর সকাল ৯টা নাগাদ তিনি পৌঁছে যান চক্রবেড়িয়ার একটি বুথে। সেখানে বুথের বাইরে বসেই দীর্ঘক্ষণ নজরদারি চালান তিনি, কথা বলেন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে। তাঁর অভিযোগ, চক্রবেড়িয়া এলাকাতেই তৃণমূলের দলীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এছাড়া, ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলরকে বাড়ি থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ পান তিনি। কালক্ষেপ না করে নিজেই সেই ওয়ার্ডে পৌঁছে যান এবং ওই কাউন্সিলরের সঙ্গে দেখা করেন। মমতা ক্ষোভের সুরে বলেন, “এটা মানুষের ভোট। কিন্তু এভাবে কি ভোটগ্রহণ হতে পারে? আমাদের সব ছেলেকে ওরা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বহিরাগতরা এসে ভবানীপুরে বসে এই সন্ত্রাস চালাচ্ছে।”
ভবানীপুরে একদিকে যখন তৃণমূল নেত্রী নিজে ময়দানে নেমে মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট করছেন, তখন অন্যদিকে চুপ করে বসে নেই পদ্ম শিবিরও। সাতসকালেই খিদিরপুর এলাকায় বুথ পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়েন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। খিদিরপুরের ভোট পরিস্থিতি নিয়ে তিনি রীতিমতো সন্তুষ্ট। নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন যে, আগে এই এলাকায় সাধারণ ভোটদাতারা ঢুকতেই পারতেন না, কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলেছে। তবে মমতার এই সাতসকালে রাস্তায় নামা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে শুভেন্দু বলেন, “ঠেলায় না পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে না।” তাঁর এই তীক্ষ্ণ মন্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, হারের ভয় এবং রাজনৈতিক চাপেই আজ মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর চেনা আরামের গণ্ডি ছেড়ে সাতসকালে রাস্তায় নামতে বাধ্য হতে হয়েছে।
বিজেপির এই আক্রমণাত্মক মেজাজ বজায় রেখেছেন দলের আরেক দাপুটে নেতা শঙ্কুদেব পান্ডাও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “সারারাত ঘুমোতে পারিনি” এবং “আমি এখনও চেয়ারে আছি” মন্তব্য দুটিকে হাতিয়ার করে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি। শঙ্কুদেবের দাবি, নিশ্চিত হারের আভাস পেয়েই চরম দুশ্চিন্তা ও টেনশনে ভুগছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বুঝে গিয়েছেন যে ওই চেয়ারে তাঁর মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে বুঝেই তিনি এখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কমিশনের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন।
এই চরম রাজনৈতিক বাগযুদ্ধের মধ্যেই ভোটের সকাল সকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বাংলা এবং ইংরেজি— উভয় ভাষাতেই পোস্ট করে তিনি রাজ্যবাসীর কাছে ‘রেকর্ড সংখ্যক ভোটদানের’ আবেদন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “আজ রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিন। আমাদের গণতন্ত্রকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।” বিশেষ করে রাজ্যের মহিলা এবং যুব সম্প্রদায়কে বিপুল সংখ্যায় ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অনুরোধ করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, এবারের ভোটপ্রচারে রাজ্যে এসে বারবার নারীশক্তির ক্ষমতায়নের কথা বলেছেন মোদী। রাজনৈতিক মহলের মতে, মহিলাদের ভোটকে নিজেদের বাক্সে টানতেই প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ বার্তা। প্রসঙ্গত, গত ২৩ এপ্রিল রাজ্যের প্রথম দফার নির্বাচনে ভোটদানের হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে মোট ৯৩.১৯ শতাংশ ভোট পড়েছিল। দ্বিতীয় দফাতেও সেই একই ধারা বজায় রাখার পক্ষেই সওয়াল করলেন প্রধানমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় দফার ভোটের সকাল থেকেই ভবানীপুর এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো যেন আক্ষরিক অর্থেই একটি রাজনৈতিক কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে শাসকের অধিকার রক্ষার মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে বিরোধীদের জমি দখলের আগ্রাসী রণনীতি। শেষ হাসি কে হাসবে, তা জানার জন্য এখন কেবল ২ মে-র দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলা।
আপনার এলাকার ভোটের পরিস্থিতি কেমন? কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগের সঙ্গে কি আপনি একমত? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। রাজ্য রাজনীতির প্রতিটি খুঁটিনাটি আপডেট পেতে চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই

