Dussehra 2026 | ভারতের দশেরার অচেনা রীতি
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দশেরা (Dussehra) বললেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে রাবণের বিশাল প্রতিমা, রামলীলার মঞ্চ, সন্ধ্যার আকাশে আতশবাজি আর অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের জয়ের পরিচিত কাহিনি। কিন্তু ভারতের এই উৎসবের গল্প কেবল একটি পৌরাণিক যুদ্ধের স্মৃতিতে আটকে নেই। দেশের এক প্রান্তে যখন রাবণবধের মাধ্যমে বিজয় উদ্যাপিত হয়, অন্য প্রান্তে তখন দেবীর আরাধনা, ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা কিংবা স্থানীয় দেবতাকে ঘিরে শতাব্দীপ্রাচীন উৎসব মানুষের মিলনমেলার রূপ নেয়। এই বৈচিত্র্যই দশেরাকে করে তুলেছে ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
২০২৬ সালে দশেরা বা বিজয়া দশমীকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎসবের আয়োজন হয়েছে। তবে তিথি, স্থানীয় পঞ্জিকা এবং আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী উদ্যাপনের দিন ও সময়ের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। ভারতের পর্যটন মন্ত্রকের সরকারি পর্যটন পোর্টালেও এই উৎসবের বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এই উৎসবের মূল তাৎপর্য হল শুভশক্তির জয় এবং অন্যায়ের অবসানের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই একই ভাবনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কীভাবে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি, শিল্প, খাবার ও লোকাচারের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, তা জানলে দশেরার পরিচিত ছবির বাইরেও এক নতুন ভারতকে আবিষ্কার করা যায়।
দশেরা ২০২৬: রামলীলার মঞ্চ থেকে দেবীর আরাধনা, উৎসবের মূল তাৎপর্য কী?
দশেরা নামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণের কাহিনি। প্রচলিত হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনেই ভগবান রাম লঙ্কার রাজা রাবণকে পরাজিত করেছিলেন। সেই কাহিনির স্মরণে দেশের বহু জায়গায় রামলীলার আয়োজন করা হয়, যেখানে অভিনয়, সংলাপ, সংগীত এবং মঞ্চসজ্জার মাধ্যমে রামায়ণের বিভিন্ন পর্ব তুলে ধরা হয়। উৎসবের শেষ পর্যায়ে রাবণের প্রতিকী মূর্তি দহন করা হয়, যা অন্যায়ের পরাজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
দিল্লি-সহ উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রামলীলা দশেরার অন্যতম আকর্ষণ। সেখানে কয়েক দিন ধরে চলে পৌরাণিক কাহিনির মঞ্চায়ন। দশমীর দিনে রাবণদহন দেখতে বহু মানুষ একত্রিত হন। এই আয়োজন ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি লোকনাট্য, মঞ্চশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে দশেরার তাৎপর্য শুধু রামায়ণের কাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলায় দুর্গাপুজোর শেষ পর্ব বিজয়া দশমী। এখানে দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের স্মৃতি, প্রতিমা বিসর্জন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। উত্তর ভারতের রাবণদহন এবং বাংলার বিজয়া দশমীর বাহ্যিক রীতিতে পার্থক্য থাকলেও দুই ক্ষেত্রেই অশুভের উপর শুভের জয়ের ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়ায় কানক দুর্গা মন্দিরকে কেন্দ্র করে নবরাত্রি ও বিজয়া দশমীর বিশেষ আয়োজন হয়। সেখানে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের সাজ, পুজো এবং শোভাযাত্রা উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে একই উৎসবের মধ্যে রামায়ণের কাহিনি, শক্তির আরাধনা এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্য পাশাপাশি জায়গা করে নেয়।
কুল্লু থেকে মহারাষ্ট্র, দশেরার এমন কিছু রীতি যা চেনা ছবির বাইরে
দশেরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির একটি হল, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎসবটি স্থানীয় ইতিহাস ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। হিমাচল প্রদেশের কুল্লু দশেরা তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশের অনেক জায়গায় বিজয়া দশমীর দিন উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও কুল্লুতে দশেরার মূল আয়োজন শুরু হয় বিজয়া দশমীর পরের দিন এবং চলে প্রায় এক সপ্তাহ।
এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সপ্তদশ শতকের একটি প্রচলিত কাহিনি। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, কুল্লুর রাজা জগৎ সিং ভগবান রঘুনাথের মূর্তি অযোধ্যা থেকে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে রঘুনাথকে উপত্যকার প্রধান দেবতা হিসেবে মান্য করার ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। সেই বিশ্বাসের ধারাবাহিকতায় কুল্লু দশেরায় স্থানীয় দেবদেবীর শোভাযাত্রা, রথ টানা, ঐতিহ্যবাহী সংগীত এবং মানুষের সমাবেশ বিশেষ গুরুত্ব পায়। এখানে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু শুধু রাবণদহন নয়, বরং দেবতাকে ঘিরে স্থানীয় সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।
মহারাষ্ট্রের সাংগলি জেলার কাওয়াঠে একন্দ গ্রামেও দশেরার একটি ব্যতিক্রমী রীতি রয়েছে। এখানে শ্রী সিদ্ধরাজ মহারাজের পালকির শোভাযাত্রার সঙ্গে যুক্ত থাকে রাতভর আতশবাজির আয়োজন। প্রচলিতভাবে দীপাবলির সঙ্গে যে আতশবাজির ছবি বেশি পরিচিত, এই গ্রামে বিজয়া দশমীর রাতেই তা উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই আয়োজনের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরনো।
এই ধরনের আঞ্চলিক উৎসবের গুরুত্ব শুধু দর্শনীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলি স্থানীয় শিল্পী, কারিগর, সংগীতশিল্পী, ছোট ব্যবসায়ী এবং পর্যটননির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের মাধ্যমে একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। তাই দশেরাকে বুঝতে গেলে শুধু একটি ধর্মীয় দিনের দিকে তাকালে চলবে না; দেখতে হবে সেই উৎসব কীভাবে একটি এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রেখেছে।
উৎসবের খাবার, মিলনমেলা ও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সেতু
দশেরার আনন্দ কেবল পুজো বা শোভাযাত্রায় শেষ হয় না। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশেষ খাবার, পারিবারিক আচার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার রীতি। কোথাও মিষ্টি বিতরণ করা হয়, কোথাও বাড়িতে বিশেষ পদ রান্না হয়, আবার কোথাও মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয় বৃহত্তর সামাজিক পরিসর।
বাংলায় দুর্গাপুজোর শেষ পর্বে নারকেলের নাড়ু, মিষ্টি এবং ঘরোয়া খাবারের মাধ্যমে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরিচিত রীতি রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দশেরার সময় তৈরি হয় স্থানীয় উপকরণ ও রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে যুক্ত নানা মিষ্টি। The Times of India-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের নারকেলের নাড়ু, মহারাষ্ট্রের কড়কণি, কর্নাটকের মহীশূর পাক ও পায়েসম-সহ বিভিন্ন রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী খাবারের কথা উঠে এসেছে।
এই খাবারগুলির গুরুত্ব শুধু স্বাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক রেসিপি, স্থানীয় কৃষিজ উপকরণ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার পদ্ধতি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে একটি খাবার কখনও পরিবারের স্মৃতি, কখনও আঞ্চলিক পরিচয়, আবার কখনও মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় মেলা, হস্তশিল্পের স্টল এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও বহু মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। ছোট দোকানদার, মিষ্টির ব্যবসায়ী, ফুল বিক্রেতা, কারিগর ও পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে সেই অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট অঞ্চল ও তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন।
আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনে এই সামাজিক দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কর্মব্যস্ততার মধ্যে পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ অনেক সময় কমে যায়। উৎসব সেই ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে পারে। একসঙ্গে পুজো দেখা, পরিচিতদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় কিংবা স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় পারস্পরিক সংযোগ।
দশেরার মূল বার্তাকে তাই কেবল পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনেও খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অহংকারের বদলে সংযমকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি করা—এই মূল্যবোধগুলিই উৎসবকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
দশেরার শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক কেন?
রাবণের দশটি মাথা নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যায় অহংকার, ক্রোধ, লোভ এবং অন্যান্য নেতিবাচক প্রবৃত্তির প্রতীকী অর্থ খুঁজে পান অনেকে। এটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার অংশ; এর উদ্দেশ্য হল মানুষের নিজের আচরণ নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করা। উৎসবের দিনে রাবণদহনের দৃশ্য যতটা আকর্ষণীয়, তার সঙ্গে যুক্ত আত্মসমালোচনার বার্তাটিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তব জীবনে প্রতিদিনের সমস্যার সমাধান কোনও এক দিনের উৎসবে সম্ভব নয়। তবে উৎসব উপলক্ষে নিজের আচরণ, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবা যায়। মতের পার্থক্য থাকলেও অন্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করাও শুভের জয়ের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভারতের নানা প্রান্তে দশেরার আলাদা রীতিগুলি আমাদের আরও একটি বিষয় শেখায়। একই উৎসবকে মানুষ বিভিন্নভাবে পালন করতে পারে, অথচ তার মধ্য দিয়ে আনন্দ, বিশ্বাস এবং সামাজিক বন্ধনের জায়গা তৈরি হতে পারে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বোঝার জন্য এই পার্থক্যগুলিকে প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে দেখা জরুরি।
এ বছর দশেরা উপলক্ষে তাই রাবণদহন বা উৎসবের জাঁকজমকের পাশাপাশি দেশের আঞ্চলিক সংস্কৃতির দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে। কুল্লুর দেবতার রথ, মহারাষ্ট্রের রাতভর আতশবাজির ঐতিহ্য কিংবা বাংলার বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা—প্রতিটি রীতিই আলাদা ইতিহাস বহন করে। সেই ইতিহাস জানার মধ্য দিয়ে উৎসবের পরিচিত ছবির বাইরেও মানুষের জীবন, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির নতুন দিক সামনে আসে।
দশেরার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এখানেই—উৎসব শেষ হয়ে গেলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মূল্যবোধ ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যেন দৈনন্দিন জীবনে বেঁচে থাকে।
সাম্প্রতিক খবর
- অন্ধকার রাতেও সূর্যের আলো! মহাকাশের আয়না কি বদলে দেবে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ?
- কোথাও রাবণদহন, কোথাও দেবতার রথ! ভারতের দশেরায় এমন অদ্ভুত রীতি কেন?
- পুজোর ভিড় সামলাতে কলকাতা পুলিশের অভিনব উদ্যোগ! মণ্ডপে মণ্ডপে কোন বিশেষ ব্যবস্থায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ?
- জন্মেই যেন রাজকীয় মেজাজ! মিশরের নবজাতকের ঘুমের ভঙ্গি দেখে মুগ্ধ নেটদুনিয়া
- ‘তাঁদের ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে’, আহতদের বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর প্রসঙ্গে কেন এমন বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

