সূর্য তো রোজ ডোবে, কিন্তু সব ডোবা কি মনে দাগ কাটে? কচ্ছের ‘ভূতুড়ে’ কেল্লা থেকে উত্তরাখণ্ডের বিরল ‘উইন্টার লাইন’—দিনের শেষটাকে সেলিব্রেট করতে বেছে নিন এই ৯টি অফবিট ঠিকানা। রইল রুট ম্যাপ, থাকার হদিশ এবং Best Sunset Points in India-র মেগা ট্রাভেল গাইড।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আমরা সব সময় ‘শুরু’ নিয়ে মেতে থাকি। নতুন দিন, নতুন বছর, নতুন সূর্যোদয়। কিন্তু ‘শেষ’-এর মধ্যেও যে একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তা কজন খেয়াল করি? সূর্যাস্ত মানেই মন খারাপ নয়। সূর্যাস্ত মানে ফুরিয়ে যাওয়া নয়। বরং সূর্যাস্ত হলো সেই জাদুকরী মুহূর্ত, যখন আকাশ তার সারা দিনের জমানো সব রং উজাড় করে দেয় পৃথিবীকে বিদায় জানানোর জন্য।
কখনো ভেবেছেন, কেন আমরা সূর্যাস্ত দেখতে ভালোবাসি? হয়তো ওই কয়েকটা মিনিটের জন্য সময় থমকে যায়। কমলা, বেগুনি আর লালের যে আঁচড় আকাশ জুড়ে ফুটে ওঠে, তা দেখলে মনে হয়—যাওয়ার বেলাতেও এতটা সুন্দর হওয়া যায়!
দিঘা বা পুরীর সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবা তো অনেক দেখেছেন। কিন্তু আজ ‘চলি চলি’ আপনাকে নিয়ে যাবে এমন ৯টি অচেনা ঠিকানায়, যেখানে সূর্যাস্ত দেখাটা একটা ‘ইভেন্ট’। কোথাও পাহাড়ের খাদে সূর্য লুকোচ্ছে, কোথাও বা পরিত্যক্ত কেল্লার প্রাচীরে শেষ আলোটুকু আটকে আছে।
এই জায়গাগুলো মেইনস্ট্রিম ট্যুরিস্ট ম্যাপে খুব একটা উজ্জ্বল নয়, কিন্তু প্রকৃত ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এগুলো এক-একটি রত্ন। ক্যামেরা তৈরি রাখুন, কারণ দিনের সেরা শো শুরু হতে চলেছে।

১. গান্ডিকোটা (Gandikota), অন্ধ্রপ্রদেশ: ভারতের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে গোধূলি
অবস্থান: অন্ধ্রপ্রদেশের কডপ্পা (Kadapa) জেলায় অবস্থিত। পেন্না নদীর তীরে। বেঙ্গালুরু থেকে দূরত্ব প্রায় ২৮০ কিমি।
আমেরিকার অ্যারিজোনার ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’-এর ছবি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন? আর ফেলতে হবে না। আমাদের দেশেই লুকিয়ে আছে এক আশ্চর্য গিরিখাত—গান্ডিকোটা। লাল পাথরের পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সবুজ পেন্না নদী।
গোধূলির গল্প (The Experience): বিকেল ৫টার মধ্যে পৌঁছে যান গান্ডিকোটার পাথুরে চাতালে। আপনার পায়ের নিচে প্রায় ৩০০ ফুট গভীর খাদ। নিচে পেন্না নদী শান্তভাবে বয়ে চলেছে। আর দুই পাশে লাল বেলেপাথরের (Sandstone) বিশাল সব দেওয়াল। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে নামতে শুরু করে, তখন এই লাল পাথরগুলো যেন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। পাথরের খাঁজে খাঁজে আলো-ছায়ার যে নাটক তৈরি হয়, তা দেখলে শ্বাস নিতে ভুলে যাবেন। সূর্যটা ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে চলে যায়, আর পুরো গিরিখাতটি ডুবে যায় এক মায়াবী বেগুনি আলোয়। এখানে হাওয়া খুব জোরে বয়, সেই হাওয়ার শব্দ আর সূর্যাস্তের রং—সব মিলিয়ে এক সিনেমাটিক পরিবেশ।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): গান্ডিকোটা পৌঁছনোর জন্য নিকটতম বড় রেল স্টেশন হলো জাম্মালামাদুগু (Jammalamadugu), যা এখান থেকে ১৫ কিমি দূরে। তবে সব ট্রেন এখানে থামে না। তাই সবথেকে ভালো উপায় হলো তিরুপতি বা বেঙ্গালুরু থেকে ট্রেনে ‘কডপ্পা’ (Kadapa) বা ‘কোন্ডাপুরম’ স্টেশনে নামা। কডপ্পা থেকে গান্ডিকোটার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিমি। স্টেশন থেকে আপনাকে প্রাইভেট ট্যাক্সি বা গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে। বাসে যেতে চাইলে কডপ্পা বাস স্ট্যান্ড থেকে জাম্মালামাদুগুর বাস ধরুন, সেখান থেকে অটো বা ছোট গাড়িতে গান্ডিকোটা। রাস্তা বেশ ভালো, বিশেষ করে শেষের ১৫ কিমি গ্রামের মধ্যে দিয়ে ড্রাইভ করা খুব মনোরম।
কোথায় থাকবেন: অন্ধ্রপ্রদেশ টুরিজমের (APTDC) হরিথা রিসোর্ট আছে, যা একমাত্র ভালো অপশন। এছাড়া এখন ক্যানিয়নের কাছে ক্যাম্পিং করার ব্যবস্থাও হয়েছে।

২. ল্যান্ডোর (Landour), উত্তরাখণ্ড: বিরল ‘উইন্টার লাইন’-এর জাদু
অবস্থান: মুসৌরি থেকে মাত্র ৫-৬ কিমি ওপরে। দেরাদুন জেলা। ল্যান্ডোর ক্লক টাওয়ার বা ‘চার দুকান’ ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিত।
মুসৌরির ভিড়ভাট্টা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার ওপরেই এক অন্য জগত। ব্রিটিশ আমলের শান্ত এই পাহাড়ি জনপদটি বিখ্যাত এক বিরল প্রাকৃতিক ঘটনার জন্য, যার নাম ‘উইন্টার লাইন’ (Winter Line)।
গোধূলির গল্প (The Experience): সুইজারল্যান্ড ছাড়া পৃথিবীর একমাত্র ল্যান্ডোর থেকেই এই ‘উইন্টার লাইন’ দেখা যায়। ঘটনাটি ঘটে মূলত অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মধ্যে। সূর্যাস্তের সময় দিগন্তে একটি কাল্পনিক রেখা তৈরি হয়। আকাশের ওপরের অংশটা থাকে গাঢ় নীল বা ধূসর, আর নিচের অংশটা হয়ে যায় টকটকে কমলা বা লাল। মনে হয় যেন আকাশটাকে কেউ স্কেল দিয়ে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। ল্যান্ডোরের ‘লাল টিব্বা’ বা কোনো ক্যাফের বারান্দায় বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে এই দৃশ্য দেখা এক স্বর্গীয় অনুভূতি। নিচে দুন ভ্যালির (Doon Valley) আলোগুলো জ্বলে ওঠে, আর ওপরে ওই মায়াবী আগুনের রেখা। এখানকার পাইন বনের নিস্তব্ধতা সূর্যাস্তের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): প্রথমে ট্রেন বা ফ্লাইটে দেরাদুন পৌঁছতে হবে। দেরাদুন রেল স্টেশন থেকে মুসৌরি যাওয়ার বাস বা শেয়ার ট্যাক্সি পাওয়া যায় (দূরত্ব ৩৫ কিমি)। সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। মুসৌরি বাস স্ট্যান্ড বা লাইব্রেরি চক থেকে ল্যান্ডোর যাওয়ার জন্য আপনাকে লোকাল ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে। মুসৌরি থেকে ল্যান্ডোরের রাস্তাটি বেশ সরু এবং খাড়াই। হাঁটা পথেও যাওয়া যায়, তবে চড়াই ভাঙতে কষ্ট হতে পারে। নিজস্ব গাড়ি নিয়ে গেলে খুব সাবধানে ড্রাইভ করবেন, কারণ রাস্তা খুব সংকীর্ণ। ‘চার দুকান’ পর্যন্ত গাড়ি যায়।
কোথায় থাকবেন: ল্যান্ডোরে থাকার জায়গার সংখ্যা কম। রোকবি ম্যানর (Rokeby Manor) বা কিছু পুরোনো ব্রিটিশ বাংলো হোমস্টে হিসেবে পাওয়া যায়। আগে থেকে বুকিং মাস্ট।

৩. লাখপত (Lakhpat), গুজরাট: কেল্লার প্রাচীরে একলা আমি
অবস্থান: গুজরাটের কচ্ছ (Kutch) জেলার একদম শেষ প্রান্তে। পাকিস্তান সীমান্তের কাছে। ভুজ শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ১৩৫ কিমি।
একসময় এটি ছিল এক সমৃদ্ধ বন্দর শহর। আজ এটি এক ‘ঘোস্ট টাউন’ বা ভুতুড়ে শহর। বিশাল কেল্লার প্রাচীরের ভেতরে বাস করে হাতে গোনা কিছু মানুষ।
গোধূলির গল্প (The Experience): লাখপতের সাত কিলোমিটার দীর্ঘ কেল্লার প্রাচীরের ওপর উঠে দাঁড়ান। আপনার সামনে ধূ ধূ করছে কচ্ছের গ্রেট রন (Great Rann) এবং খাঁড়ি এলাকা (Creek)। একসময় এখান দিয়ে সিন্ধু নদ বইত, আজ শুধু তার স্মৃতি পড়ে আছে। সূর্যাস্তের সময় এই জনমানবহীন প্রান্তর এক অদ্ভুত বিষাদমাখা রূপ ধারণ করে। দিগন্তের শেষ প্রান্তে সূর্যটা যখন টুপ করে লবণের মরুভূমিতে ডুবে যায়, তখন মনে হয় আপনি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। আশেপাশে কেউ নেই, শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর পুরোনো কেল্লার হাহাকার। এই নিঃসঙ্গ সূর্যাস্ত আপনাকে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করবে।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): লাখপত যাওয়াটা একটু সময়সাপেক্ষ। নিকটতম বড় শহর এবং এয়ারপোর্ট/স্টেশন হলো ভুজ (Bhuj)। ভুজ থেকে লাখপত যাওয়ার কোনো ডাইরেক্ট ভালো বাস সার্ভিস নেই। তাই সবথেকে ভালো উপায় হলো ভুজ থেকে সারাদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করা। ভুজ থেকে লাখপত পৌঁছতে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। রাস্তাটি কচ্ছের গ্রামের ভেতর দিয়ে গেছে, যা বেশ সুন্দর। রাস্তার দুপাশে বাবলা গাছ আর উট দেখা যাবে। যেহেতু এটি বর্ডার এলাকা, তাই সাথে সবসময় অরিজিনাল আইডি কার্ড (আধার/ভোটার) রাখবেন, বিএসএফ চেকিং হতে পারে।
কোথায় থাকবেন: লাখপতে থাকার খুব ভালো হোটেল নেই। একমাত্র অপশন হলো গুরুদুয়ারার গেস্ট হাউস (যেখানে গুরু নানক দেবজি এসেছিলেন) অথবা কচ্ছ টুরিজমের সাধারণ গেস্ট হাউস। অনেকে ভুজ থেকে ডে-ট্রিপ করে ফিরে যান।

৪. মারভান্তে বিচ (Maravanthe Beach), কর্ণাটক: হাইওয়ের দুপাশে জলছবি
অবস্থান: উডুপি জেলায়, কুন্দাপুরা শহরের কাছে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ৬৬ (NH-66)-এর ওপর অবস্থিত।
কল্পনা করুন, আপনি একটা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। আপনার ডানদিকে উত্তাল সমুদ্র, আর বাঁদিকে শান্ত নদী। ভারতের একমাত্র এই জায়গাটিতেই হাইওয়ে সমুদ্র এবং নদীকে আলাদা করেছে।
গোধূলির গল্প (The Experience): এখানে সূর্যাস্ত দেখার জন্য আপনাকে বালিতে নামতেও হবে না। শুধু হাইওয়ের পাশে গাড়িটা সাইড করুন। একদিকে আরব সাগর, অন্যদিকে সৌপর্ণিকা নদী (Sauparnika River)। সূর্য যখন আরব সাগরে ডুব দেয়, তখন তার সোনালি আভা একই সঙ্গে সাগরের জলে এবং নদীর জলে প্রতিফলিত হয়। হাইওয়ের ওপর দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দুটি জলাশয়ে সূর্যাস্ত দেখার এই দৃশ্য বিরল। সাগরের দিকে তাকালে দেখবেন ঢেউয়ের গর্জন আর কমলা আকাশ, আর নদীর দিকে তাকালে দেখবেন নারকেল গাছের ছায়া আর শান্ত জল। রোড ট্রিপারদের জন্য এটি সেরা সানসেট পয়েন্ট।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): নিকটতম এয়ারপোর্ট হলো ম্যাঙ্গালোর (১১০ কিমি দূরে)। নিকটতম রেল স্টেশন হলো কুন্দাপুরা (Kundapura), যা এখান থেকে ১৮ কিমি দূরে। অথবা উডুপি স্টেশন (৫০ কিমি দূরে)। ম্যাঙ্গালোর বা উডুপি থেকে বাসে বা ট্যাক্সিতে কুন্দাপুরা হয়ে মারভান্তে আসা যায়। আপনি যদি গোয়া থেকে কোচি বা ম্যাঙ্গালোর বাই রোডে যান (NH-66 ধরে), তবে এই জায়গাটি পথেই পড়বে। রাস্তাটি অত্যন্ত মসৃণ এবং সিনিক। নিজস্ব বাইক বা গাড়ি থাকলে এই জার্নিটা সবথেকে ভালো উপভোগ করা যায়।
কোথায় থাকবেন: মারভান্তে বিচের কাছে থাকার ভালো জায়গা কম। কুন্দাপুরা শহরে থাকাই শ্রেয়। অথবা একটু দূরে ‘টার্টল বে রিসোর্ট’-এ থাকতে পারেন।
৫. কল্পা (Kalpa), হিমাচল প্রদেশ: কৈলাসের মাথায় রক্তের দাগ
অবস্থান: হিমাচলের কিন্নর (Kinnaur) জেলায় অবস্থিত। রেকং পিও শহর থেকে ওপরে। শিমলা থেকে দূরত্ব প্রায় ২৩০ কিমি।
পাহাড়ের সূর্যাস্ত মানেই যে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে যাবে, তা নয়। কল্পাতে সূর্যাস্ত মানে হলো পাহাড়ের রং বদলানো। সামনেই পবিত্র কিন্নর কৈলাশ (Kinner Kailash) শৃঙ্গ।
গোধূলির গল্প (The Experience): কল্পার ‘সুইসাইড পয়েন্ট’ বা মঠের সামনে দাঁড়িয়ে থাকুন। সূর্য আপনার পেছনে ডুববে, কিন্তু আপনি তাকিয়ে থাকবেন উল্টো দিকে—কিন্নর কৈলাশ রেঞ্জের দিকে। সারা দিন এই পাহাড় সাদা বা ধূসর থাকে। কিন্তু সূর্য ডোবার ঠিক ১০-১৫ মিনিট আগে ম্যাজিক শুরু হয়। ডুবন্ত সূর্যের আলো বরফের চূড়ায় পড়ে। প্রথমে হলুদ, তারপর কমলা, আর শেষে টকটকে লাল বা ক্রিমসন (Crimson) রঙে রাঙিয়ে দেয় পাহাড়টাকে। স্থানীয়রা বলেন, পাহাড় তখন ‘রক্তবস্ত্র’ পরিধান করে। প্রায় ২০,০০০ ফুট উঁচু শিবলিঙ্গ-সদৃশ পাথরের ওপর এই আলোর খেলা দেখলে গায়ে কাঁটা দেবে।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): কল্পা যাওয়াটা বেশ ধকলের। চণ্ডীগড় বা শিমলা থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়। শিমলা থেকে সরকারি বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে রেকং পিও (Reckong Peo) পৌঁছতে প্রায় ৮-৯ ঘণ্টা লাগে। রাস্তাটি খুব রোমাঞ্চকর, কখনো বা ভীতিজনক। সতলজ নদীর পাশ দিয়ে পাহাড় কেটে তৈরি রাস্তা। রেকং পিও হলো জেলা সদর। সেখান থেকে আরও ৭ কিমি ওপরে খাড়াই রাস্তা উঠে গেছে কল্পায়। বাস বা ট্যাক্সিতে ৩০ মিনিট লাগে। শীতকালে রাস্তা বরফে বন্ধ থাকতে পারে, তাই মে থেকে অক্টোবর যাওয়ার সেরা সময়।
কোথায় থাকবেন: হিমাচল টুরিজমের ‘হোটেল কিন্নর কৈলাশ’ সেরা ভিউ দেয়। এছাড়াও অনেক হোমস্টে আছে যেখান থেকে পাহাড় দেখা যায়।
৬. আগুম্বে (Agumbe), কর্ণাটক: রেইনফরেস্টের ফ্রেমে সূর্যাস্ত
অবস্থান: কর্ণাটকের শিবমোগা (Shivamogga) জেলা। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ওপর অবস্থিত। উদুপি থেকে ৫৫ কিমি দূরে।
একে বলা হয় ‘দক্ষিণের চেরাপুঞ্জি’। ঘন জঙ্গল, কিং কোবরা আর বৃষ্টির জন্য বিখ্যাত আগুম্বে। আর বিখ্যাত তার সানসেট পয়েন্টের জন্য।
গোধূলির গল্প (The Experience): আগুম্বের সানসেট পয়েন্টটি একটি উঁচু পাহাড়ের বাঁকে অবস্থিত। এখান থেকে আরব সাগর প্রায় ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার থাকলে পশ্চিম দিগন্তে সাগরের ওপর সূর্য ডোবা দেখা যায়। তবে আসল সৌন্দর্য হলো নিচের উপত্যকা। ঘন সবুজ রেইনফরেস্টে ঢাকা গভীর খাদ। মেঘেরা এখানে পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠে আসে। মেঘ, জঙ্গল আর দূরের দিগন্ত—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি অসাধারণ। বর্ষাকালে গেলে হয়তো সূর্য দেখা যাবে না, কিন্তু মেঘের নাটক দেখতে পাবেন। পরিষ্কার দিনে সূর্য যখন লাল বলের মতো দিগন্তে হারিয়ে যায়, তখন জঙ্গলের পাখিরা সমস্বরে ডেকে ওঠে।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): নিকটতম রেল স্টেশন হলো উডুপি (৫৫ কিমি) বা শিমোগা (৯০ কিমি)। ম্যাঙ্গালোর এয়ারপোর্ট থেকে দূরত্ব ১০০ কিমি। উডুপি থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে হেবরি (Hebri) হয়ে আগুম্বে যাওয়া যায়। রাস্তাটি সোমেশ্বর অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে গেছে এবং প্রচুর হেয়ারপিন বাঁক (Hairpin Bends) আছে। এই ঘাট রোড দিয়ে ড্রাইভ করা অভিজ্ঞ চালকের কাজ। বর্ষাকালে রাস্তা পিচ্ছিল থাকে, তাই সাবধানে যাবেন।
কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য ‘দড্ডা মানে’ (Dodda Mane) খুব বিখ্যাত। এটি সেই বাড়ি যেখানে ‘মালগুডি ডেইজ’-এর শুটিং হয়েছিল। খুব সাধারণ ঘরোয়া পরিবেশ।

৭. মাজুলি (Majuli), অসম: ব্রহ্মপুত্রের বুকে রঙের আবির
অবস্থান: অসমের জোরহাট জেলার কাছে। ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে বিশ্বের বৃহত্তম নদী-দ্বীপ।
নদী-মাতৃক সূর্যাস্ত দেখতে হলে মাজুলির কোনো বিকল্প নেই। বৈষ্ণব সংস্কৃতি আর ব্রহ্মপুত্রের বিশালতা এখানে মিলেমিশে একাকার।
গোধূলির গল্প (The Experience): বিকেলে চলে যান ‘কমলাবাড়ি ঘাট’ বা কোনো ফেরি ঘাটে। সামনে বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ। তার কোনো কূল-কিনারা দেখা যায় না, মনে হয় সমুদ্র। নদীতে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ভাসছে। জেলেরা দিনের শেষ মাছ ধরছে। সূর্য যখন নদীর ওপারে ডুবতে থাকে, তখন পুরো ব্রহ্মপুত্র নদের জল লাল হয়ে যায়। সেই জলে সূর্যের লম্বা ছায়া পড়ে। মাজুলির আকাশ খুব বড়, তাই রঙের বিস্তারও অনেক বেশি। দূরে চরের ওপর কাশফুলের জঙ্গল হাওয়ায় দুলতে থাকে। এখানকার সূর্যাস্ত খুব শান্ত, খুব গ্রাম্য, কিন্তু মনের গভীর পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): মাজুলি যেতে হলে প্রথমে পৌঁছতে হবে জোরহাট (Jorhat)। জোরহাটে বিমানবন্দর এবং রেল স্টেশন—দুটোই আছে। গুয়াহাটি থেকে বাসে বা ট্রেনেও জোরহাট আসা যায় (প্রায় ৭ ঘণ্টা)। জোরহাট শহর থেকে অটো বা গাড়িতে ‘নিমতি ঘাট’ (Neemati Ghat)। সেখান থেকে ফেরি বা লঞ্চে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে মাজুলি (কমলাবাড়ি ঘাট)। সময় লাগে ১ ঘণ্টা। ফেরি সার্ভিস বিকেল ৪টের পর বন্ধ হয়ে যায়, তাই সময়ের দিকে খেয়াল রাখবেন।
কোথায় থাকবেন: মাজুলিতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ‘চ্যাং ঘর’-এ থাকার অভিজ্ঞতা নিন। অনেক ভালো ইকো-রিসর্ট আছে।
৮. মাউন্ট আবু (Mount Abu), রাজস্থান: মরুভূমির মাঝে পাহাড়ি হ্রদ
অবস্থান: রাজস্থানের সিরোহি জেলা। নক্কি লেক (Nakki Lake)-এর দক্ষিণ-পশ্চিমে। উদয়পুর থেকে ১৬০ কিমি দূরে।
মরুরাজ্য রাজস্থানের একমাত্র হিল স্টেশন। এখানকার সানসেট পয়েন্টটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও, এর ভিউটি সত্যিই অনন্য।
গোধূলির গল্প (The Experience): মাউন্ট আবুর সানসেট পয়েন্টে পৌঁছতে হলে আপনাকে নক্কি লেক থেকে প্রায় ১ কিমি চড়াই ভাঙতে হবে (অথবা ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া যায়)। পয়েন্টটি আরাবল্লী পর্বতের একটি খাদের মুখে। এখান থেকে যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড়ের সারি দেখা যায়। সূর্য যখন ডোবে, তখন মনে হয় পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আগুন লেগেছে। এখানকার বিশেষত্ব হলো—সূর্য ডোবার পরও আকাশ অনেকক্ষণ আলোকিত থাকে। আকাশের নীল আর পাহাড়ের লালের কনট্রাস্ট দেখার মতো। প্রচুর লোক থাকলেও, পাহাড়ের বিশালতার কাছে সেই ভিড় নগণ্য মনে হয়।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): নিকটতম রেল স্টেশন হলো ‘আবু রোড’ (Abu Road), যা পাহাড়ের নিচে অবস্থিত (২৮ কিমি দূরে)। দিল্লি, মুম্বই বা আমেদাবাদ থেকে ট্রেনে আবু রোড আসা যায়। স্টেশন থেকে ট্যাক্সি বা বাসে মাউন্ট আবু পৌঁছতে এক ঘণ্টা লাগে। রাস্তাটি পাহাড়ি এবং আঁকাবাঁকা। নিকটতম এয়ারপোর্ট হলো উদয়পুর। সেখান থেকে গাড়িতে ৩-৪ ঘণ্টা লাগে।
কোথায় থাকবেন: মাউন্ট আবুতে প্রচুর ভালো হোটেল এবং হেরিটেজ বাংলো আছে। লেকের ধারে থাকাই সবথেকে ভালো।

৯. ভেড়াঘাট (Bhedaghat), মধ্যপ্রদেশ: মার্বেল পাথরের রূপকথা
অবস্থান: জবলপুর শহর থেকে ২৫ কিমি দূরে। নর্মদা নদীর তীরে।
জবলপুরের ধুঁয়াধার ফলস দেখেছেন? তার একটু কাছেই নর্মদা নদী বয়ে গেছে শ্বেতপাথরের খাদের মধ্য দিয়ে। একে বলা হয় ‘মার্বেল রক্স’।
গোধূলির গল্প (The Experience): এখানে সূর্যাস্ত দেখতে হয় নৌকায় বসে। নর্মদা নদীর দুই পাশে ১০০ ফুট উঁচু সাদা মার্বেলের দেওয়াল। মাঝখান দিয়ে শান্ত নদী। বিকেলে নৌকাবিহার বা বোটিং শুরু করুন। মাঝিকে বলুন সূর্যাস্ত পর্যন্ত নদীতে থাকতে। সূর্য যখন ডুবতে শুরু করে, তখন ওই সাদা মার্বেল পাথরগুলো রং বদলাতে শুরু করে। প্রথমে কাঁচা হলুদ, তারপর সোনা, আর শেষে হালকা গোলাপি। সাদা পাথরের ওপর গোধূলির আলোর এই খেলা এক মায়াবী দৃশ্যের জন্ম দেয়। নদীর জলে সেই রঙিন পাথরের ছায়া পড়ে। নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু মাঝির দাঁড়ের শব্দ আর জলের ছলাৎ ছলাৎ।
কীভাবে যাবেন (বিস্তারিত): প্রথমে ট্রেনে বা ফ্লাইটে জবলপুর (Jabalpur) পৌঁছতে হবে। এটি মধ্যপ্রদেশের একটি প্রধান শহর। জবলপুর স্টেশন বা এয়ারপোর্ট থেকে প্রিপেইড ট্যাক্সি, অটো বা ক্যাব বুক করে সরাসরি ভেড়াঘাট। সময় লাগে ৪০-৪৫ মিনিট। জবলপুর শহর থেকে সিটি বাসও চলে। রাস্তা খুব ভালো। নৌকাবিহারের জন্য পঞ্চবটী ঘাটে টিকিট কাটতে হয়।
কোথায় থাকবেন: মধ্যপ্রদেশ টুরিজমের ‘মোটেল মার্বেল রক্স’ সবথেকে ভালো লোকেশনে অবস্থিত। এখান থেকে নদী দেখা যায়।
সূর্যাস্ত আমাদের একটা খুব দামি শিক্ষা দেয়—”আজকের মতো ফুরিয়ে গেলাম, যাতে কাল আরও সুন্দর হয়ে ফিরে আসতে পারি।” আমাদের জীবনের ক্লান্তি, হতাশা বা ব্যর্থতাগুলোকেও এই সূর্যাস্তের মতো বিদায় জানাতে হয়। গান্ডিকোটার গিরিখাতে বসে বা মাজুলির নৌকায় দুলতে দুলতে যখন আপনি দিনটাকে বিদায় জানাবেন, তখন দেখবেন মনটা অনেক হালকা লাগছে। মনে হবে, আগামী কালটা নিশ্চয়ই এর চেয়েও সুন্দর হবে।
তাই পরের ট্রিপে শুধু সাইট সিয়িং নয়, একটা বিকেল রাখুন শুধুই আকাশ দেখার জন্য। এই ৯টি জায়গার যেকোনো একটায় চলে যান। বিশ্বাস করুন, ওই গোধূলি লগ্ন আপনার ট্রাভেল ডায়েরির সেরা চ্যাপ্টার হয়ে থাকবে।
সূর্য ডুবুক, স্মৃতিরা জেগে থাক। হ্যাপি ট্রাভেলিং!
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

